এটা নিয়ে দিয়ে দাও, কাগজপত্রগুলি অ্যাডজুটান্টের হাতে দিয়ে মন্ত্রী বলল; তখনো সে বিশেষ সংবাদদাতার উপস্থিতি খেয়াল করল না।
প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল, হয় নিজের অন্যান্য কাজকর্মের তুলনায় কুতুজভের সেনাবাহিনীর কাজকর্মের প্রতি যুদ্ধমন্ত্রীর আগ্রহই কম, অথবা রুশ সংবাদদাতাটির কাছে সেই ভাবটিই সে দেখাতে চায়। কিন্তু সেটা তো আমার প্রতি পুরোপুরি ঔদাসিন্যের সামিল, সে ভাবল। মন্ত্রীমশাই বাকি কাগজপত্র একত্র করল, ভালোভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখল, তারপর মাথা তুলল। তার মাথাটি বুদ্ধিমত্তা ও বিশিষ্টতার পরিচয় বহন করে; কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকানো মাত্রই তার মুখের স্থির, বুদ্ধিদীপ্ত ভাবটি সম্পূর্ণ বদলে গেল; যেন এটাই তার পক্ষে সহজ ও স্বাভাবিক। তার মুখে ফুটে উঠল এমন একটা কৃত্রিম বোকা বোকা হাসি (কৃত্রিমতাকে ঢাকবার চেষ্টা পর্যন্ত নেই) যা শুধু সেই মানুষের মুখেই দেখা যায় যে একের পর এক অনেক আবেদনকারীর সঙ্গে দেখা করতে অভ্যস্ত।
মন্ত্রী জিজ্ঞাসা করল, সেনাপতি ফিল্ড-মার্শাল কুতুজভের কাছ থেকে এসেছেন? আশা করি সংবাদ শুভ? মৰ্তিয়েরের সঙ্গে একটা যুদ্ধ তো হয়েছে? জয় হয়েছে তো? তার সময় তো হয়েছে!
তাকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিটা হাত নিয়ে মন্ত্রী পড়তে লাগল। তার মুখে শোক-চিহ্ন ফুটে উঠল।
হা আমার ঈশ্বর! আমার ঈশ্বর! শমিড! জার্মান ভাষায় সে হাহাকার করে উঠল। কী বিপদ!
কী বিপদ। চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে কি যেন ভাবতে ভাবতে সে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল।
কী বিপদ! আপনারা বলছেন যে চূড়ান্ত জয় হয়েছে। কিন্তু মৰ্তিয়েরকে বন্দি করা হয় নি। সে আবার একটু ভাবল। আপনি শুব সংবাদ নিয়ে আসায় আমি খুব খুশি হয়েছি, যদিও শমিডের মৃত্যুতে সে জয়লাভের জন্য বড় বেশি দাম দিতে হয়েছে। হিজ ম্যাজেস্টি অবশ্যই আপনার সঙ্গে দেখা করবেন, কিন্তু আজ নয়। আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনার বিশ্রামের দরকার। আগামীকাল প্যারেডের পরে দরবারে হাজির থাকবেন। অবশ্য, আমি আপনাকে জানাব।
কথা বলার সময় যে নির্বোধ হাসিটি তার মুখ থেকে চলে গিয়েছিল সেটা আবার ফিরে এল।
মাথাটা নিচু করে সে বলল, Au revoir! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। হিজ ম্যাজেস্টি সম্ভবত আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন।
প্রাসাদ থেকে চলে আসার পথে প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল, এই জয়লাভ যে আগ্রহ ও সুখ তাকে এনে দিয়েছিল, সব এখন গচ্ছিত রইল যুদ্ধমন্ত্রী ও তার বিনীত অ্যাডজুটান্টের উদাসীন হাতে। তার গোটা চিন্তার ধারাই মুহূর্তে বদলে গেল; মনে হল, যুদ্ধটা যেন বহুদূর অতীতের একটি ঘটনার স্মৃতিমাত্র।
*
অধ্যায়-১০
ব্রুনে প্রিন্স আর থাকবার ব্যবস্থা হল কূটনৈতিক দপ্তরে চাকরিরত তার পরিচিত একজন রুশ ভদ্রলোকের সঙ্গে না, বিলিবিন।
