ঝেরকভের উঁচু-কাঁধ মূর্তিটা ঘোড়ায় চেপে কর্নেলের সামনে হাজির হল। হেড-কোয়ার্টার থেকে কিছু না করেই বেশ মোটা বকশিস কামানো যায় তখন যুদ্ধক্ষেত্রে চাকরের খাটুনি খাটবার মতো বোকা সে নয়; তাই সে প্রিন্স ব্যাগ্রাশনের অধীনে একটা আর্দালি-অফিসারের কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। পশ্চাদ্বর্তী রক্ষীদলের কমান্ডারের একটা হুকুম বয়েই সে এখন তার প্রাক্তন প্রধানের কাছে এসেছে।
বিষণ্ণ গাম্ভীর্যের ভাব দেখিয়ে চারদিককার সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে রস্তভের শত্রুকে লক্ষ্য করে সে বলল, কর্নেল, এখানে থেকে সেতুটাকে গোলা ছুঁড়ে উড়িয়ে দেবার হুকুম হয়েছে।
হুকুমটা কার উপর? কর্নেল জিজ্ঞাসা করল।
ঝেরকভ গম্ভীর গলায় বলল, কার উপর সেটা আমি নিজেও জানি না; প্রিন্স আমাকে বললেন; তুমি গিয়ে কর্নেলকে বল, হুজাররা যেন তাড়াতাড়ি ফিরে যায় এবং সেতুটাকে উড়িয়ে দেয়।
ঝেরকভের ঠিক পরেই সেই দলের একজন অফিসারও সেই একই হুকুম নিয়ে হুজার কর্নেলের কাছে ছুটে এল। তার পরেই একটা কসাক ঘোড়া ছুটিয়ে হাজির হল নেসভিৎস্কি।
আসতে আসতেই সে চিৎকার করে বলল, এটা কি হল কর্নেল? আমি আপনাকে বললাম সেতুটা উড়িয়ে দিতে, আর এদিকে কে একজন গিয়ে সব ভণ্ডুল করে দিয়েছে; সেখানে তারা একেবারে ল্যাজে-গোবরে করে বসেছে; কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
কর্নেল ইচ্ছা করেই রেজিমেন্টকে থামিয়ে নেসভিস্কির দিকে মুখ ফেরাল।
বলল, আপনি আমাকে দাহ্য পদার্থের কথা বলেছেন, কিন্তু সেতু উড়িয়ে দেবার কথা তো বলেন নি।
আরো কাছে এসে টুপিটা খুলে হাত দিয়ে ঘামে ভেজা চুলটাকে পাট করতে করতে নেসভিৎস্কি বলল, কিন্তু প্রিয় মহাশয়, দাহ্য পদার্থগুলি যখন যথাস্থানে রাখা হল তখন কি আমি আপনাকে সেতু লক্ষ্য করে গোলা ছুঁড়তে বলি নি?
মি. স্টাফ-অফিসার, আমি আপনার প্রিয় মহাশয় নই, আর আপনি আমাকে সেতুটা জ্বালিয়ে দিতে বলেন নি! আমার কাজ আমি বুঝি, আর কঠোরভাবে হুকুম তামিল করাই আমার রীতি। আপনি বলেছিলেন সেতুটা জ্বালিয়ে দিতে হবে, কিন্তু কে জ্বালাবে সেটা আমি বুঝতে পারি নি।
নেসভিৎস্কি হাত নেড়ে বলল, আঃ, সবসময় এই হয়ে থাকে! ঝেরকভের দিকে ঘুরে বলল, তুমি এখানে এলে কেমন করে?
