আঃ, শয়তান তোমাদের সকলের মাথায়ই ভর করুক, সর্বশেষ এই কথাগুলিই রস্তভ শুনতে পেল।
রস্তভ গেল তেলিয়ানিনের বাসায়।
তেলিয়ানিনের আর্দালি বলল, মনিব তো বাড়ি নেই, হেড-কোয়ার্টারে গেছেন। তারপর ক্যাডেটের বিক্ষুব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, কি হয়েছে?
না, কিছু না।
অল্পের জন্য তাকে ধরতে পারলেন না, আর্দালি বলল।
সালজেনেক থেকে হেড-কোয়ার্টারের দূরত্ব দুমাইল। বাড়ি ফিরে না গিয়ে রস্তভ একটা ঘোড়া নিয়ে সেখানেই ছুটল। গ্রামের একটা সরাইখানায় অফিসারদের খুব যাতায়াত ছিল। সেখানে পৌঁছে রস্তভ দেখল, ফটকে তেলিয়ানিনের ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে আছে।
সরাইখানার দুই নম্বর ঘরে লেফটেন্যান্ট বসে আছে এক ডিম কাবাব ও এক বোতল মদ নিয়ে।
হেসে ভুরু তুলে সে বলল, আরে, তুমিও এসে পড়েছ দেখছি!
হ্যাঁ, অনেক কষ্টে কথাটা উচ্চারণ করে সে কাছেই একটা টেবিলে বসল।
দুই জনই চুপচাপ। ঘরে আরো দুই জন জার্মান ও একজন রুম অফিসার ছিল। কারো মুখে কথা নেই। শুধু ছুরির টুং-টাং আর লেফটেন্যান্টের চিবনোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে তেলিয়ানিন পকেট থেকে একটা ডবল থলি বের করল; থলির রিংটা একপাশে টেনে একটা বড় স্বর্ণমুদ্রা বের করে ভুরু তুলে সেটা পরিচারককে দিল।
বলল, একটু তাড়াতাড়ি করো।
মুদ্রাটা নতুন। রস্তভ আসন ছেড়ে তেলিয়ানিনের কাছে গেল।
প্রায় শুনতে পাওয়া যায় না এমনি নিচু গলায় বলল, তোমার থলিটা একটু দেখি তো।
তেলিয়ানিন থলিটা তার হাতে দিল।
হ্যাঁ, থলিটা বেশ ভালো। সত্যি সত্যি, বলেই হঠাৎ তার মুখটা কালো হয়ে গেল। আবার বলল, চেয়েই দেখ না মশাই।
রস্তভ থলিটা হাতে নিল, থলিটা ও ভিতরকার মুদ্রাগুলি খুঁটিয়ে দেখল। তারপর তেলিয়ানিনের দিকে তাকাল। তেলিয়ানিন অভ্যাসমতোই চারদিকে তাকাচ্ছিল; হঠাৎ সে খুব খুশি হয়ে উঠল।
বলল, ভিয়েনায় যেতে পারলেই এটাকে হাল্কা করে ফেলব; এই হতভাগা ছোট শহরে তো খরচ করবার জায়গাই নেই। ঠিক আছে, ওটা আমাকে দিয়ে দাও। আমি চলে যাব।
রস্তভ কথা বলল না।
তেলিয়ানিন বলতে লাগল, আর তুমি? তুমিও লাঞ্চ খাবে না কি? এখানে এরা কিন্তু খাওয়ায় ভালো। এবার তাহলে ওটা আমাকে দিয়ে দাও।
থলিটা নেবার জন্য সে হাত বাড়াল। রস্তভও দিয়ে দিল। থলিটা নিয়ে তেলিয়ানিন আলগাভাবে সেটাকে রাইডিং-ব্রিচেসের পকেটে রেখে এমনভাবে ভুরু দুটো তুলে মুখটাকে ঈষৎ ফাঁক করল যেন বলতে চাইল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার থলি আমি পকেটে পুরলাম; এটা তো একটা সরল ব্যাপার, এ নিয়ে অন্য কারো মাথা ঘামাবার কিছু নেই।
একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে বলল, আচ্ছা, চলি। ভুরু দুটি তুলে সে রশুভের দিকে তাকাল।
তেলিয়ানিনের চোখ থেকে একটা বিদ্যুতের ঝিলিক যেন রশুভের চোখে গিয়ে লাগল, আবার ফিরে এল; মুহূর্তের মধ্যে এমনি বারবার গেল আর ফিরে এল।
