সে বলল, কেন বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছ ক্যাপ্টেনঃ ঘোড়া থেকে নেমে পড়।
ঘোড়ার পিঠে নড়েচড়ে বসে ভাঙ্কা দেনিসভ বলল, আঃ! প্রতিটি বুলেটের বিনিময়ে আছে একখানি প্রেমপত্র।
ইতিমধ্যে নেসভিৎস্কি, ঝেরকভ ও অফিসারটি গোলাগুলির পাল্লার বাইরে একত্রে দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়েছি। একবার দেখল, হলুদ শাকো মাথায়, কর্ড-বসানো গাঢ় সবুজ কুর্তা ও নীল রাইডিং-ব্রিচেস পরা ছোট একদল সৈন্য সেতুর কাছে ভিড় করে আছে; আবার দেখল, দূরে বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে আসছে অনেক নীল ইউনিফর্ম অশ্বারোহীর দল; সহজেই চেনা যায় একটা গোলন্দাজ বাহিনী।
ওরা কি সেতুটাকে জ্বালিয়ে দেবে না? কে ওখানে আগে পৌঁছবে? তারাই আগে গিয়ে সেতুটাকে উড়িয়ে দেবে, নাকি ফরাসিরাই ছররা গোলার পাল্লার মধ্যে পেয়ে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে? সেতুর উপরকার উঁচু জমিতে দাঁড়িয়ে সেনাদলের প্রতিটি মানুষই ভগ্নহৃদয়ে এই একই প্রশ্ন নিজেকে করছে, আর সন্ধ্যার উজ্জ্বল আলোয় দেখছে-একদিকে সেতু ও হুজারদের, এবং অন্যদিকে বেয়নেট ও কামান নিয়ে অগ্রসরমান নীল কুর্তার দলকে।
আঃ! হুজাররাই মার খাবে! তারা এখন ছররার পাল্লার মধ্যে এসে গেছে, নেসভিৎস্কি বলল।
এত লোক সঙ্গে নেওয়া তার উচিত হয় নি, অফিসারটি বলল।
নেসভিৎস্কি জবাব দিল, সেটা সত্যি; দুটি চালাক-চতুর ছেলেই এ কাজ ভালোভাবে করতে পারত।
হুজারদের দিকে চোখ রেখে ঝেরকভ বলল, আহা, ইয়োর এক্সেলেন্সি, আপনার কি দৃষ্টি! দুই জনকে পাঠাবেন? আর তাহলে কে আমাদের ভাদিমির মেডেল ও ফিতে দিত? আর এখন, ওরা যদি কচুকাটাও হয়ে যায়, তবু হয়তো স্কোয়াড্রনটির নাম খেতাবের জন্য সুপারিশ করা হবে, আর উনি একটা ফিতে পাবেন। কি করে কাজ বাগাতে হয় সেটা আমাদের বোগদানিচ জানে।
অফিসারটি বলল, ওই দেখুন! ঐ একটা ছররা গোলা!
ফরাসিদের কামানের সামনের অংশগুলি খুলে তাড়াতাড়ি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। সেটা দেখিয়ে অফিসারটি কথাটা বলল।
ফরাসি পক্ষের কামানবাহী সেনাদলের মধ্যে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখা গেল; তারপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় কুণ্ডলিও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল; আর প্রথম গোলা ফাটার শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই চতুর্থ কুণ্ডলিও দেখা গেল। তারপরই পর পর দুটো, ও তৃতীয় শব্দটি শোনা গেল।
ওঃ! ওঃ। যেন ভীষণ কষ্ট হচ্ছে এমনিভাবে অফিসারটির হাত চেপে ধরে নেসভিৎস্কি আর্তনাদ করে উঠল। দেখুন, একটা সৈন্য পড়ে গেল! পড়ে গেল, পড়ে গেল!
