স্টাফ-ক্যাপ্টেন তার লম্বা গোঁফে ধীরে ধীরে চাড়া দিয়ে গম্ভীর গলায় কথার মাঝখানেই বলে উঠল, এক মিনিট থাম; আমার কথাটা শোন। অন্য অফিসারদের সামনে তুমি বলেছ যে একজন অফিসার চুরি করেছে…
কথাটা যে অন্য অফিসারদের সামনে শুরু হয়েছিল সে জন্য তো আমি দোষী নই। হয়তো তাদের সামনে কথাটা বলা আমার উচিত হয় নি, কিন্তু আমি তো কূটনীতিবিদ নই। তাই তো অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দিয়েছি, কারণ আমি ভেবেছিলাম এখানে কোনো রকম চাতুরির দরকার হবে না। সে বলেছে যে আমি মিথ্যাবাদী-কাজেই তাকে আমার কাছে কৈফিয়ৎ দিতে হবে… ।
ঠিক আছে। কেউ তোমাকে ভীরু ভাবছে না, কিন্তু আসল কথাটা তা নয়। একজন ক্যাডেটের পক্ষে একজন রেজিমেন্ট-কমান্ডারের কাছে কৈফিয়ৎ চাওয়াটাই অবাস্তব কি না সেটা তুমি বরং দেনিসভকেই জিজ্ঞাসা কর।
দেনিসভ চুপচাপ বসে গোঁফ কামড়াতে কামড়াতে আলোচনা শুনছিল; তাতে যোগ দেবার ইচ্ছা তার ছিল না। আপত্তিসূচক ঘাড় নেড়েই সে স্টাফ-ক্যাপ্টেনের প্রশ্নের জবাব দিল।
স্টাফ-ক্যাপ্টেন বলতে লাগল, অন্য অফিসারদের সামনে এই বাজে কথাগুলি তুমি কর্নেলকে বলেছ, আর বোগদানিচ (কর্নেলের নাম) তোমাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে।
সে আমাকে চুপ করিয়ে দেয় নি, বলেছে আমি মিথ্যা বলেছি।
বেশ তো তাই হল; তুমিও তাকে অনেক বাজে কথা বলেছ, তাই তোমাকে ক্ষমা চাইতেই হবে।
কিছুতেই না, রস্তভ চেঁচিয়ে বলল।
স্টাফ-ক্যাপ্টেন এবার গম্ভীর হয়ে কড়া গলায় বলল, তোমার কাছ থেকে আমি এটা আশা করি নি। ক্ষমা চেয়ে নেবার ইচ্ছা তোমার নেই, কিন্তু বাপু, শুধু তার কাছে নয়, গোটা রেজিমেন্টের কাছে আমাদের সকলের কাছে–তুমিই তো দোষী। ব্যাপারটা তো এই : তোমার উচিত ছিল সমস্ত ব্যাপারটা ভালো করে ভেবে পরামর্শ নেওয়া; কিন্তু তা না করে তুমি গিয়ে সকলের সামনে হৈ-চৈ শুরু করে দিলে। এ অবস্থায় কর্নেল কি করবে? অফিসারের বিচার করে গোটা রেজিমেন্টকে অপমান করবে? একটা পাজি লোকের জন্য গোটা রেজিমেন্টের অসম্মান করবে? তুমি কি সেইভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছ? আমরা সে ভাবে দেখছি না। আর বোগদানিচও কাঠ-বোকা : সে তোমাকে বলে বসল তুমি মিথ্যা কথা বলছ। ব্যাপারটা সুখের নয়, কিন্তু কি কথা করা যাবে বাপু? তুমি নিজেই গাড়ায় পা দিয়েছ। আর এখন, আমরা চাইছি ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে, অথচ অহংকারের বশে তুমি ক্ষমা চাইতে নারাজ হয়ে সমস্ত ব্যাপারটাকে জনসাধারণের সামনে হাজির করতে চাইছ। তোমার মনে আঘাত লেগেছে তা বুঝি, কিন্তু একজন প্রবীণ সম্মানিত অফিসারের কাছে ক্ষমা চাইতে দোষ কি? আর যাই হোক, বোগদানিচ একজন সম্মানিত, সাহসী, প্রবীণ কর্নেল তো বটে! তার ব্যবহারে তুমি অসন্তুষ্ট হয়েছ, কিন্তু গোটা রেজিমেন্টের অসম্মানের কথাটা একবারও ভাবলে না! স্টাফ-ক্যাপ্টেনের গলা কাঁপতে লাগল। আরে বাপু, তুমি সবে রেজিমেন্ট এসেছ; আজ এখানে আছ, কালই হয়তো অন্য কোথাও অ্যাডজুটান্ট হয়ে চলে যাবে। সেখানে কেউ যখন বলবে, পাভলোগ্রাদ অফিসারদের মধ্যে যত সব চোরের আড্ডা তখন তুমি তো খুশিতে আঙুল মটকাবে। কিন্তু আমরা তো তা পারব না! ঠিক বলি নি দেনিসভ? ব্যাপারটা এক নয়!
