এই যুবকটিকে ঘোড়ার পায়ে নাল লাগানো শিখিয়ে দিতে, তেলিয়ানিন জবাব দিল।
ফটক পেরিয়ে তারা আস্তাবলে ঢুকল। ক্ষুরে কেমন করে কাটা মারতে হয় সেটা বুঝিয়ে দিয়ে লেফটেন্যান্ট তার নিজের বাসায় চলে গেল।
রস্তভ ফিরে গিয়ে টেবিলের উপর এক বোতল ভদকা ও কিছুটা কাবাব দেখতে পেল। দেনিসভ সেখানে । বসে এক তা কাগজে কলম দিয়ে খসখস করে কি যেন লিখে চলেছে। গম্ভীরভাবে রস্তভের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল :
তাকে চিঠি লিখছি।
কলমটা হাতে নিয়ে কনুইতে ভর দিয়ে চিঠির বক্তব্যটা মুখেই রস্তভকে বলতে লাগল।
দেখ বন্ধু, যখন ভালোবাসা না থাকে তখনই আমরা ঘুমোই। আমরা তো মাটির সন্তান…কিন্তু লোকে তো প্রেমে পড়ে, ঈশ্বর হয়, সৃষ্টির প্রথম দিনের মতো পবিত্র হয়…আবার কে এল? তাকে নরকে পাঠিয়ে দাও, আমি এখন ব্যস্ত আছি! মোটেই ঘাবড়ে না গিয়ে লাভ্রুশকা তার কাছে এসে হাজির হতেই দেনিসভ চিৎকার করে বলে উঠল।
আবার কে! আপনিই তো ওকে আসতে বলেছিলেন। কোয়ার্টার মাস্টার এসেছে টাকার জন্য।
দেনিসভ ভুরু কুঁচকে চেঁচিয়ে কি একটা জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেল।
নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, হতভাগা কাজ! থলিতে কত আছে? রস্তভের দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
সাতটা নতুন আর তিনটে পুরনো বড় মুদ্রা।
ওঃ, হতভাগা! আরে, তুমি এখানে কাকতাড় য়ার মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? কোয়ার্টার মাস্টারকে ডাক, সে লাভ্রুশকাকে হেঁকে বলল।
দেখ দেনিসভ, আমি তোমাকে কিছুটা ধার দিচ্ছি : তুমি জান আমার কিছু আছে, মুখ লাল করে রস্তভ বলল।
আপনজনের কাছ থেকে ধার করা আমি পছন্দ করি না, মোটেই পছন্দ করি না, দেনিসভ গজরাতে গজরাতে বলল।
কিন্তু তুমি যদি বন্ধু মনে করে আমার কাছ থেকে টাকা না নাও তাহলে আমি অসন্তুষ্ট হব। সত্যি, আমার টাকা আছে, রস্তভ আবার বলল।
না। আমি বলছি, না।
বালিশের তলা থেকে থলিটা বের করতে দেনিসভ বিছানার কাছে গেল।
কোথায় রেখেছ রস্তভ?
