ঠিক সেই মুহূর্তে সূর্য মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। রস্তভ দেখল, তার সামনে আরো স্ট্রেচার এসে হাজির হয়েছে। আর মৃত্যু ও স্ট্রেচারের আতংক এবং সূর্য ও জীবনের প্রতি ভালোবাসা–সবকিছু মিলে তার মনে একটা দুঃসহ উত্তেজনার অনুভূতি দেখা দিল।
রস্তভ অস্ফুট কণ্ঠে বলতে লাগল হে ঈশ্বর! স্বর্গ হতে তুমি আমাকে রক্ষা কর, ক্ষমা কর, আশ্রয় দাও!
যে লোকগুলো ঘোড়াগুলো ধরে রেখেছিল হুজাররা তাদের কাছে ছুটে গেল; তাদের কণ্ঠস্বর আরো উচ্চে উঠল; স্ট্রেচারগুলো দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।
ভাস্কা দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল, তাহলে বন্ধুরা, বারুদের স্বাদ পেয়েছ তো?
রস্তভ ভাবল, এখন সব শেষ; কিন্তু আমি একটা ভীরু-হা, ভীরু। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আর্দালির কাছ থেকে আর ঘোড়া রুককে নিয়ে তাতে চড়তে গেল।
ওটা কি ছররা গোলা ছিল? দেনিসভ শুধাল।
হ্যাঁ, তাতে কোনো ভুল নেই! দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল। তুমি তো একেবারে গবেটের মতো কাজ করলে! আক্রমণ তো মজার ব্যাপার! কুকুরগুলোকে তাড়া করা! কিন্তু এটা কি বাজে ব্যাপার হল! তোমাকে নিশানা করে তারা গোলা ছুঁড়ল।
ততক্ষণে কর্নেল, নেসভিৎস্কি, ঝেরকভ ও অফিসার সকলেই রস্তভের কাছে গিয়ে জুটেছে। দেনিসভও ঘোড়ায় চেপে সেখানে গিয়ে হাজির হল।
রস্তভ ভাবল, যাকগে, মনে হচ্ছে কেউ খেয়াল করে নি। কথাটা সত্যি। গোলাগুলির সামনে একজন ক্যাডেটের প্রথম অভিজ্ঞতা কি রকম হয় সেটা সকলেই জানে বলে কেউ রস্তভকে লক্ষ্য করে নি।
ঝেরকভ বলল, তোমাকে একটা খবর বলছি। আমি যদি; সাবলেফটেন্যান্ট পদে প্রমোশন না পাই তো কি বলেছি।
কর্নেল সগৌরবে খুশি মনে বলল, প্রিন্সকে বল, সেতুতে আমিই আগুন ধরিয়েছি।
আর তিনি যদি লোকসানের কথা জিজ্ঞাসা করেন?
কর্নেল গম্ভীর গলায় বলল, যৎসামান্য : দুইজন হুজার আহত হয়েছে, আর একজন পপাত ধরণীতলে। একটা খুশির হাসি চাপতে না পেরে পপাত ধরণীতলে কথাটাকে একটু বিশেষ জোর দিয়ে উচ্চারণ করল।
*
অধ্যায়-৯
বোনাপার্টের নেতৃত্বে এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে গঠিত ফরাসি বাহিনীর তাড়া খেয়ে, অমিত্রসুলভ মনোভাবসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে বাস করে, মিত্রশক্তির উপর আস্থা হারিয়ে, রসদ-সরবরাহের স্বল্পতার অসুবিধা ভোগ করে, এবং অদৃষ্টপূর্ব সামরিক পরিবেশে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়ে, কুতুজভের নেতৃত্বে পরিচালিত পঁয়ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে গঠিত রুশ বাহিনীর দানিয়ুব নদীর তীর বরাবর দ্রুত গতিতে পশ্চাদপসরণ করে চলেছে; শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলেই থামছে, এবং যতদূর সম্ভব অল্প ক্ষতি স্বীকার করে পশ্চাদপসরণের পক্ষে প্রয়োজনীয় যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হচ্ছে। ল্যাম্ব্যাক, আমসটেট্রেন ও মেলকে যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু রুশ সৈন্যগণ যত সাহস ও সহিষ্ণুতার সঙ্গেই যুদ্ধ করুক না কেন, তার ফল দ্রুত পশ্চাদপসরণ ছাড়া আর কিছুই হয় নি। উলমের