না, বিশ্বাস করুন এটা একগুয়েমি নয়! আমার মনের ভাব আমি বুঝিয়ে বলতে পারছি না। আমি পারি না…
স্টাফ-ক্যাপ্টেন বলল, ঠিক আছে; তোমার যেমন অভিরুচি। তারপর দেনিসভকে বলল, আর সে পাজিটার কি হয়েছে?
দেনিসভ আমতা-আমতা করে বলল, সে অসুস্থতার রিপোের্ট করেছে; কালকের তালিকা থেকে তার নামটা কেটে দিতে হবে।
স্টাফ-ক্যাপ্টেন বলল, অসুস্থতা ছাড়া অন্য কোনোভাবে এটাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
রক্ত-তৃষাতুর স্বরে দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল, অসুখ হোক আর নাই হোক, সে যেন আমার সামনে না আসে। আমি তাকে খুন করে ফেলব!
ঠিক সেই সময় ঝেরকভ ঘরে ঢুকল।
নবাগতের দিকে ফিরে অফিসাররা চিৎকার করে বলল, তুমি আবার এখানে কেন?
মশাইরা, আমাদের যুদ্ধে যেতে হবে! তার পুরো বাহিনী নিয়ে ম্যাক আত্মসমর্পণ করেছে।
এ কথা সত্যি নয়!
আমি নিজে তাকে দেখেছি!
কি? আসল ম্যাককে দেখেছ? সশরীরে?
যুদ্ধ! যুদ্ধ! এমন খবর আনার জন্য ওকে একটা বোতল এনে দাও! কিন্তু তুমি এখানে এলে কেমন করে?
সেই শয়তান ম্যাকের জন্যই আমাকে রেজিমেন্টে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে। একজন অস্ট্রিয় সেনাপতি আমার নামে নালিশ করেছে। ম্যাক এখানে এলে আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম।…ব্যাপার কি রস্তভ? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র গরম জলে স্নান করে এলে।
আরে বাবা, গত দুদিন যাবৎ আমরা বড়ই গোলমালে কাটাচ্ছি।
ঘরে ঢুকল রেজিমেন্ট-অ্যাডজুটান্ট; ঝেরকভের দেওয়া সংবাদ সেও সমর্থন করল। হুকুম হয়েছে, পরদিনই তাদের যাত্রা শুরু হবে।
আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি মশাইরা!
ভালোই তো, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! বড় বেশি দিন এখানে বসে আছি।
*
অধ্যায়–৬
পথে ইন নদী (ব্রাউনাউতে) ও ব্রাউন নদীর (লিঞ্জে) সেতুগুলি ধ্বংস করে দিয়ে কুতুজভ ভিয়েনার দিকে পশ্চাপসরণ করল। ২৩ অক্টোবর রুশ বাহিনী এনস নদী পার হচ্ছে। দুপুর বেলা রাশিয়ার মালবাহী ট্রেন, কামান-বন্দুক ও সেনাদলগুলি সেতুর দুই দিক বরাবর সার বেঁধে এনস শহরের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে।
হেমন্তকালের বষর্ণসিক্ত গরম দিন। পাহাড়ের উপর সজ্জিত রুশ কামানগুলি সেতুটাকে পাহারা দিচ্ছে। সেই পাহাড়ের সামনেকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর কখনো তির্যক বৃষ্টিধারার স্বচ্ছ আবরণে ঢেকে যাচ্ছে, আবার পরমুহূর্তেই তার উপর রোদ ছড়িয়ে পড়ছে বহুদূরবর্তী জিনিসগুলিও নতুন বার্নিশ-করা দ্রব্যের মতো পরিষ্কার ঝকঝক করতে দেখা যাচ্ছে। আরো নিচে ছোট শহরটির লাল ছাদওয়ালা শাদা বাড়ি-ঘর, গির্জা ও সেতুটা দেখা যাচ্ছে; সেতুর দুই পাশে রুশ সৈন্যরা সার