ইতিমধ্যে সামনে দাঁড়ানো স্টাফ-অফিসারটি সেনাপতিকে কি যেন দেখাতেই সে ফিল্ড-গ্লাসটা চোখে লাগাল।
সেনাপতি ফিল্ড-গ্লাসটা নামিয়ে কাঁদ ঝাঁকুনি দিয়ে রেগে বলে উঠল, হ্যাঁ, ঠিক তাই, ঠিক তাই। ঠিক চৌমাথার কাছে ওদের উপর গুলি ছোঁড়া হবে। ওরা ওখানে অকারণে সময় নষ্ট করছে কেন?
অপর দিকে এখন খালি চোখেই শত্রুপক্ষকে দেখা যাচ্ছে তাদের কামানশ্রেণীর উপর থেকে একটা দুধ শাদা মেঘ উঠে এল। পরক্ষণেই অনেক দূর থেকে একটা গোলার আওয়াজ ভেসে এল, আর আমাদের সৈন্যরা চৌমাথার দিকে ছুটতে লাগল।
নেসভিৎস্কি হাসতে হাসতে সেনাপতির দিকে এগিয়ে গেল।
বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সি কি একটা জলযোগ করতে ইচ্ছা করেন?
তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সেনাপতি বলল, যত সব বাজে ব্যাপার; আমাদের সৈন্যরা অকারণে সময় নষ্ট করছে।
আমি কি ঘোড়া ছুটিয়ে যাব ইয়োর এক্সেলেন্সি? নেসভিৎস্কি শুধাল।
দয়া করে তাই যাও, সেনাপতি জবাব দিল; তারপর ইতিমধ্যেই যে হুকুম বিস্তারিতভাবে জারি করা হয়েছে সেটারই পুনরাবৃত্তি করল : আর হুজারদের বলে দাও তারা যেন সকলের শেষে নদী পার হয় এবং আমার হুকুম মতো সেতুটা উড়িয়ে দেয়; আর সেতুর উপরে যে সব দাহ্য পদার্থ আছে সেগুলি অবশ্যই আর একবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
খুব ভালো কথা, নেসভিৎস্কি জবাব দিল।
সে ঘোড়াসমেত কসাককে ডাকল, ঝোলা ও ফ্লাস্কটা নামিয়ে নিতে বলল এবং একলাফে ভারী শরীরটা নিয়ে জিনের উপর চেপে বসল।
অফিসাররা সহাস্য বদনে তাকে দেখছিল। সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে সত্যি দেখা করব, এই কথা তাদের বলে সে পাহাড়ের ঘোরানো পথে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
গোলন্দাজ-অফিসারের দিকে ফিরে সেনাপতি বলল, এবার দেখা যাক ক্যাপ্টেন, জল কতদূর গড়ায়। চেষ্টা তো করুন! সময় কাটাতে একটু মজা তো করা যাবে?
