বিলিবিন যেমন কাজ ভালোবাসে, তেমনি আলাপ-আলোচনাও ভালোবাসে, শুধু সে কাজটি সুষ্ঠু ও বুদ্ধিদীপ্ত হওয়া চাই। সমাজে সে সর্বদাই অপেক্ষা করে থাকে একটা উল্লেখযোগ্য কিছু বলবার সুযোগের জন্য; আর একমাত্র সেটা সম্ভব হলে তবেই সে কোনো আলোচনায় যোগ দেয়। তার কথাবার্তার মধ্যে সব সময়ই সকলের পক্ষে বোধগম্য কিছু বুদ্ধিদীপ্ত মৌলিক পরিচ্ছন্ন বাক্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবেই। যেন ইচ্ছা করেই এ সব বাক-ভঙ্গিতে সে মনের গভীর ল্যাবরেটরিতে তৈরি করে রাখে; যাতে সমাজের অতি সাধারণ মানুষরাও সেগুলিকে এক বৈঠকখানা থেকে আর এক বৈঠকখানায় বয়ে নিয়ে যেতে পারে। বস্তুত, বিলিবিনের এইসব রসিক ভাষণ ভিয়েনার বৈঠকখানার ঘরে ঘরে ফেরি করা হয়, এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়ে থাকে।
তার শুকনো, বিবর্ণ মুখটা সব সময়ই গভীর ভাজে ঢেকে থাকে; অথচ সে মুখ সর্বদাই দেখায় ধোয়া মোছা, পরিষ্কার, ঠিক যেন রুশ-স্নানের পরে আঙুলের ডগার মতো। মুখের ভাঁজগুলি এমনভাবে নড়েচড়ে যে তাতেই তার মনের ভাবগুলি প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই হয়তো তার কপালে অনেকগুলো ভাজ পড়ল আর ভুরু দুটো ঠেলে উঠল; আবার হয়তো ভুরু দুটো নেমে এল নিচে আর গালে পড়ল অনেকগুলো গভীর ভাঁজ। ছোট দৃঢ়বদ্ধ চোখ দুটো সর্বদাই মিটমিট করে, সোজা সামনে তাকায়।
আচ্ছা, এবার তাহলে তোমাদের যুদ্ধ জয়ের কথা বল, সে বলল।
একবারও নিজের নাম উল্লেক না করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলকনস্কি যুদ্ধমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা ও তার অভ্যর্থনার একটা বিবরণ দিল।
উপসংহারে বলল, স্কিটল খেলায় লোকে যেভাবে একটা কুকুরকে গ্রহণ করে সেইভাবেই তিনি আমাকে ও আমার সংবাদটিকে গ্রহণ করেছেন।
বিলিবিন হাসল; তার মুখের ভাঁজগুলি মিলিয়ে গেল।
একটু দূর থেকে নখগুলোর দিকে তাকিয়ে এবং বাঁ চোখের উপরকার চামড়াটা কুঁচকে সে বলল, কিন্তু প্রিয় বন্ধু, গোঁড়া রুশ বাহিনীর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও এ কথা বলতে আমি বাধ্য যে তোমাদের এই জয় আসলে জয়যুক্ত নয়।
সে ফরাসিতেই কথা বলে চলল; শুধু যে কথাগুলির উপর সে একটু ব্যঙ্গাত্মক জোর দিতে চায় (এক্ষেত্রে গোঁড়া রুশ বাহিনী) সেগুলিকে রুশ ভাষায় উচ্চারণ করল।
ভেবে দেখ। আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে তোমরা ঝাঁপিয়ে পড়লে ভাগ্যহীন মর্তিয়ের ও তার এক ডিভিশন সৈন্যের উপর, আর তা সত্ত্বেও মৰ্তিয়ের তোমাদের আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে গেল! তাহলে জয়টা হল কোথায়?
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, কিন্তু গুরুতরভাবে ভাবলে আমরা এটা তো গর্ব না করেই বলতে পারি যে উলমের চাইতে ভালো কাজ আমরা করেছি…
একজন, অন্তত একজন মার্শালকে তোমরা বন্দি করনি কেন?
কারণ সবকিছুই আশানুরূপভাবে, অথবা কুচকাওয়াজের মতো সহজ, সরলভাবে ঘটে না। তোমাকে তো বলেছি, আমরা আশা করেছিলাম সকাল সাতটার মধ্যেই তাদের পিছন দিকটায় হাজির হতে পারব, কিন্তু বিকেল পাঁচটার মধ্যেও সেখানে পৌঁছতে পারি নি।
বিলিবিন মৃদু হেসে মন্তব্য করল, সকাল সাতটায় কেন পৌঁছলে না? সকাল সাতটায়ই তো তোমাদের পৌঁছনো উচিত ছিল।
সেই একই সুরে প্রিন্স আন্দ্রু পাল্টা আঘাত করল, তোমরাই বা কূটনৈতিক পদ্ধতিতে বোনাপার্তকে বোঝাতে পার নি কেন যে তার পক্ষে জেনোয়া ছেড়ে যাওয়াই ভালো ছিল?