যুদ্ধে বন্দি হওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে অস্ট্রিয় বাহিনী ব্রাউনাউতে এসে কুতুজভের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। এখন তারা আবার আলাদা হয়ে গেছে। কুতুজভের হাতে আছে শুধু তার নিজস্ব দুর্বল ও রণক্লান্ত সৈন্যদল। আধুনিক সমর-বিজ্ঞানের রীতি অনুসারে আক্রমণের যে পরিকল্পনা সযত্নে তৈরি করে অস্ট্রিয় হক্ৰিগসরাথ ভিয়েনাতে কুতুজভের হাতে তুলে দিয়েছিল তার পরিবর্তে এখন কুতুজভের পক্ষে প্রায় দুর্লভ একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ম্যাক যে ভাবে উলমে তার সৈন্য নষ্ট করেছে সেটা না করে রাশিয়া থেকে যে নতুন সৈন্যদল আসছে তাদের সঙ্গে মিলিত হওয়া।
২৮ অক্টোবর তারিখে কুতুজভ সসৈন্যে দানিয়ুব পার হয়ে বাঁ তীরে গিয়ে পৌঁছল এবং এই প্রথম এমনভাবে ঘাঁটি করতে পারল যাতে মূল ফরাসি বাহিনী ও তার মধ্যে নদীটাই ব্যবধান দৃষ্টি করল। ৩০ তারিখে সে বামতীরবর্তী মৰ্তিয়েরের বাহিনীকে আক্রমণ করে তছনছ করে দিল। এই যুদ্ধে এই প্রথম শত্রুপক্ষের কিছু স্মারক তারা ছিনিয়ে নিতে পারল : নিশান, কামান ও শত্রুপক্ষের দুজন সেনাপতি। পক্ষকাল ধরে পশ্চাদপসরণের পরে এই প্রথম রুশ বাহিনী এক জায়গায় ঘাঁটি করে যুদ্ধে শুধু যে আত্মরক্ষা করতে পেরেছে তাই নয়, ফরাসি বাহিনীকে হটিয়ে দিতে পেরেছে। সৈন্যরা যদিও যথেষ্ট সজ্জিত ছিল না, ছিল ক্লান্ত ও অবসন্ন এবং হত, আহত, রুগ্ন ও পরিত্যক্তের সংখ্যাই ছিল এক-তৃতীয়াংশ; যদিও রুগ্ন ও আহত সৈনিকদের অনেককেই দানিয়ুবের অপর তীরে ফেলে আসা হয়েছে শুধু একখানি চিঠি লিখে যাতে কুতুজত তাদের তুলে দিয়েছে শত্রুপক্ষের মানবতাবোধের হাতে; এবং যদিও ক্রেমসের সব বড় হাসপাতাল ও বাড়িগুলোকে সামরিক হাসপাতালে পরিণত করেও সব রুগ্ন ও আহত সৈন্যদের স্থান-সংকুলান করা যাচ্ছে না, তবু ক্রেমসের দৃঢ়তায় এবং মৰ্তিয়েরের বিরুদ্ধে জয়লাভের ফলে সৈন্যদের মনোবল যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। গোটা বাহিনীর মধ্যে এবং হেডকোয়ার্টারে এমন সব ভুল গুজব মহা আনন্দে ছড়িয়ে পড়েছে যে রাশিয়া থেকে নতুন নতুন সৈন্যদল আসছে, অস্ট্রিয় বাহিনী অনেক জায়গায় বিজয়ী হয়েছে, এবং ভীত বোনাপার্ত পিছু হটতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের সময় প্রিন্স আন্দ্রু অস্ট্রিয়ার সেনাপতি শমিডের সঙ্গে সঙ্গেই ছিল। সেনাপতি শমিড যুদ্ধে মারা গেছে। প্রিন্স আর ঘোড়াটা চোট পেয়েছে, আর তার নিজের হাতটাও বুলেটে কিছুটা ছড়ে গেছে। প্রধান সেনাপতির বিশেষ অনুগ্রহের প্রতীক হিসেবে যুদ্ধে জয়লাভের সংবাদ দিতে তাকেই পাঠানো হয়েছে অস্ট্রিয়ার রাজদরবারে। ফরাসিদের আক্রমণের ভয়ে রাজ-দরবার এখন ভিয়েনা থেকে ব্রুনে স্থানান্তরিত হয়েছে। দেখতে রোগা-পটকা হলেও প্রিন্স আল্লু অনেক পেশীবহুল শক্তিমানের চাইতে অনেক বেশি শারীরিক ধকল সহ্য করতে পারে। যুদ্ধের রাতেই দখতুরভের (একজন রুশ সেনাপতি) কাছ থেকে চিঠিপত্র নিয়ে সে যখন কেমসে কুতুজভের কাছে পৌঁছেছিল তখনই একটা বিশেষ চিঠি নিয়ে তাকে পাঠানো হল ব্রুনে। এই পাঠানোর অর্থ শুধু একটা পুরস্কার প্রাপ্তিই নয়, পদোন্নতির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও বটে।
