কসাকটি হতাশ হয়ে বলল, যেন একটা বাঁধ ভেঙেছে। এমন আর কত আসবে হে তোমরা?
ছেঁড়া কোট পরা একটি রসিক সৈনিক চোখ টিপে জবাব দিল, একজন কম দশ লাখ হে! বলতে বলতে চলে গেল; তার পিছন পিছন এল একটি বুড়ো।
বিষণ্ণ মুখে সে তার পাশের সৈন্যকে বলল, ওরা (মানে শত্রুপক্ষ) যদি এখন সেতুর উপর গুলি ছুঁড়তে শুরু করে তাহলে তোমার গা চুলকানোও ভুলিয়ে দেবে।
সে চলে গেল; গাড়ির উপর বসে আর একজন এল।
কি মুস্কিল, আমার পায়ে পডিটা কোথায় গেল? বলতে বলতে একটি আর্দালি গাড়ির পিছনে ছুটতে লাগল।
সে গাড়ি নিয়ে চলে গেলে এল একদল ফুর্তিবাজ সৈন্য; তারা এতক্ষণ মদ খাচ্ছিল।
গ্রেটকোটটাকে ভালো করে খুঁজে নিয়ে একটি সৈন্য জোরে জোরে হাত নেড়ে খুশির সুরে বলল, তারপর, বুঝলে বুড়ো, বন্দুকের কুঁদো দিয়ে ওরা ঝাড়ল একখানা তার দাঁতের উপর…।
আর একজন হো-হো করে হেসে বলল, হ্যাঁ, শুয়োরের মাংসটা ভালোই ছিল…তারাও চলে গেল। কিন্তু নেসভিৎস্কি বুঝতেই পারল না, কার দাঁত গেল, আর তার সঙ্গে শুয়োরের মাংসরই বা সম্পর্ক কি।
বাঃ! কী রকম জোর চালাচ্ছে! একটা গোলা ছুঁড়েই ভাবে সব মরে যাবে, জনৈক সার্জেন্ট রেগে গিয়ে ঘৃণার সুরে বলল।
মস্তবড় হা-ওয়ালা একটি তরুণ সৈনিক অনবরত হাসতে হাসতে বলল, আরে বাবা, ওটা যখন আমার পাশ দিয়ে উড়ে গেল, মানে আমি গোলাটার কথাই বলছি, তখন আমার মনে হল যে আমি ভয়েই মরে যাব। সত্যি বলছি, কী ভীষণ ভয়ই না পেয়েছিলাম! সে এমনভাবে কথাগুলি বলল যেন ভয় পাওয়াটাও একটা বাহাদুরির ব্যাপার।
সেও চলে গেল। তারপর এল এমন একটা গাড়ি যেটা অন্য গাড়িগুলো থেকে আলাদা। জনৈক জার্মান একটা জার্মান গাড়িকে এক জোড়া ঘোড়ায় টেনে নিয়ে চলেছে; তাতে যতরাজ্যের গৃহস্থালীর জিনিসপত্র বোঝাই। পালকের বিচানার উপরে বসে আছে স্তন্যপায়ী শিশু কোলে একটি স্ত্রীলোক, একটি বুড়ি ও একটি স্বাস্থ্যবতী লাল-গাল জার্মান মেয়ে। বোঝাই যায়, এই পলাতকরা বিশেষ অনুমতি নিয়েই চলেছে। সৈন্যদের সবগুলি চোখ তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে; গাড়িটা পায়ে হাঁটার তালে তালেই এগিয়ে চলেছে; দুটি অল্পবয়স্কাকে ঘিরেই সৈন্যদের মুখে নানারকম মন্তব্যের খই ফুটতে লাগল। সকলের মুখে একই ধরনের হাসি; তাদের অশোভন চিন্তারই প্রকাশ।
দেখ, দেখ, জার্মান চাটনিও কেমন পথ চলছে হে!
জার্মানটিকে লক্ষ্য করে একজন বলল, কুমারীটিকে আমার কাছে বেচে দাও হে। লোকটি রাগ করল, আবার ভয় পেল; চোখ নিচু করে সে সাধ্যমতো পা চালাতে লাগল।
দেখ, মেয়েটা কেমন সেজেছে! আহারে, শয়তান!
