কি? দখল করেছে? ভিয়েনা দখল করেছে?
শুধু দখল করে নি, বোনাপার্ত শমব্রুনে (অস্ট্রিয়ার সম্রাটের ভিয়েনাস্থ গ্রীষ্মবাস) এসেছে, আর কাউন্ট, আমাদের প্রিয় কাউন্ট ভূবনা তার কাছে যাচ্ছেন হুকুম শুনতে।
পথের ক্লান্তি, তার অভ্যর্থনা, এবং বিশেষ করে আহারাদির পরে বলকনস্কির মনে হল, এসব কথার পুরো অর্থ তার মাথায় ঢুকছে না।
বিলিবিন বলতে লাগল, কাউন্ট লিচটেনফেলস আজ সকালেই এখানে এসেছিলেন; তিনি আমাকে একটা চিঠি দেখালেন, তাতে ভিয়েনাতে ফরাসিদের কুচকাওয়াজের পূর্ণ বিবরণ লেখা আছে।…বুঝতেই পারছ, তোমাদের জয়লাভে এখানে আনন্দ-উৎসব করার কোনো কারণ নেই, আর তোমাকেও ত্রাণকর্তা বলে অভ্যর্থনা জানানো চলে না।
প্রিন্স আন্দ্রু এতক্ষণে একটু একটু বুঝতে পারছে যে, অস্ট্রিয়ার রাজধানীর পতনের মতো এতবড় ঘটনার পরে ক্রেমসের যুদ্ধের সংবাদের গুরুত্ব সত্যিই খুব সামান্য। সে বলল, সত্যি বলছি, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না, মোটেই না।…কিন্তু ভিয়েনা দখল হল কেমন করে? সেই সেতু, তার বিখ্যাত সেতু-মুখ ও প্রিন্স অয়ের্সপার্গের কি হল তাহলে? আমরা শুনেছিলাম, প্রিন্স অয়ের্সপার্গ ভিয়েনা রক্ষা করছিলেন?
প্রিন্স অয়ের্সপার্গ তো এদিকে, নদীর আমাদের দিকে রয়েছেন; তিনি তো আমাদের রক্ষা করছেন–যদিও সে কাজটা তিনি খুব খারাপভাবেই করছেন, তবু তিনিই আমাদের রক্ষা করছেন। কিন্তু ভিয়েনা তো নদীর ওপারে। না, সেতুটা এখনো বেদখল হয় নি, আর আশা করছি হবেও না, কারণ ওখানে মাইন পাতা আছে। আর ওটাকে উড়িয়ে দেবার হুকুম হয়েছে। নইলে অনেক আগেই আমাদের চলে যেতে হতো বোহেমিয়ার পাহাড়ে, আর সসৈন্যে তোমাদের সময় কাটাতে হতো দুই অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে।
কিন্তু তবু তার অর্থ এই নয় যে অভিযান শেষ হয়ে গেছে, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
দেখ, আমি তো মনে করি শেষ হয়েই গেছে। এখানকার বড় বড় মাথারাও তাই মনে করেন, যদিও সেকথা বলতে সাহস করেন না। যুদ্ধের গোড়াতে আমি যা বলেছিলাম তাই হবে; যুদ্ধের মীমাংসা দুরেনস্তিনে তোমাদের কাটাকাটিতেও হবে না, বা গোলাবারুদেও হবে না; যারা যুদ্ধ বাধিয়েছে তারাই এর মীমাংসা করবে। কথা বলতে বলতে বিলিবিনের কপালের ভাঁজগুলো মিলিয়ে গেল। একটু থেমে সে আবার বলল, একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, সম্রাট আলেকজান্দার ও প্রাশিয়ার রাজার মধ্যে বার্লিনে যে মুলাকাত হবে তার ফলটা কি দাঁড়াবে? প্রাশিয়া যদি মিত্রপক্ষে যোগ দেয় তাহলে অস্ট্রিয়াও যোগ দিতে বাধ্য হবে, এবং যুদ্ধ বাধবে। তা না হলে নতুন ক্যাম্পো ফর্মিও-প্রাথমিক সূত্রগুলি কোথায় রচিত হবে সেটা ঠিক করাই হবে আসল প্রশ্ন।
প্রিন্স আন্দ্রু সহসা মুষ্টিবদ্ধ হাতে টেবিলের উপর আঘাত করে চেঁচিয়ে উঠল, কী অসাধারণ প্রতিভা! আর লোকটির কী ভাগ্য!