বাইরে এসে প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে দেখা করে বিলিবিন বলল, আরে, প্রিন্স! আমার কাছে তোমার চাইতে স্বাগত অতিথি কেউ নয়। ফ্রাঞ্জ, প্রিন্সের প্রিয় সামান আমার শোবার ঘরে নিয়ে যাও। যে চাকরটি বলকনস্কিকে সঙ্গে করে এনেছে তাকেই সে কথাটা বলল। তাহলে তুমি যে জয়ের অগ্রদূত হে? চমৎকার! আর দেখতেই তো পাচ্ছ, আমি এখানে অসুখ বাধিয়ে বসে আছি।
হাত-মুখ ধুয়ে সাজপোশাক পরে প্রিন্স আন্দ্রু কূটনীতিকের বিলাসবহুল খাবার ঘরে গিয়ে তার জন্য তৈরি খানা খেতে বসল। বিলিবিন আরাম করে আগুনের পাশে পা ছড়িয়ে বসল।
যুদ্ধের অভিযানের যোগদানের পর থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার আরাম এবং জীবনের সব রকম সুখ সম্ভোগ থেকে প্রিন্স আন্দ্রু সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। তার উপর দীর্ঘ পথশ্রমের ক্লান্তি। তাই শিশুকাল থেকে যে বিলাসবহুল পরিবেশে বাস করতে সে অভ্যস্ত সেই পরিবেশে এসে এখন সে খুবই আরাম বোধ করল। তাছাড়া, অস্ট্রিয়দের অভ্যর্থনার পরে যদিও এখন রুশ ভাষায় কথা বলছে না (তারা কথা বলছে ফরাসিতে), তবু একজন রুশ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে পেরে তার বেশ ভালো লাগছে; কারণ তার ধারণা সেই সময়ে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে রুশদের মধ্যে যে তীব্র বিরূপ মনোভাব ছিল সেটা এই রুশ লোকটির মধ্যেও অবশ্যই থাকবে।
বিলিবিনের বয়স পঁয়ত্রিশ বছর; সে অবিবাহিত এবং প্রিন্স আন্দ্রুর একই সমাজের মানুষ। পিটার্সবুর্গে থাকতে পূর্বেই তাদের মধ্যে পরিচয় হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে প্রিন্স আন্দ্রু যখন কুতুজভের সঙ্গে ভিয়েনায় ছিল তখন সে পরিচয় ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল। প্রিন্স আন্দ্রু যেমন প্রথম যৌবনেই সামরিক বিভাগে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবার স্বাক্ষর রেখেছিল, তেমনি বিলিবিনও রেখেছিল কূটনৈতিক কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর। এখনো সে বয়সে যুবক, কিন্তু এখন সে তার যুবক কূটনীতিক নয়; কারণ খোল বছর বয়সে কূটনৈতিক চাকরিতে ঢুকে সে প্যারি ও কোপেনহেগেনে ছিল, এবং এখন ভিয়েনায় বেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমাদের ভিয়েনাস্থ রাষ্ট্রদূত উভয়েই তাকে চেনে এবং প্রশংসা করে। যে সব কূটনীতিকদের প্রশংসা করা হয় যেহেতু তারা কতকগুলি নেতিবাচক গুণের অধিকারী, কতকগুলি বিশেষ বিশেষ কাজ তারা করে না এবং ফরাসিতে কথা বলে, বিলিবিন তাদের একজন নয়। সে তাদেরই একজন যারা নিজেদের কাজ পছন্দ করে, সে কাজ করতে জানে এবং আলস্যপ্রিয়তা সত্ত্বেও কখনো কখনো লেখার টেবিলে বসে সারাটা রাত কাটিয়ে দিতে পারে। কাজ যেমনই হোক, সে কাজ সে সুষ্ঠুভাবেই শেষ করে থাকে। কিসের জন্য? নয়, কেমন করে? এই প্রশ্নটাই তার কাছে আসল। কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু কি তা নিয়ে সে মাথা ঘামায় না; যে কোনো বিষয় নিয়ে সুকৌশলে, তীক্ষ্ণতার সঙ্গে ও সুচারুরূপে ইস্তাহার, স্মারকলিপি অথবা প্রতিবেদন তৈরি করাতেই তার আনন্দ। শুধু লেখার জন্যই যে বিলিবিনকে মর্যাদা দেওয়া হয় তাই নয়, উঁচু মহলের লোকদের সঙ্গে ব্যবহার ও আলোচনার কুশলতার জন্যও তাকে যথেষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