এই ফেদতভ, তোমাকে ওদের সঙ্গেই চালান করা দরকার।
আরে স্যাঙাৎ, এমন আমি কত দেখেছি!
তোমরা কোথায় চলেছ? একজন পদাতিক অফিসার জিজ্ঞাসা করল। সেও এতক্ষণ আপেল খেতে খেতে মুচকি হেসে সুন্দরী মেয়েটিকেই দেখছিল।
মেয়েটিকে একটা আপেল দিয়ে বলল, ইচ্ছা করলে এটা নাও।
মেয়েটি হেসে আপেলটা নিল। সেতুর উপরকার অন্য সকলের মতোই নেসভিৎস্কিও এতক্ষণ এই স্ত্রীলোকদের উপর থেকে একবারও চোখ ফেরায় নি। তারা চলে গেলে সেই একই সৈন্যের স্রোত বয়ে চলল, তাদের মুখে সেই একই ধরনের কথাবার্তা। শেষপর্যন্ত সকলেই থেমে গেল। যেমন প্রায়ই হয়, সেতুর শেষ প্রান্তে কোনো মালগাড়ির ঘোড়াগুলো চঞ্চল হয়ে ওঠে, আর সকলকেই থেমে যেতে হয়।
সৈন্যরা বলে উঠল, এরা সব থামল কেন? এরকম তো হুকুম ছিল না! তুমি কোন দিকে এগোচ্ছ? তোমার মাথায় শয়তান চাপুক! একটু অপেক্ষা করতে পার না? ওরা যদি সেতুটা উড়িয়ে দেয় তো বুঝবে মজা। দেখ, দেখ, একজন অফিসারও জ্যাম-জমাট হয়ে গেছে। নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল; সকলেই চাপ দিয়ে এগোতে চেষ্টা করছে সেতু থেকে বের হবার মুখটার দিকে।
সেতুর নিচে এনস নদীর দিকে তাকিয়ে নেসভিৎস্কি হঠাৎ একটা নতুন ধরনের শব্দ শুনতে পেল; একটা কি যেন দ্রুত এগিয়ে আসছে…বেশ বড়সড় একটা কিছু জল ছিটিয়ে এগিয়ে আসছে।
সেদিকে তাকিয়ে একটি সৈনিক বলল, দেখ, ওটা কোথায় যাচ্ছে!
আর একজন অস্বস্তির সঙ্গে বলল, আমাদের আরো তাড়াতাড়ি চলতে উৎসাহ দিচ্ছে।
ভিড় আবার এগিয়ে চলল। নেসভিৎস্কি বুঝতে পারল, ওটা একটা কামানের গোলা। সে হাঁক দিল, হেই কাক, আমার ঘোড়া!…এই, এবার তোমরা সব পথ ছাড়! পথ ছাড়!
অনেক কষ্টে ঘোড়র কাছে পৌঁছে অনবরত চিৎকার করতে করতে সে এগিয়ে চলল। সৈনিকরা জড়সড় হয়ে নিজেরা চেপে তাকে পথ করে দিল; কিন্তু পরক্ষণেই তারা আবার তার পা দুটোকে পর্যন্ত চেপে ধরল; যারা তার কাছে ছিল তাদেরও দোষ দেওয়া চলে না, কারণ পিছন থেকে তাদের উপরেও প্রচণ্ড চাপ পড়ছে।
নেসভিৎস্কি! নেসভিৎস্কি! এই হাঁদারাম! পিছন থেকে একটা কর্কশ গলা ভেসে এল।
নেসভিৎস্কি চারদিকে তাকাল; চলন্ত পদাতিক বাহিনীর ওপারে প্রায় পনেরো পা দূরে বাস্কা দেনিসভকে দেখতে পেল। এলোমেলো লাল চেহারা; টুপিটা কালো, মাথার পিছন দিকে পরা, আলখাল্লাটা কাঁধের উপরে ঝুলছে।
এই শয়তানগুলোকে, এই পিশাচগুলোকে বল, আমার পথ ছেড়ে দিক! রাগে গরগর করে দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল; তার কয়লা-কালো চোখের রক্ত-লাল শাদা অংশটা ঝিকমিক করে ঘুরছে; মুখের মতোই লাল খোলা হাতে সে কোষবদ্ধ তলোয়ারটাকে অনবরত ঘোরাচ্ছে।