নিচের বালিশের তলায়।
দেনিসভ দুটো বালিশই মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। থলিটা নেই।
এ তো অলৌকিক ব্যাপার।
দাঁড়াও, তুমি ফেলে দাও নি তো? একটা একটা করে বালিশ দুটো তুলে ঝাড়তে ঝাড়তে রস্তভ বলল।
লেপটা তুলে ঝাড়ল। সেখানেও থলি নেই।
তাই তো ভাই, তাহলে কি আমারই ভুল? না, তুমি যে মূল্যবান সম্পত্তির মতো ওটাকে মাথার নিচেই রাখ সে-কথা যে আমি ভেবেছিলাম তাও আমার বেশ মনে পড়ছে, রস্তভ বলল। ঠিক এখানেই রেখেছিলাম। কোথায় গেল? সে লাভ্রুশকাকে জিজ্ঞাসা করল।
আমি তো ঘরেই ছিলাম না। আপনি যেখানে রেখেছিলেন সেখানেই তো থাকবে।
কিন্তু সেখানে নেই!…
তুমি তো সব সময়ই ওই রকম; জিনিসপত্র যেখানে-সেখানে ফেলে রাখ, আর তার পরে ভুলে যাও। নিজের পকেট খুঁজে দেখ।
রস্তভ বলল, না, ওটাকে অতটা মূল্যবান আমি ভাবি নি, কিন্তু আমার বেশ মনে আছে, এখানেই রেখেছিলাম।
লাভ্রুশকা গোটা বিছানাটা উল্টে পাল্টে দেখল, বিছানার নিচে, টেবিলের নিচে খুঁজল, কোনো জায়গা দেখতে বাকি রাখল না; তারপর ঘরের মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দেনিসভ চুপচাপ লাভ্রুশকার চালচলন দেখল; তারপর সে যখন অবাক হয়ে দুই হাত উপরে তুলে জানাল যে কোথাও সেটা পাওয়া গেল না, তখন রস্তভের দিকে তাকাল।
রস্তভ, তুমি ইস্কুলের ছেলেদের মতো চালাকি করছ না তো…
দেনিসভের দৃষ্টি যে তার উপর নিবদ্ধ সেটা বুঝতে পেরে রস্তভ চোখ তুলে তাকিয়ে পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিল। যে রক্তটা এতক্ষণ গলার নিচে কোথাও জমেছিল সেটা এবার তার মুখে ও চোখে উঠে এল। সে যেন শ্বাস নিতেও পারছে না।
লাভ্রুশকা বলল, লেফটেন্যান্ট ও আপনি ছাড়া আর কেউ ঘরে ঢোকে নি। ওটা এখানেই কোথাও থাকবেই।
তবে রে ব্যাটা শয়তানের পুতুল! একটু নড়ে-চড়ে খুঁজে দেখ, দেনিসভ হঠাৎ অগ্নিমূর্তি হয়ে চিৎকার করতে করতে আর্দালির দিকে ছুটে গেল। থলি পাওয়া গেলে আমি তোকে চাবুক মারব, চাবুক মারব।
দেনিসভের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রস্তভ কোটের বোম এঁটে, কোমরে তলোয়ার ঝুলিয়ে টুপিটা মাথায় দিল।
আর্দালিকে ঘাড় ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দেয়ালের উপর ঠুকে দেনিসভ চেঁচাতে লাগল, থলিটা আমার চাই, এই তোকে বলে রাখছি।
দরজার কাছে গিয়ে চোখ না তুলেই রস্তভ বলল, ওকে ছেড়ে দাও দেনিসভ; আমি জানি থলি কে নিয়েছে।
দেনিসভ থামল; এক মুহূর্ত কি ভাবল; তারপর রস্তভের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে তার হাতটা চেপে ধরল।
বাজে কথা! সে চেঁচিয়ে উঠল; তার কপালের ও গলার শিরাগুলো দড়ির মতো ফুলে উঠল। আমি বলছি, তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ। এ আমি হতে দেব না। থলি এখানেই আছে! আমি এই শয়তানটাকে জ্যান্ত ছাল ছাড়িয়ে নেব, তাহলেই সেটা পাওয়া যাবে।
আমি জানি ওটা কে নিয়েছে, কাঁপা গলায় আর একবার কথাটা বলে রস্তভ দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
তাকে বাধা দিতে দরজার দিকে ছুটে গিয়ে দেনিসভ চিৎকার করে বলল, আমি বলছি, অমন কাজও করো না।
কিন্তু রস্তভ তার হাতটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে এমন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সোজা তার মুখের দিকে তাকাল যেন দেনিসভ তার সবচাইতে বড় শত্রু।
কাঁপা গলায় বলল, তুমি যা বলছ তার অর্থ বোঝ? আমি ছাড়া এ ঘরে আর কেউ ছিল না। কাজেই আমি যা ভাবছি তা যদি না হয়তো…
কথা শেষ না করেই সে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