বেঁধে চলেছে। দানিয়ুব নদীর বাঁকে অনেক জাহাজ, একটি দ্বীপ এবং এনস ও দানিয়ুব নদীর সঙ্গম থেকে প্রবাহিত জলধারায় বেষ্টিত পার্ক সমেত একটি দুর্গও চোখে পড়ছে। আরো দেখা যাচ্ছে সবুজ তরুশীর্ষ ও নীলাভ গিরিবর্টের রহস্যময় পশ্চাৎপটে পাইন-অরণ্যে ঢাকা দানিয়ুব নদীর বামপার্শ্বস্থ পর্বতমালা। জনহীন পাইন-অরণ্যের ওপারে একটা মঠের চূড়াগুলি চোখে পড়ছে; আর এনস নদীর ওপারে বহু দূর থেকে ভেসে আসছে শত্রুপক্ষের অশ্বক্ষুরধ্বনি।
পাহাড়ের একেবারে প্রান্তে কামানশ্রেণীর মাঝখানে পশ্চাত্বতী রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেনাপতি একজন স্টাফ-অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে ফিল্ড-গ্লাসের সাহায্যে গ্রামাঞ্চলটাকে খুঁটিয়ে দেখছে। প্রধান সেনাপতি এই রক্ষীবাহিনীতেই নেসভিৎস্কিকে পাঠিয়েছে। একটু পিছনে সেও বসে আছে একটা কামানবাহী গাড়ির পিছন দিকে। তার সঙ্গী জনৈক কসাক একটি ঝোলা ও ফ্লাস্ক তার হাতে তুলে দিয়েছে, আর নেসভিৎস্কি কয়েকজন অফিসারকে পিঠে ও আসল ডোপেল-কুমেল খাওয়াচ্ছে।
অফিসাররা মনের সুখে তাকে ঘিরে আছে; কেউ হাঁটু ভেঙে বসেছে, কেউ বা তুর্কি কায়দায় ভিজে ঘাসের উপরেই বসে পড়েছে।
নেসভিৎস্কি বলছে, সত্যি, অস্ট্রিয়ার যে রাজা এই দুৰ্গটা বানিয়েছিল সে লোকটি বোকা ছিল না। চমৎকার জায়গাটা! আরে মশাইরা, আপনারা খাচ্ছেন না কেন?
এ রকম একজন মর্যাদাসম্পন্ন স্টাফ-অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে পারায় খুশি হয়ে একজন অফিসার বলে উঠল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ প্রিন্স। জায়গাটা ভারী মনোরম! পার্কটার পাশ দিয়ে আসতে আসতে আমরা দুটো হরিণ দেখতে পেয়েছি…আর বাড়িটা কী চমৎকার!
আর একজন অফিসারের আরো একটা পিঠে খাবার যথেষ্ট ইচ্ছা থাকলেও লজ্জায় সে কথা বলতে না পেরে আপাতত গ্রামাঞ্চলের সৌন্দর্য দেখার ভান করে বলল, দেখুন, দেখুন প্রিন্স, আমাদের পদাতিক সৈন্যরা এর মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে। ঐ দেখুন, গ্রামের পিছনকার ঐ মাঠটায় তাদের তিনজন কি যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা দুর্গে ঢুকবে।
তা তো ঢুকবেই, নেসভিৎস্কি বলল। তারপর সুন্দর মুখের ভিজে ঠোঁট দিয়ে একটা পিঠে চাটতে চাটতে সে আরো বলল, কিন্তু আমার ইচ্ছা করছে, লুকিয়ে ওই হোথায় চলে যেতে।
হেসে উঠে সে একটা চূড়াওয়ালা সন্ন্যাসিনীদের মঠ দেখাল; তার চোখ দুটো কুঁচকে চকচক করতে লাগল।
তাহলে ভারী মজা হত মশাইরা!
অফিসাররা হেসে উঠল।
সন্ন্যাসিনীদের একটু নাচানো যেত আর কি। শুনেছি ওদের মধ্যে কয়েকটি ইতালিয় মেয়েও আছে। সত্যি বলছি, এর জন্য জীবনের পাঁচটা বছর দিয়ে দিতে আমি রাজি আছি।
একজন সাহসী অফিসার হেসে বলল, ওদেরও তো খুব একঘেয়ে লাগছে।
