নেসভিৎস্কি খুশি হয়ে জবাব দিল, আরে, ভাস্কা! হল কী তোমার?
আরে, সৈন্যদল এগোতে পারছে না, ভাস্কার দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল; শাদা দাঁতগুলি হিংস্রভাবে বেরিয়ে পড়েছে; কালো আরবি ঘোড়াটার গায়ে বারবার পায়ের কাঁটা দিয়ে ঠুকছে; আর ঘোড়াটাও নাক ডাকিয়ে শাদা ফেনা ছুটিয়ে এমনভাবে ক্ষুর দিয়ে সেতুর কাঠের উপর পা ঠুকছে যেন অশ্বারোহী আপত্তি না জানালে সে রেলিংয়ের উপর দিয়ে ঝাঁপ দিতেও রাজি। এবার সত্যি সত্যি খাপ থেকে তলোয়ার খুলে ঘোরাতে ঘোরাতে সে চেঁচিয়ে উঠল, এসব কি? যত সব ভেড়ার দল। একেবারে ভেড়া! ভাগ হিয়াসে!…আমাদের যেতে দে!…এই গাড়িওলা শয়তান, গাড়ি থামা! নইলে দেব তলোয়ারের এক কোপ!
ভয়ার্ত মুখে একে অন্যের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে জনতা পথ করে দিল। দেনিসভ নেসভিৎস্কির কাছে এল।
ঘোড়া নিয়ে কাছে এলে নেসভিৎস্কি বলল, কি ব্যাপার, এখনো মাল পেটে পড়ে নি?
ভাস্কা জবাব দিল, এক পাত্রও মুখে দেবার সময় পাই নি। সারাদিন রেজিমেন্টকে নিয়ে টানা-হাচড়া করছে। ওরা যদি যুদ্ধই চায় তো যুদ্ধ হোক। কিন্তু এসব কি হচ্ছে তা শয়তানই জানে।
দেনিসভের নতুন আলখাল্লা আর নিজের কাপড় দেখে নেসভিৎস্কি বলল, তোমাকে যে একেবারে ফুলবাবুটি দেখাচ্ছে!
দেনিসভ হাসল। তলোয়ারের হাতলের নিচ থেকে একটা রুমাল বের করে নেসভিৎস্কির নাকে কাছে ধরল। রুমালটা গন্ধে ভুরভুর করছে।
বুঝতেই তো পারছ, যুদ্ধে চলেছি। দাড়ি কামিয়েছি, দাঁত বুরুশ করেছি, গায়ে গন্ধ ঢেলেছি।
একে নেসভিৎস্কির দশাসই চেহারা ও তার পিছনে কাক অনুচর, তার উপর দেনিসভের তলোয়ার ঘোরানো ও অবিশ্রাম চিৎকার–এসব দেখেশুনে ভিড়ের লোকজনরা এতই হকচকিয়ে গেল যে তারা দুজন ভিড়ের ভিতর দিয়ে পথ করে সেতুর একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেল এবং পদাতিক বাহিনীকে থামিয়ে দিল। সেতুর পাশেই কর্নেলকে দেখতে পেয়ে নেসভিৎস্কি হুকুম-নামটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে গেল।
পথ পরিষ্কার করে নিয়ে দেনিসভ সেতুর শেষ প্রান্তে গিয়ে থামল। ঘোড়ার রাশটা হাতে ধরে সে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, তার অধীনস্ত সেনাদলটি ক্রমেই এগিয়েই আসছে। সেতুর কাঠের উপর অনেকগুলি ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল; সামনে অফিসাররা ও তাদের পিছনে চারজন করে সৈন্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেনাদল তার দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল।
যে পদাতিক বাহিনীকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল তারা সেতুর কাছে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিদ্বেষ, বিরক্তি ও ঠাট্টার মনোভাব নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে-চলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হুজারদের দিকে তাকিয়ে রইল; বিভিন্ন বিভাগের সৈন্যরা সাধারণত এই রকম মনোভাব নিয়েই পরস্পরকে দেখে থাকে।
একজন বলল, সব ফুলবাবুর দল! যেন মেলা দেখতে চলেছে!
