জীবন ও মৃত্যু মধ্যবর্তী সীমান্তস্বরূপ এই রেখাঁটি অতিক্রম করে এক পা বাড়ালেই অনিশ্চয়তা, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর রাজত্ব। কি আছে ওখানে? কে আছে ওখানে?-সূর্যের আলোয় আলোকিত ঐ প্রান্তর, ঐ গাছ ও ঐ ছাদের ওপারে? কেউ তা জানে না, কিন্তু সকলেই জানতে চায়। মনে ভয়, তবু ঐ সীমারেখা তুমি পার হতেই চাও; কারণ মৃত্যুর ওপারে কি আছে তা যেমন একদিন তোমাকে অনিবার্যভাবে জানতেই হবে, ঠিক তেমনি তুমি এটাও জান যে আগে হোক পরে হোক ঐ সীমারেখা তোমাকে পার হতেই হবে, তার ওপারে কি আছে তাও জানতেই হবে। তবু তুমি শক্তিমান, স্বাস্থ্যবান, ফুর্তিবাজ, উত্তেজনাপ্রবণ, আর তোমার চারপাশেও রয়েছে তেমনি সব মানুষের দল। সুতরাং শত্রুপক্ষকে দেখতে পেলেই মনে ভাবনা জাগে, অনুভূতি জাগে, আর সেই অনুভূতি সেই মুহূর্তের সবকিছুকেই একটা নতুন আকর্ষণ ও তীব্রতায় ভরে দেয়।
শত্রুপক্ষ যে উঁচু জায়গাটায় রয়েছে সেখান থেকে কামানের ধোঁয়া উঠল, আর একটা গোলা শো করে হুজার বাহিনীর মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। যে অফিসাররা এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। তারা ঘোড়া ছুটিয়ে যার যার জায়গায় চলে গেল। হুজাররা সতর্কতার সঙ্গে ঘোড়াগুলিকে যথাস্থানে সাজাতে লাগল। গোটা স্কোয়াড্রন যেন থমথম করছে। সকলেই তাকিয়ে আছে সামনের শত্রুপক্ষের দিকে আর স্কোয়াড্রন-কমান্ডোর দিকে; কখনো হুকুম আসবে তারই প্রতীক্ষায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোলাও পাশ দিয়ে উড়ে গেল। লক্ষ্য অবশ্যই হুজাররা, কিন্তু গোলাগুলি দ্রুত সশব্দ গতিতে অশ্বারোহী সৈনিকদের মাথার উপর দিয়ে দূরে কোথাও গিয়ে পড়ল। হুজাররা পিছন ফিরে তাকাল না, কিন্তু যেমন প্রতিটি গোলার শব্দের সঙ্গে, তেমনি প্রতিটি হুকুমের সঙ্গে, গোটা স্কোয়াড্রনের প্রতিটি মানুষ রুদ্ধশ্বাসে একবার পাদানিতে দাঁড়িয়েই আবার বসে পড়ল। পরস্পরের মুখের ভাব লক্ষ্য করবার কৌতূহলে প্রতিটি সৈনিক ঘাড় বেঁকিয়ে একে অন্যকে দেখতে লাগল। দেনিসভ থেকে শুরু করে বিউগলবাদক পর্যন্ত প্রতিটি মুখের উপরই একই দ্বন্দ্ব, বিরক্তি ও উত্তেজনার প্রকাশ। কোয়ার্টার মাস্টার ভুরু কুঁচকে এমনভাবে সৈনিকদের দিকে তাকাতে লাগল যেন তাদের শাস্তির ভয় দেখাচ্ছে। যতবার গোলা ছুটছে ক্যাডেট ততবারই মাথাটা নিচু করছে। বাঁদিকে রয়েছে রস্তভ তার খোঁড়া অথচ সুন্দর ঘোড়া রুকের পিঠে চড়ে; তার মুখে এমন খুশি-খুশি ভাব যেন কোনো স্কুলের ছাত্রকে পরীক্ষার জন্য অনেক লোকের সামনে ডাকা হয়েছে, আর সে নিশ্চিত জানে যে পরীক্ষায় সে ভালো ফল করবেই। পরিষ্কার, উজ্জ্বল চোখ তুলে সে সকলের দিকে তাকাচ্ছে; যেন বলছে, তোমরা দেখ কেমন শান্তভাবে আমি আগুনের নিচে বসে আছি। কিন্তু এত চেষ্টা সত্ত্বেও তার মুখেও একটা নতুন ও কঠোর কিছুর আভাস ফুটে উঠেছে।
