অন্ধকার রাত; কিন্তু আকাশে অনেক তারা। আগের দিন-যুদ্ধের দিন খুব বরফ পড়েছে। সেই বরফের মধ্যে রাস্তাটাকে কালো দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কথাগুলি তার মনে পড়ছে, জয়ের সংবাদ পৌঁছে দিলে সেখানে কি অবস্থার সৃষ্টি হবে খুশি মনে এটা কল্পনা করছে, প্রধান সেনাপতি ও অফিসার-বন্ধুরা তাকে যে ভাবে বিদায়-সম্বর্ধনা জানিয়েছে সে-কথা তার মনে পড়ছে। এইসব ভাবতে ভাবতে প্রিন্স আন্দ্রু একটা ডাক গাড়িতে চেপে চলেছে। তার মনের ভাবখানা এমন যেন শেষপর্যন্ত একটা বহু-বাঞ্ছিত সুখের দরজায় সে পৌঁছতে যাচ্ছে। চোখ বুজলেই তার কানে যেন বাজছে চাকার ঘর্ঘর শব্দ আর জয়ের অনুভূতি। তারপরেই সে কল্পনায় দেখতে পেল, রুশরা ছুটে পালাচ্ছে, আর সে নিজে মারা গেছে; কিন্তু পরমুহূর্তেই একটা নবীন আনন্দের অনুভূতির মধ্যে জেগে উঠে সে বুঝতে পারল যে ব্যাপারটা সে রকম মোটেই নয়; বরং ফরাসিরাই দৌড়ে পালিয়েছে। জয়ের বিস্তারিত বিবরণগুলি নতুন করে মনে পড়ল; মনে পড়ল যুদ্ধ চলাকালীন তার শান্ত সাহসের কথা; আর নিশ্চিন্তমনে সে ঝিমুতে শুরু করল…তারকাখচিত কালো রাতের শেষে দেখা দিল উজ্জ্বল আনন্দময় সকাল। রোদ লেগে বরফ গলতে শুরু করেছে, ঘোড়াগুলি দ্রুত ছুটছে, রাস্তার দুই পাশে নানারকম জঙ্গল, ক্ষেত ও গ্রাম ছড়িয়ে আছে।
একটা ডাক-ঘাঁটিতে একদল আহত রুশ সৈন্যের সঙ্গে তার দেখা হল। ভারপ্রাপ্ত রুশ অফিসারটি সামনের গাড়িতে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে চিৎকার করে একটা সৈন্যকে কাঁচা খিস্তি করতে শুরু করেছে। প্রতিটি লম্বা জার্মান গাড়িতে ছয় বা তার বেশি বিবর্ণ, নোংরা, ব্যান্ডেজ-বাঁধা মানুষ পাথুরে রাস্তায় ঝাঁকি খেতে খেতে চলেছে। কেউ কেউ কথাবার্তা বলছে (রুশ শব্দ তার কানে এল), কেউ বা রুটি খাচ্ছে; যারা গুরুতর আহত তারা নিঃশব্দে ডাক-গাড়িটির দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রিন্স আন্দ্রু কোচয়ানকে গাড়ি থামাতে বলল; একটি সৈনিককে জিজ্ঞাসা করল, তারা কোন যুদ্ধে আহত হয়েছে? সৈন্যটি জবাব দিল, গত পরশু, দানিয়ুবের তীরে। থলে বের করে প্রিন্স আন্দ্রু সৈনিকটিকে তিনটি স্বর্ণমুদ্রা দিল।
অফিসারটি এগিয়ে এলে তাকে বলল, সকলের জন্যই দিলাম।
শিগগির ভালো হয়ে ওঠ হে ছেলেরা! এখনো অনেক কিছু করবার আছে, সৈন্যদের দিকে ফিরে সে বলল।
খবর কি স্যার? কথা বলার আগ্রহে অফিসারটি শুধাল।
খবর ভালো!…চল হে! চেঁচিয়ে কোয়ানকে বলল। গাড়ি ছুটে চলল।