বিলিবিন বাধা দিয়ে বলল, আমি জানি, তুমি ভাবছ যে আগুনের পাশে সোফায় বসে মার্শালকে ধরা খুবই সোজা! সে কথা ঠিক, কিন্তু তবু তোমরা তাকে বন্দি করলে না কেন? কাজেই শুধু যুদ্ধমন্ত্রী নন, মহামহিম সম্রাট ও রাজা ফ্রান্সিস তোমাদের জয়লাভে যথেষ্ট পুলকিত না হন তো আমি অন্তত অবাক হব না।
এমন কি আমি যে রুশ দূতাবাসের একজন নগণ্য সচিব, আমার মনেও বাসনা জাগে না যে আনন্দের প্রকাশ হিসেবে আমার ফ্রাঞ্জকে একটা রৌপ্যমুদ্রা দেই, অথবা তাকে একদিন ছুটি দেই।…
সে সরাসরি প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল; হঠাৎ তার কপালের ভাঁজগুলি মিলিয়ে গেল।
বলকনস্কি বলল, প্রিয় বন্ধু, এবার কিন্তু আমার পালা; তোমাকেও জিজ্ঞাসা করব কেন? স্বীকার করছি আমি ঠিক বুঝি না : হয়তো এখানে এমন কিছু কূটনৈতিক সূক্ষ্ম প্রশ্ন আছে যা আমার ক্ষীণ বুদ্ধির অতীত, কিন্তু আমি সেটা বুঝতে পারি না। ম্যাক একটা গোটা বাহিনী নষ্ট করেছেন, আর্চডিউক ফার্ডিনান্ড ও আর্চডিউক কার্লের মধ্যে জীবনের কোনো লক্ষণই নেই, তারা ভুলের পর ভুল করছেন। কুতুজভই শেষপর্যন্ত একটা সত্যিকারের জয়লাভ করেছেন, ফরাসিদের অপরাজেয়তার যাদুকে ধ্বংস করেছেন, অথচ যুদ্ধমন্ত্রী তার বিবরণটুকু শুনতেও আগ্রহী নন।
ঠিক তাই প্রিয় বন্ধু! বুঝতেই পারছ, জারের পক্ষে, রাশিয়ার পক্ষে, গোঁড়া গ্রিক ধর্মের পক্ষে এটা একটা জয়-গৌরব! এ পর্যন্ত খুব ভালো, কিন্তু এ সব জয়ে আমাদের, আমি বলতে চাই অস্ট্রিয় রাজদরবারের, কি যায় আসে? আর্চডিউক কার্ল বা ফার্ডিনান্ডের (তুমি তো জান সব আর্চডিউকই সমান) জয়ের একটা ভালো খবর আমাদের এনে দাও, এমন কি সে জয় যদি বোনাপার্তের একটা ফায়ার-ব্রিগেডের বিরুদ্ধেও হয় সেও ভালো, তাহলেই সেটা হবে বাহিনী, আর আমরাও কামান থেকে গোলা ছুঁড়ব! কিন্তু এ সব তো করা হয় আমাদের বিরক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়েই। আর্চডিউক কার্ল কিছুই করেন না, আর্চডিউক ফার্ডিনান্ড যে কাজ করেছেন তাতে তার নিজেরই লজ্জা। তোমরা ভিয়েনা ছেড়ে গেলে, তার রক্ষা-ব্যবস্থা তুলে নিলে–যেন বলতে চাইলে : ঈশ্বর আমাদের সহায়, কিন্তু ঈশ্বর তোমাদের ও তোমাদের রাজধানীকে রক্ষা করুন! শমিডই একমাত্র সেনাপতি যাকে আমরা ভালোবাসতাম; তাকে তোমরা বুলেটের মুখে ঠেলে দিলে, আর তারপর এলে জয়লাভ উপলক্ষে আমাদের অভিনন্দন জানাতে! স্বীকার কর যে তোমাদের এই খবরের চাইতে বিরক্তিকর আর কিছু ভাবাই যায় না। মনে হয়, যেন ইচ্ছা করেই এটা করা হয়েছে। তাছাড়া, ধর তোমরা একটা সত্যিকারের জয়লাভই করেছ, এমন কি আর্চডিউক কালও যদি জয়লাভ করে থাকে, সাধারণ ঘটনা প্রবাহের উপর তার কি প্রভাব হবে? ফরাসি বাহিনী যখন ভিয়েনা দখল করে নিয়েছে তখন এ সব কিছুই তো বড় বেশি বিলম্বে ঘটেছে!