একটা মজার কথা কিছু বলতে যাচ্ছে এমনি ভাব দেখিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বিলিবিন জিজ্ঞাসা করল, বোনাপার্ত? বোনাপার্ত? নামের ইউ অক্ষরটার উপর জোর দিয়ে সে নামটা দুইবার উচ্চারণ করল। আমি অবশ্য মনে করি, শত্রুনে সেই যখন অস্ট্রিয়ার জন্য নিয়ম-কানুন বাতলে দিচ্ছে, সেক্ষেত্রে আমরা তার নামের ইউটা বাদ দিয়েই দেব। আমি তো একটা নতুন শব্দ প্রবর্তন করে তাকে বনাপার্ত বলেই ডাকব (ইউটা বাদ দিয়ে)।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, ঠাট্টা রাখ; তুমি কি সত্যি মনে কর যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে?
আমি তো তাই মনে করি। অস্ট্রিয়াকে বোকা বানানো হয়েছে, আর সে তাতে অভ্যস্ত নয়। সে প্রতিশোধ নেবেই। প্রথমত তাকে বোকা বানানো হয়েছে কারণ তার প্রদেশগুলি তচনছ করা হয়েছে–তারা বলছে যে পবিত্র রুশ বাহিনী ভয়ংকরভাবে লুটতরাজ করেছে-তার সেনাদলকে ধ্বংস করা হয়েছে, তার রাজধানী, বেদখল হয়েছে, আর এ সবই হয়েছে হিজ সার্ডিনিয় ম্যাজেস্টির দুটি সুন্দর চোখের জন্য। আর তাই–কথাটা শুধু আমাদের মধ্যেই বলছি–আমি মনে মনে অনুভব করছি যে আমাদেরও ঠকানোর আয়োজন চলছে। আমার মন বলছে, ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনা, সন্ধির পরিকল্পনা ও আলাদাভাবে একটা গোপন চুক্তির চেষ্টা হচ্ছে।
প্রিন্স আন্দ্রু চেঁচিয়ে বলল, অসম্ভব! এত নিচ তারা হতে পারে না!
যদি বেঁচে থাকি তো সবই দেখতে পা, বিলিবিন জবাব দিল। তার মুখ আবার শান্ত হয়ে গেল, বোঝা গেল, আলোচনা শেষ হল।
প্রিন্স আন্দ্রু তার জন্য নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে একটা পরিষ্কার শার্ট পরে গরম, সুগন্ধি বালিশে মাথা রেখে পালকের বিছানায় শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে তার মনে হল, যে যুদ্ধের সংবাদ নিয়ে সে এসেছে সেটা অনেক অনেক দূরের একটা ব্যাপার। প্রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা, অস্ট্রিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা, বোনাপার্তের নতুন জয়লাভ, আগামীকালের রাজ-দরবার ও কুচকাওয়াজ ও সম্রাট ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ–এইসব চিন্তার মধ্যেই সে ডুবে গেল।
সে চোখ বুজল। সঙ্গে সঙ্গে কামান-বন্দুকের গর্জন ও চাকার ঘর্ঘর শব্দ তার কানে বাজতে লাগল; একদল বন্দুকধারী সৈন্য সরু রেখায় পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে। ফরাসিরা গোলাগুলি চালাচ্ছে; আর চারদিকে বুলেটের শিসের ভিতর দিয়ে শমিড-এর পাশে পাশে ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে তার হৃৎপিণ্ডটা দপ দপ করছে। বেঁচে থাকার আনন্দ যেন দশগুণ হয়ে তার মনকে ভরে দিল। শৈশবের পরে এরকম অভিজ্ঞতা তার আর কখনো হয় নি।