ঐ একই কাজে। কিন্তু তুমি যে ঘামে একেবারে ভিজে গেছ।
অসন্তুষ্ট গলায় কর্নেল বলতে লাগল, মি. স্টাফ-অফিসার, আপনি বলছিলেন…
অফিসারটি বাধা দিয়ে বলল, কর্নেল, জলদি করুন, নইলে শত্রুপক্ষ কামান সাজিয়ে ছররা চালাতে শুরু করবে।
নীরবে অফিসারের দিকে, স্টাফ-অফিসারের দিকে ও ঝেরকভের দিকে তাকিয়ে কর্নেল ভুরু কুঁচকাল।
গম্ভীর গলায় বলল, আমি সেতুটাকে জ্বালিয়ে দেব। যেন সে বলতে চাইল, যত অপ্রীতিকর অবস্থাই সহ্য করতে হোক না কেন তবু সে সঠিক কর্তব্যই পালন করবে।
যেন ঘোড়াটারই যত দোষ এমনিভাবে পেশীবহুল পা দিয়ে সেটাকে ঠোক্কর মেরে কর্নেল এগিয়ে গিয়ে হুকুম দিল, যে দুই নম্বর স্কোয়াড্রনে রস্তভ দেনিসভের অধীনে কর্মরত ছিল সেটাকে সেতুর কাছে ফিরে যেতে হবে।
রস্তভ নিজের মনে বলল, দেখ, আমি যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই হল। তার হৃৎপিণ্ডটা সংকুচিত হয়ে সব রক্ত মুখে উঠে গেল। আমি ভীরু কি না সেটা সে ভালো করে দেখুক! সে ভাবল।
স্কোয়াড্রনের সকলের উজ্জ্বল মুখের উপরেই আবার নেমে এল যুদ্ধকালীন গাম্ভীর্য। রস্তভ বেশ ভালো করে তার শক্র কর্নেলকে দেখতে লাগল; কর্নেল কিন্তু একবারও রশুভের দিকে তাকাল না; তার মুখ গম্ভীর, কঠোর। তারপরই শোনা গেল হুকুম।
তার চারপাশে কয়েকজন বলে উঠল, সোজা তাকাও! সোজা তাকাও! কী করতে হবে বুঝতে না পেরে হাতে তলোয়ার নিয়ে পাদানিতে শব্দ করে হুজাররা তাড়াতাড়ি ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল। সৈন্যরা ক্রুশ-চিহ্ন আঁকতে লাগল। রস্তভ এখন আর কর্নেলকে দেখছে না; সময় নেই। পাছে সে হুজারদের পিছনে পড়ে যায় এই ভয়ে তার হৃৎপিণ্ডটা যেন থমকে থেমে গেছে। আর্দালির হাতে ঘোড়াকে তুলে দেবার সময় তার নিজের হাতই কাঁপতে লাগল; মনে হল, সব রক্ত বুঝি তার হৃৎপিণ্ডে এসে জমে যাবে।
দেনিসভ ঘোড়ার পিঠে পিছনে হেলে কি যেন বলতে বলতে চলে গেল। হুজারদের ছাড়া আর কাউকে রস্তভ দেখতে পাচ্ছে না; হুজাররা তার চারপাশে ছুটছে, তাদের পাদানির কাঁটায় শব্দ হচ্ছে, তাদের তলোয়ার বাজছে ঝন ঝন করে।
চোর! পিছন থেকে কে একজন চিৎকার করে উঠল।
স্ট্রেচার ডাকার মানে কি তা চিন্তা না করে রস্তভ ছুটেই চলল; সে চাইছে সকলের আগে যেতে; কিন্তু ঠিক সেতুর মুখে মাটির দিকে চোখ না থাকায় খানিকটা পিচ্ছিল কাদায় তা পা হড়কে গেল; সে হাতের উপর পড়ে গেল। অন্যরা তাকে পেরিয়ে চলে গেল।
ক্যাপ্টেন, দুদিক দিয়ে, কর্নেলের গলা কানে এল। ঘোড়া ছুটিয়ে সেতুর কাছে পৌঁছে সে সহাস্য মুখে থেমে পড়েছে।
কাদা-মাখা হাত দুটো ব্রিটেসে মুছে রস্তভ তার শত্রুর দিকে তাকাল; যতটা এগিয়ে যাওয়া যায় ততই ভালো এই কথা ভেবে আবার দৌড়তে শুরু করবে এমন সময় বোগদানিচ রশুভের দিকে না তাকিয়ে বা তাকে
চিনেই চেঁচিয়ে বলল, সেতুর মাঝখান দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে কে? ডাইনে যাও। ক্যাডেট, ফিরে এস! রেগে চিৎকার করে কথাগুলি বলে সে দেনিসভের দিকে মুখটা ফেরাল। দেনিসভও সাহস দেখাবার জন্য সেতুর কাঠোর উপর ঘোড়া তুলে দিয়েছে।