কোন কাজে লাগবে ওরা? সবই তো কেবল দর্শনধারী। আর একজন বলল।
ঘোড়ার ক্ষুর থেকে কয়েকটি পদাতিকের গায়ে কাদা ছিটকে দিয়ে একজন হুজার ঠাট্টা করে বলল, এই পদাতিক, ধুলো উড়িয়ে না!
হাতের আস্তিন দিয়ে মুখের কাদা মুছতে মুছতে একজন পদাতিক সৈন্য বলল, কাঁধে বোঁচকা চাপিয়ে তোমাকে দুদিনের মার্চে পাঠাতে বড়ই ইচ্ছা করে। বাহারে পোশাকের তাহলে বারোটা বেজে যেত। মৌজ করে এমনভাবে বসে আছ যে পক্ষী কি মানুষ তা বোঝা বার।
পিঠের বোঝার চাপে নুয়ে-পড়া একটি ছোটখাট সৈন্যকে লক্ষ্য করে কর্পোরাল বলল, আরে জিকিন, ওদের তো উচিত ছিল তোমাকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে নেওয়া।
একজন হুজার চেঁচিয়ে বলল, দুই পায়ের ফাঁকে একটা লাফি ভরে নাও, তাহলেই তো ঘোড়া পেয়ে যাবে!
*
অধ্যায়-৮
পদাতিক বাহিনীর শেষ সৈনিকটি পর্যন্ত গায়ে গায়ে লেগে যেন একটা ফানেলের ভিতর দিয়ে ঢুকছে এমনি ঘন হয়ে সেতুটা পার হয়ে গেল। অবশেষে মালগাড়িগুলোও পার হয়ে গেল, হৈ-চৈ কমে এল, শেষ সেনাদলটিও সেতুর উপর উঠে এল। শুধু দেনিসভের শেষ হুজার দলটি শত্রুপক্ষের মোকাবিলা করবার জন্য সেতুর এপারে থেকে গেল। অপর তীরের পাহাড়ের উপর থেকে শত্রুপক্ষকে দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু সেতুর উপর থেকে এখনো তাদের দেখা যাচ্ছে না; কারণ যে উপত্যাকাটার ভিতর দিয়ে নদীটা বয়ে চলেছে, মাত্র আধ মাইল দূর থেকেই তার বুকে অনেকগুলি ঢিবি গড়ে উঠে দিগন্ত-রেখাটা গড়ে উঠেছে। পাহাড়ের নিচে যে পতিত জমিটা রয়েছে তাতে আমাদেরই কয়েক দল কসাক, স্কাউট চলাফেরা করছে। হঠাৎ উঁচু জমির মাথায় কামান-বন্দুক ও নীল ইউনিফর্ম পরা সৈন্যদের দেখা গেল। একদল কসাক স্কাউট জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে নিচে নেমে গেল। দেনিসভের সেনাদলের সব অফিসার ও সৈন্যরা অন্য বিষয়ে কথা বলতে ও অন্য দিকে তাকাতে চেষ্টা করলেও তারা শুধু পাহাড়ের উপরকার কথাই চিন্তা করতে লাগল, এবং দিগন্তরেখা বরাবর যে দৃশ্য ফুটে উঠছে সেই দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখল, কারণ তারা জানে যে ওরা শত্রুসৈন্য। দুপুরের পর থেকে আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে গেছে; উজ্জ্বল সূর্য ক্রমেই দানিয়ুব নদী ও চতুর্দিকের কালো পাহাড়ের বুকে নেমে যাচ্ছে। একদিকে সেনাদল, অন্যদিকে শত্রুপক্ষ-এই দুইয়ের মাঝখানটা প্রায় ফাঁকা। দুইয়ের মাঝখানে মাত্র সাত গজের মতো ফাঁকা জায়গার ব্যবধান। শত্রুপক্ষ গোলাবষর্ণ থামিয়ে দিয়েছে; তাই দুই বিরোধী সৈন্যদলের মধ্যবর্তী কঠোর, ভয়াল, অগম্য ও স্পর্শাতীত রেখাঁটি যেন আরো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