এখানে এস, বলে রস্তভ তেলিয়ানিনের হাত ধরে তাকে প্রায় টানতে টানতেই জানালার কাছে নিয়ে গেল। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ও টাকা দেনিসভের; তুমি নিয়ে নিয়েছ…
কি? কি? এত সাহস তোমার? কি? তেলিয়ানিন বলল।
কিন্তু কথাগুলি শোনাল বড় করুণ, হতাশ কান্নার মতো, ক্ষমা প্রার্থনার মতো। কথাগুলি শুনেই সন্দেহের একটা প্রকাণ্ড বোঝ রস্তভের মন থেকে নেমে গেল। সে খুশি হল, আবার সেই সঙ্গে সম্মুখে দাঁড়ানো দুঃখী লোকটির জন্য করুণাও হল। কিন্তু যে কাজ সে শুরু করেছে সেটা তো শেষ করতেই হবে।
টুপিটা হাতে নিয়ে একটা ছোট খালি ঘরের দিকে যেতে যেতে তেলিয়ানিন আমতা-আমতা করে বলল, এখানকার লোকগুলো কি মনে করল তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। একটা কিছু তো বোঝাতে হবে…
আমি জানি; প্রমাণ করেও দেব,রস্তভ বলল।
আমি…
তেলিয়ানিনের ভয়ার্ত মুখের প্রতিটি পেশী কাঁপছে; চোখ দুটো এখনো এদিক-ওদিকে ঘুরলেও সে দৃষ্টি অবনত, রশুভের মুখের দিকে সে তাকাতে পারছে না; ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দও শোনা যাচ্ছে।
কাউন্ট! একটি যুবকের ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না…এই নাও সেই হতভাগা টাকা, নাও… থলিটাকে টেবিলের উপর ছুঁড়ে দিল, আমার বুড়ো বাবা আছে, মা আছে!…।
তেলিয়ানিনের চোখের দিকে না তাকিয়ে রস্তভ টাকাটা নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজার কাছে থেমে আবার ফিরে এল। চোখের জল ফেলে বলল, হা ঈশ্বর, এ কাজ তুমি করলে কেমন করে?
তার কাছে গিয়ে তেলিয়ানিন ডাকল, কাউন্ট,…
পিছনে সরে গিয়ে রস্তভ বলল, আমাকে ছুঁয়ো না। তোমার যদি দরকার থাকে, টাকাটা নিয়ে যাও; থলিটা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে রস্তভ ছুটে সরাইখানা থেকে বেরিয়ে গেল।
*
অধ্যায়-৫
সেদিন সন্ধ্যায় স্কোয়াড্রন-অফিসারদের মধ্যে একটা উত্তেজিত আলোচনা চলছিল দেনিসভের বাসায়। আমি তোমাকে বলছি রস্তভ, কর্নেলের কাছে তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে, স্টাফ-ক্যাপ্টেন কারনে কথাটা বলল। লোকটি লম্বা, মাথায় ধূসর চুল, প্রকাণ্ড গোঁফ, আর মুখভর্তি বলী-রেখা। রস্তভ উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে।
স্টাফ-ক্যাপ্টেন কারস্তেনের দুইবার পদাবনতি ঘটেছে, আবার দুইবারই কমিশনে পুনর্বহাল হয়েছে।
রস্তভ চেঁচিয়ে বলে উঠল, কেউ আমাকে মিথ্যুক বলবে তা আমি হতে দেব না। সে বলেছে আমি মিথ্যা বলেছি, আর আমি বলেছি সে মিথ্যা বলেছে। বাস, ঐ পর্যন্ত। সে আমাকে রোজ ডিউটি করাতে পারে, আমাকে গ্রেপ্তার করাতে পারে, কিন্তু কেউ আমাকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়াতে পারবে না। কারণ এই রেজিমেন্টের কমান্ডার হিসেবে সে যদি মনে করে যে আমার কাছে কৈফিয়ৎ দেওয়া তার মর্যাদার পক্ষে হানিকর, তাহলে…