ওখানে কে মাথা নোয়াচ্ছ হেঃ ক্যাডেট মিয়োনভ! ওটা ঠিক নয়! আমার দিকে তাকাও, দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল। এক জায়গায় চুপ করে থাকতে না পেরে সে স্কোয়াড্রনের সামনে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ভাস্কা দেনিসভের কালো, লোমশ, থ্যাবড়া নাক, বেঁটে শক্ত শরীর, পেশীবহুল লোমশ হাতের মোটা মোটা আঙুলে খোলা তলোয়ার শক্ত করে ধরা। তাকে ঠিক সেইরকম স্বাভাবিকই দেখাচ্ছে যেরকমটি দেখায় সন্ধ্যার দিকে দুটো বোতল সাবাড় করবার পরে; তবে একটু বেশি লাল দেখাচ্ছে এই যা তফাৎ। জলপানরত পাখিদের মতো ঝাঁকড়া-চুল মাথাটাকে পিছনে ঠেলে দিয়ে, ভালো ঘোড়া বেদুইনের পেটে নির্মমভাবে পায়ের কাঁটা ইকে, এবং পিছনে ঝুঁকে ঘোড়ার পিঠে বসে সে স্কোয়াড্রনের অন্য পাশে জোর কদমে ছুটে গিয়ে কর্কশ গলায় সৈন্যদের পিস্তলের দিকে চোখ রাখবার হুকুম দিল। তারপর ছুটে গেল কারস্তেনের কাছে। চওড়া-পিঠ ঘোটকিটার পিঠে চেপে স্টাফ-ক্যাপ্টেন তার দিকে এগিয়ে গেল। তার লম্বা মুখখানা যথারীতি বেশ গম্ভীর, শুধু চোখ দুটো একটু বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
দেনিসভকে বলল, আরে, এ সব কি হচ্ছে? যুদ্ধ তো শেষপর্যন্ত হবেই না। দেখবে–আমরাই সরে যাব।
দেনিসভ বলল, ওদের মাথায় যে কি আছে তা শুধু শয়তানই জানে! রশুভের উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আরে রস্তভ, শেষপর্যন্ত পেয়েছ তাহলে।
তাকে হাসতে দেখে রস্তভও খুশি হল। ঠিক সেই সময় কমান্ডার সেতুর উপর এসে দাঁড়াল। দেনিসভ তার দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, আসুন আমরাই আক্রমণ করি! আমিই ওদের তাড়াব।
যেন একটা বিরক্তিকর মাছি তাড়াচ্ছে এমনিভাবে নাকটাকে উঁচু করে কর্নেল বিক্তিকর গলায় বলল, আক্রমণই বটে! তোমরা এখানে থেমে আছ কেন? দেখতে পাচ্ছ না, গোলযোগকারীরা পিছনে সরে যাচ্ছে? তোমার স্কোয়াড্রনকে পিছিয়ে নিয়ে যাও।
স্কোয়াড্রন সেতু পার হয়ে কামানোর পাল্লার বাইরে চলে গেল। একটি সৈনিকও মারা যায় নি। সামনের সারির স্কোয়াড্রনটাও তাদের অনুসরণ করল। শেষ কসাকটিও নদী পেরিয়ে চলে গেল।
দুটি পাভলোগ্রাদ স্কোয়াড্রন সেতু পার হয়ে একে একে পাহাড়ে উঠে গেল। তাদের কর্নেল বোগদানিচ শুবার্ট দেনিসভের স্কোয়াড্রনের কাছে পৌঁছে পায়ে-হাঁটার গতিতে ঘোড়া চালাতে লাগল। রস্তভও কাছাকাছিই চলেছে; কিন্তু তেলিয়ানিনকে নিয়ে দুজনের মধ্যে সাক্ষাতের পরে এই তাদের প্রথম দেখা হলেও বোগদানিচ রশুভের দিকে ফিরেও তাকাল না। রস্তভও কর্নেলের চওড়া পিট, হাল্কা চুলে ঢাকা ঘাড় ও লাল গলার দিকেই তাকিয়ে রইল। রশুভের মনে হল, বোগদানিচ তাকে না দেখার ভান করেছে মাত্র ক্যাডেটের সাহস পরীক্ষা করাই তার আসল লক্ষ্য; তাই সেও নিজেকে সংযত করে খুশি মনে চারদিকে তাকাতে লাগল; পরক্ষণেই তার আবার মনে হল, নিজের সাহস দেখাবার জন্যই বোগদানিচ তার এত কাছাকাছি ঘোড়া চালাচ্ছে। তারপরেই আবার ভাবল, তাকে অর্থাৎ রশুভকে শাস্তি দেবার জন্যই এই শত্ৰুটি প্রচণ্ড আক্রমণের জন্য একটি স্কোয়াড্রনকে পাঠাবে। তারপরেই কল্পনা করল, আক্রমণের পরে সে যকন আহত অবস্থায় পড়ে থাকবে তখন বোগদানিচ তার কাছে এগিয়ে এসে উদারতার সঙ্গে ব্যাপারটা মিটমাট করে ফেলবে।