আমার মনে হচ্ছে দুজন।
আমি জার হলে কখনো যুদ্ধে যেতাম না, মুখ ফিরিয়ে নেসভিৎস্কি বলল।
ফরাসি কামানগুলিতে তাড়াতাড়ি নতুন করে গোলা ভরা হল। নীল ইউনিফর্মধারী পদাতিক সৈনিকরা এক দৌড়ে সেতুর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। নিয়মিত বিরতির ফাঁকে ফাঁকে ধোঁয়া উঠতে লাগল, আর ছররা এসে সেতুর উপর ফাটতে লাগল। কিন্তু এবার ধোয়ার ঘন মেঘ উঠতে থাকায় সেখানে কি ঘটছে তা নেসভিৎস্কি দেখতে পেল না। হুজাররা সেতুতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, আর ফরাসি কামান থেকে তাদের লক্ষ্য করেই গোলা ছুড়ছে; তাদের উদ্দেশ্য হুজারদের বাধা দেওয়া হয়; যেহেতু কামান সাজানো হয়েছে এবং কোনো একটা লক্ষ্যবস্তুও পাওয়া গেছে তাই গোলা ছোঁড়া হচ্ছে।
হুজাররা যার যার ঘোড়র কাছে ফিরে আসবার আগেই ফরাসিরা তিন দফা ছররা ছুঁড়বার মতো সময় পেল। দুটোর নিশানা ঠিক হয় নি, গোলাগুলো অনেক উঁচ দিয়ে চলে গেল, কিন্তু তৃতীয় রাউন্ডটি পড়ল একদল হুজারের মাঝখানে এবং তাদের তিনজনকে ফেলে দিল।
বোগদানিচের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের চিন্তায়ই মগ্ন হয়ে ছিল রস্তভ। কি করবে বুঝতে না পেরে সে সেতুর উপরেই দাঁড়িয়ে ছিল। কচুকাটা করবার মতো কেউ সেখানে ছিল না, আর সেতুতে আগুন লাগাবার কাজেও সে সাহায্য করতে পারছিল না, কারণ অন্য সৈন্যদের মতো সে আগুন জ্বালাবার খড় সঙ্গে নিয়ে আসে নি। দাঁড়িয়ে চারদিক দেখছিল এমন সময় সেতুর উপর নাট খুলবার মতো একটা শব্দ হল আর তার একবারে কাছের হুজারটি আর্তনাদ করে রেলিংয়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ল। অন্য সকলের সঙ্গে রস্তভও দৌড়ে তার। কাছে গেল। একজন চেঁচিয়ে বলল, স্ট্রেচার! চারজন এস হুজারটিকে ধরে উঁচু করে তুলল।
উঃ! খৃস্টের দোহাই, আমাকে একা থাকতে দাও! আহত লোকটি চিৎকার করে বলল। তবু তাকে তুলে স্ট্রেচারে শুইয়ে দেওয়া হল।
নিকলাস রস্তভ সেখান থেকে সরে গেল। যেন কোনো কিছু খুঁজছে এমনিভাবে সে বহুদূরে, দানিয়ুবের জলরাশির দিকে, আকাশের দিকে, সূর্যের দিকে তাকাল। আকাশটা কী সুন্দর দেখাচ্ছে কত নীল, কত শান্ত, কত গভীর! অস্তগামী সূর্যটা কী উজ্জ্বল ও গৌরবময়! অনেক দূরের দানিয়ুবের জল কী সুন্দর ঝিলমিল করছে। তার চেয়েও বেশি সুন্দর নদীর ওপারের বহুদূরের নীল পর্বতমালা, মঠটা, রহস্যময় গিরিখাদগুলি, আর কুয়াশা ঢাকা পাইনের সারি।…কী শান্তি, কী সুখ। রস্তভ মনে মনে বলল, ওখানে যেতে পারলে আর কিছুই আমি চাই না, কিন্তু এখানে…আর্তনাদ, যন্ত্রণা, আতংক, আর এই অনিশ্চয়তা ও ছুটাছুটি… ঐ–আবার তারা চেঁচাচ্ছে, আবার সকলে ছুটে পালাচ্ছে, আর আমিও তাদের সঙ্গে ছুটব, আর এখানে আমার মাথার উপরে ও চারদিকে আছে মৃত্যু…আর একটিমাত্র মুহূর্ত পার হতেই এই সূর্য, এই জল, এই গিরিখাদ–কিছুই আর আমি দেখতে পাব না।…