প্রিন্স আন্দ্রুর গাড়ি যখন ব্রুনের বাঁধানো পথের উপর দিয়ে সশব্দে ছুটতে লাগল তখন অন্ধকার হয়ে। এসেছে; চারদিকে উঁচু-উঁচু বাড়ি, দোকানের ঘর-বাড়ির, ও রাস্তার আলো; ভালো ভালো গাড়ি চলাচল করছে; এককথায় একটা কর্মচঞ্চল বড় শহরের যে পরিবেশ শিবির-জীবন কাটাবার পরে একজন সৈনিকের কাছে খুবই মনোরম লাগে সে সবই উপস্থিত। দ্রুত পথ পরিক্রমা এবং বিদ্রি রাত কাটানো সত্ত্বেও প্রাসাদ অভিমুখে যেতে যেতে প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল সে যেন আগের দিনের চাইতে আরো বেশি কর্মঠ ও তৎপর হয়ে উঠেছে। শুধু চোখ দুটি জরাগ্রস্তের মতো জ্বালা করছে, আর টুকরো টুকরো চিন্তাগুলি একের পর এক অসাধারণ স্পষ্টতায় ও দ্রুতগতিতে মনের মধ্যে আসা-যাওয়া করছে। যুদ্ধের বিবরণগুলি আর একবার অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে তার মনের সামনে ভাসতে লাগল; যেন কল্পনায় দেখতে পেল যে সে নিজেই অত্যন্ত স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত আকারে সম্রাট ফ্রান্সিসের কাছে সে বিবরণ নিবেদন করছে। তাকে কী কী প্রশ্ন করা হবে, আর সে তার কী উত্তর দেবে, সেসবও সে কল্পনা করতে লাগল। সে আশা করল যে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সম্রাটের সমানে উপস্থিত করা হবে। অবশ্য প্রাসাদের প্রধান ফটকে একজন সরকারি কর্মচারী তাকে দেখেই ছুটে এল, এবং সে একজন বিশেষ সংবাদবাহক জানতে পেরে তাকে আর একটা ফটক দেখিয়ে দিল।
বারান্দা দিয়ে এগিয়ে ডান দিকে Euer Hochgeboren! সেখানেই কর্তব্যরত অ্যাডজুটান্টকে দেখতে পাবেন। তিনিই আপনাকে যুদ্ধমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যাবেন।
কর্তব্যরত অ্যাডজুটান্ট প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখেই তাকে অপেক্ষা করতে বলে নিজে যুদ্ধমন্ত্রীর ঘরে ঢুকে গেল। পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এসে বিশেষ সম্ভ্রমের সঙ্গে অভিবাদন জানিয়ে সে প্রিন্স আন্দুকে নিয়ে একটা বারান্দা দিয়ে যুদ্ধমন্ত্রীর ঘরের দিকে নিয়ে চলল। অ্যাডজুটান্টটি এত বেশি শিষ্টাচার দেখাতে লাগল যেন সে চাইছে যে রুশ সংবাদদাতাটি যেন তার সঙ্গে কোনোরকম ঘনিষ্ঠতা স্থাপনের চেষ্টা করতে না পারে।
মন্ত্রীর ঘরের দিকে যেতে যেতেই প্রিন্স আর মনের প্রফুল্লতা যেন অনেকটা কমে গেল। সে মনে মনে আহত বোধ করল, আর সঙ্গে সঙ্গেই আহত মনোভাবটি একটি অকারণ ঘৃণায় পরিণত হল। অ্যাডজুটান্ট ও মন্ত্রীকে ঘৃণা করবার অধিকার যে তার আছে, তার উর্বর মস্তিষ্ক সেটা তাকেই বুঝিয়ে দিল। সে ভাবল, এরা হয়তো ভাবে যে গোলা-বারুদের গন্ধ থেকে দূরে থেকে সহজেই যুদ্ধ জয় করা যায়। তার চোখ দুটি ঘৃণায় সংকুচিত হয়ে উঠল; সদর্পে পা ফেলে সে যুদ্ধমন্ত্রীর ঘরে ঢুকল। কিন্তু সে যখন দেখল, একটা মস্ত বড় টেবিলে বসে মন্ত্রীমশাই কাগজপত্র পড়ছে, আর পেন্সিল দিয়ে কি সব লিখছে, অথচ প্রথম দুতিন মিনিট তার উপস্থিতিটা লক্ষ্যই করল না, তখন তার ঘৃণার ভাবটা আরো বেড়ে গেল। মন্ত্রীর কপালের দুই পাশে কিছুটা পাকা চুল; বাকি মাথাটায় টাক। টাক মাথার দুই পাশে দুটো মোমবাতি। দরজা খোলার ও পায়ের শব্দে চোখ না তুলেই সে শেষপর্যন্ত পড়েই চলল।