দেনিসভ চুপ করে রইল, কোনোরকম নড়াচড়াই করল না, তবে মাঝে মাঝে চকচকে কালো চোখ মেলে রস্তভের দিকে তাকাতে লাগল।
স্টাফ-ক্যাপ্টেন বলতে লাগল, নিজের অহংকারই তোমার কাছে বড় হল, তাই তুমি ক্ষমা চাইতে নারাজ; কিন্তু আমরা প্রবীণরা এই রেজিমেন্টে থেকেই বড় হয়েছি, আর ঈশ্বর করলে এই রেজিমেন্টেই মারাও যাব, তাই তো রেজিমেন্টের সম্মানকে আমরা মূল্য দিই, আর বোগদানিচ তা জানে। সত্যি বলছি, আমরা বুড়োরা রেজিমেন্টকে যথেষ্ট মূল্য দিই! তাই এ সব ঠিক হচ্ছে না, ঠিক হচ্ছে না! তুমি কষ্ট পাও বা না পাও, আমি সব সময় সত্যকেই আশ্রয় করি। এ ঠিক হচ্ছে না!
স্টাফ-ক্যাপ্টেন উঠে রভের কাছ থেকে চলে গেল।
লাফিয়ে উঠে দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল, ঠিক কথা! তারপর রস্তভ, তারপর!
রস্তভের মুখ একবার লাল হচ্ছে, একবার কালো হচ্ছে। সে একবার এ অফিসারের দিকে, একবার ও অফিসারের দিকে তাকাতে লাগল।
না, ভদ্রমহোদয়গণ, না…আপনারা ভাববেন না…আমি সব বুঝি। আমার সম্পর্কে আপনাদের এ ধারণা ভুল…আমি…আঃ, ঠিক আছে, আমি কাজেই তা দেখাব; আর আমার কাছে পতাকার সম্মান…আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না, এ কথাই সত্যি যে আমারই দোষ, সকলের কাছে আমিই দোষী। তারপর, আপনারা আর কি চান?…
এই তো, এই তো সব ঠিক হয়ে গেল কাউন্ট! ঘুরে দাঁড়িয়ে মস্ত বড় হাত দিয়ে রস্তভের কাঁধটা চাপড়ে দিয়ে স্টাফ-ক্যাপ্টেন বলে উঠল।
দেনিসভও চেঁচিয়ে বলল, আমি বলছি, এ অতি সজ্জন লোক।
স্টাফ-ক্যাপ্টেন বলল, এই তো ভালো হল কাউন্ট। যাও ইয়োর এক্সেলেন্সি, ক্ষমা চেয়ে নাও। হ্যাঁ, যাও!
মিনতির সুরে রস্তভ বলল, ভদ্রমহোদয়গণ, সব কিছু করতে আমি প্রস্তুত। কারো কাছে আমি একটি কথাও বলব না, কিন্তু ক্ষমা চাইতে পারব না; ঈশ্বরের দোহাই, আমি তা পারি না; আপনাদের যা ইচ্ছা করতে পারেন! কেমন করে আমি ছোট ছেলের মতো গিয়ে ক্ষমা চাইব?
দেনিসভ হাসতে লাগল। এতে তোমার পক্ষে আরো খারাপ হবে। বোগদানিচ প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ; এই একগুয়েমির ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে কারস্তেন বলল।