অফিসার হুকুম দিল, যার যার কামানের কাছে চলে যাও।
মুহূর্তের মধ্যে সৈন্যরা ক্যাম্প-ফায়ার ছেড়ে খুশিমনে ছুটে গিয়ে কামানে বারুদ ঠাসতে লেগে গেল।
এক নম্বর। হুকুম এল।
এক নম্বর লাফ দিয়ে একপাশে সরে গেল। কান-ফাটানো ধাতব শব্দে কামানটা গর্জে উঠল, আর একটা গোলা সশব্দে আমাদের নিচেকার সৈন্যদের মাথার উপর দিয়ে ছুটে গিয়ে শত্রুর অনেক আগেই মাটিতে ছিটকে পড়ল; কোথায় পড়ল সেটা বোঝা গেল শুধু কিছুটা ধোয়া উড়তে দেখে।
সে শব্দ শুনে অফিসার ও সৈন্যদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে নিচে আমাদের সৈন্যদের চলাচল এবং অনেক দূরের আগুয়ান শত্রুপক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগল। ঠিক সেই সময় সূর্যটা মেঘের আড়াল থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এল। একটিমাত্র গোলার স্পষ্ট আওয়াজ আর উজ্জ্বল রোদের প্রসন্নতা মিলেমিশে একটি আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করল।
*
অধ্যায়-৭
ইতিমধ্যেই শত্রুপক্ষের দুটি গোলা সেতু পার হয়ে ছুটে এসে সশব্দে ফেটে পড়েছে। প্রিন্স নেসভিৎস্কি সেতুর মাঝামাঝি ঘোড়া থেকে নেমে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। দুটি ঘোড়ার রাশ ধরে যে কসাকটি তার কয়েক পা পিছনে দাঁড়িয়েছিল, তার দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে সে হাসতে লাগল। প্রিন্স নেসভিৎস্কি যতবার এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছে ততবারই সৈনিকরা ও তাদের গাড়িগুলো তাকে ঠেলে রেলিংয়ের গায়ে চেপে ধরছে; ফলে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসা ছাড়া আর কিছুই করবার ছিল না।
পদাতিক সৈন্যরা কসাকটির গাড়ির চাকা ও তার ঘোড়া দুটির উপর একেবারে চেপে এসে পড়েছে; ওদিক থেকে মালগাড়িসহ একটি রক্ষী-সৈনিক তাদের ঠেলে এগিয়ে আসতে চেষ্টা করছে দেখে কসাকটি বলে উঠল, তুমি কেমন লোক হে বাপু! এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে পার না! তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে সেনাপতি এগিয়ে যেতে চাইছেন?
রক্ষী-সৈনিকটি কিন্তু সেনাপতি কথাটা গ্রাহ্যই করল না; যে সব সৈন্য তার পথ আটকে দিয়েছিল তাদের লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে বলল, হাই বাপুরা! বাঁদিকে চেপে চল! একটু থাম। কিন্তু সৈন্যরা এমনভাবে কাঁধে-কাঁধে এক হয়ে জমে গেছে যে তাদের বেয়নেটগুলো একটা সঙ্গে আরেকটা আটকে গেছে; কাজেই তারা একটিমাত্র ঘন পদার্থের মতো সেতুর উপর দিয়ে এগোতে লাগল। রেলিংয়ের উপর দিয়ে নিচে তাকিয়ে প্রিন্স নেসভিৎস্কি দেখল, এনস নদীর ঘোট ছোট ঢেউগুলি কুলকুল শব্দে সেতুর স্তম্ভগুলির চারপাশে পাক খেতে খেতে একে অন্যকে ধাওয়া করে ছুটে চলেছে। সেতুর উপরে তাকিয়েও দেখতে পেল সৈন্যদের এক জীবন্ত স্রোত-কাঁধের পট্টি, শাকো পিঠের বোঁচকা, বেয়নেট, লম্বা বন্দুক এবং শাকোর নিচে চওড়া চোয়াল, বসে যাওয়া গাল, ক্লান্ত অবসন্ন ভাব; সেতুর কর্দমাক্ত পিচ্ছিল কাঠের উপর দিয়ে পাগুলো এগিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে সেই একঘেয়ে সৈন্যপ্রবাহের ফাঁকে ফাঁকে এনস নদীর ঢেউগুলির বুকে ছুটে-জলা শাদা শাদা ফেনার মতো এক একজন অফিসার আলখাল্লায় শরীর ঢেকে সৈন্যদের চাইতে ভিন্ন ধরনের মুখ দেখিয়ে পথ করে : এগিয়ে যাচ্ছে; কখনো বা নদীর বুকে পা-খাওয়া একটুকরো কাঠের মতো কোনো হুজার, বা আর্দালি, বা নাগরিক পায়ে হেঁটে সেই পদাতিক সৈন্যদের স্রোতে ভেসে চলেছে; আবার কখনো বা নদীর বুকে ভেসে-চলা প্রকাণ্ড কাঠের গুঁড়ির মতো অফিসারদের অথবা সৈন্যদের মালপত্রে আকণ্ঠ বোঝাই হয়ে চামড়ায় ঢাকা একটা মালগাড়ির সেতুর উপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে।
