সে জেগে উঠল…
হ্যাঁ, এসবই ঘটেছে! শিশুর মতো খুশির হাসি হেসে সে নিজেকেই বলল; তারপর যৌবনসুলভ গভীর তন্দ্রায় ঢলে পড়ল।
০২.২ রাজ-দরবারে
অধ্যায়-১১
পরদিন অনেক দেরিতে তার ঘুম ভাঙল।
প্রথমেই মনে পড়ল, আজ তাকে সম্রাট ফ্রান্সিসের কাছে হাজির হতে হবে; মনে পড়ল যুদ্ধমন্ত্রী, ভদ্র অস্ট্রিয় অ্যাডজুটান্ট বিলিবিন ও গত রাতের আলোচনার কথা। রাজ-দরবারে হাজির হবার জন্য কুচকাওয়াজের উপযুক্ত পুরো ইউনিফর্ম পরল; অনেকদিন এ পোশাক সে পরে নি। সেজেগুজে ব্যান্ডেজ-বাধা হাত নিয়ে বিলিবিনের পড়ার ঘরে ঢুকল। কূটনীতি বিভাগের চারটি ভদ্রলোক সেখানে হাজির। তার মধ্যে দূতাবাসের সচিক প্রিন্স হিপোলিং কুরাগিনের সঙ্গে বলকনস্কির আগে থেকেই পরিচয় ছিল। বিলিবিন অন্যদের সঙ্গে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
বিলিবিনের ঘরে সমবেত সকলেই যুবক, ধনী, হাসিখুশি, উঁচুসমাজের লোক; ভিয়েনার মতো এখানেও তারা একটা বিশেষ গোষ্ঠী তৈরি করেছে। আর তাদের নেতা বিলিবিন গোষ্ঠীটার নাম দিয়েছে Les notres. এই গোষ্ঠীর প্রায় সকলেই কূটনীতিক; যুদ্ধ: বা রাজনীতির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই; তাদের সম্পর্ক উঁচু সমাজ, বিশেষ বিশেষ মহিলা ও পদস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে। এই দ্ৰজনরা প্রিন্স আন্দুকে নিজেদের একজন হিসেবেই গ্রহণ করল; এ সম্মান তারা বেশি লোককে দেয় না। ভদ্রতাবশত এবং আলোচনার সূত্র হিসেবে তারা সৈন্য ও যুদ্ধ সম্পর্কে কয়েকটা প্রশ্ন তাকে করল; তারপরেই শুরু হল রসিকতা, হাসিঠাট্টা ও গল্পগুজব।
সহযোগী কূটনীতিকের দুর্ভাগ্যের কথা বলতে গিয়ে একজন বলল, কিন্তু সবচাইতে বড় কথা হল, চ্যান্সেলার তাকে সরাসরি বলে দিল যে লন্ডনে তাকে পাঠানো হচ্ছে প্রমোশন দিয়ে, আর তাকেও এটা সেইভাবেই নিতে হবে। তখন যে তার মুখের অবস্থাটা কেমন হল সে কথা ভাবতে পার…?
কিন্তু মশাইরা, এ ব্যাপারে সবচাইতে শোচনীয় কথা হল-কুরাগিনকে লক্ষ্য করেই বলছি–সেই লোকটা কষ্ট ভোগ করল, আর এই দুষ্টু ডন জুয়ান ভোগ করছে তার সুবিধাটুকু!
প্রিন্স হিপোলিং লাউঞ্জ-চেয়ারের হাতলে পা তুলে দিয়ে আরামে শুয়েছিল। সে হেসে উঠল।
বলল, সে ব্যাপারটা শুনিয়ে দাও।
আরে, তুমি ডন জুয়ান! তুমি বিছু! কয়েকজন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল।
প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে মুখ ফিরিয়ে বিলিবিন বলল, তুমি তো জান না বলকনস্কি, এই লোকটি মেয়েদের মহলে যা করে বেড়াচ্ছে তার তুলনায় ফরাসি বাহিনীর (প্রায় রুশ বাহিনী বলে ফেলেছিলাম আর কি) নৃশংসতা তো কিছুই না।
নারী তো পুরুষের সঙ্গিনী, ফরাসিতে কথাটা বলে হিপোলিং তার পায়ের দিকে তাকাতে লাগল।
বিলিবিন ও দলের অন্য সকলে হিপোলিৎতের মুখের উপর হো-হো করে হেসে উঠল; স্ত্রীর ব্যাপারে প্রিন্স আন্দ্রু হিপোলিৎকে কিছুটা ঈর্ষাই করত; সে বুঝতে পারল, এখানে সকলেই এই লোকটার পিছনে লাগছে।
বিলিবিন ফিসফিস করে বলকনস্কিকে বলল। দেখ না, কিরকম মজা করি! কুরাগিন যখন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে তখন সে অপূর্বতার গাম্ভীর্য দেখবার মতো।
সে হিপোলিৎতের পাশে গিয়ে বসল। কপালে ভাঁজ ফেলে তার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করল। প্রিন্স আন্দ্রু ও অন্যরা দুইজনকে ঘিরে বসল।
একটা কেউ-কেটা ভঙ্গিতে চারদিকে তাকিয়ে হিপোলিৎ শুরু করল, বার্লিন মন্ত্রিসভা মৈত্রীর কথা বলতেই পারে না…যদি না…যেমন সর্বশেষ মন্তব্যে বলা হয়েছে…বুঝতে পারলে…তাছাড়া, মহামান্য সম্রাট যদি আমাদের মৈত্রীর মূলনীতি থেকে সরে না যান…।
দাঁড়ান, আমি এখনো শেষ করি নি… প্রিন্স আর হাতটা চেপে ধরে সে তাকে বলল, আমি বিশ্বাস করি, হস্তক্ষেপই অ-হস্তক্ষেপ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী। আর… একটু থেমে, শেষ কথা হল, আমাদের ১৮ নভেম্বরের চিঠি না পাওয়ার অভিযোগ তো করা চলবে না। এইভাবেই ব্যাপারটা শেষ হবে। এবার সে বলকনস্কির হাতটা ছেড়ে দিল। বোঝা গেল, এবার তার বক্তব্য সম্পূর্ণ হয়েছে।
বিলিবিন বলল, ডেমস্থিনিস, তোমার সোনার মুখে যে নুড়ি ঝরছে তা থেকেই তোমাকে আমি চিনি! তার মাথার চুল খুশিতে নড়তে লাগল।
সকলেই হেসে উঠল; হিপোলিৎতের হাসি সকলের চাইতে জোরদার। সে যে কষ্ট পেয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে, কারণ তার শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে, তবু সে অট্টহাসি না হেসে থাকতে পারল না।
বিলিবিন বলল, দেখ মশাইরা, এই ঘরে, এমন কি ব্রুনেও বলকনস্কি আমার অতিথি। এখানকার জীবনযাত্রায় যতরকম সুখের আয়োজন আছে সে সবকিছু দিয়ে যথাসাধ্য আমি তার আনন্দ বিধান করতে চাই। আমরা যদি ভিয়েনায় থাকতাম, ব্যাপারটা সহজ হত, কিন্তু এখানে, মোরাভিয়ার এই হতভাগা গর্তের মধ্যে সেটা খুবই শক্ত। তাই আপনার সকলের কাছেই আমি সাহায্য চাইছি। ব্রুনের যা কিছু আকর্ষণীয় সব তাকে দেখাতে হবে। তুমি থিয়েটার দেখাবে, আমি এখানকার সমাজটা দেখাব, আর তুমি হিপোলিৎ, তুমি অবশ্য দেখাবে মেয়েমহলটা।
আঙুলের ডগায় চুমো খেয়ে দলের একজন বলল, এমিলিকে অবশ্যই দেখাতে হবে–সে যে পরমা সুন্দরী!
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, মশাইরা, আপনাদের এই আতিথেয়তার সুযোগ নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, আমার যাবার সময় হয়ে গেছে।
কোথায় যাবেন?
সম্রাটের কাছে।
