হ্যাঁ, আনো।
দশ মিনিট পরে লাভ্রুশকা কফি নিয়ে এল। বলল, তিনি আসছেন! এবার ঝামেলা শুরু হবে! জানালা দিয়ে তাকিয়ে রস্তভ দেখল, দেনিসভ ফিরছে। ছোটখাট চেহারা, লাল মুখ, কালো চকচকে চোখ, এলোমেলো কালো গোঁফ ও চুল। গায়ের আলখাল্লার বোতাম খোলা, চওড়া ব্রিচেস ভঁজে ভাঁজে ঝুলে পড়েছে, মাথার পিছনে একটা দুমড়ানো শাকো। বিষণ্ণ মুখে মাথা নিচু করে ফটক পর্যন্ত এল।
রেগে চেঁচিয়ে বলল, লাভ্রুশকার জবাব শোনা গেল।
ঘরে ঢুকে দেনিসভ বলল, আচ্ছা, তুমি এসে গেছ দেখছি!
রস্তভ বলল, অনেকক্ষণ এসেছি। খড় আনতে গিয়েছিলাম, ফ্রলিন মাথিল্ডার সঙ্গে দেখা হল।
বটে! আর আমি এদিকে হেরে ভূত, বাওয়া! কাল তো বোকা গাধার মতো হেরেছি! কপাল খারাপ! কপাল খারাপ! তুমিও চলে এলে আর অমনি শুরু হল, চলতেই থাকল। এই, কোথায় রে! চা!
মুখ ফাঁক করে হেসে ছোট ছোট শক্ত দাঁত বের করে সে তার ঘন কালো জটাধা চুলে আঙুল চালাতে লাগল।–
কপালে ও সারা মুখে দুই হাত ঘষতে ঘষতে বলল, কেন যে মরতে ওই ধেড়ে ইঁদুরটার কাছে গিয়েছিলাম? (একজন অফিসারের ডাক নাম ধেড়ে ইঁদুর)। ভেবে দেখ, সে লোকটা আমাকে একটা কানা কড়িও জিততে দেয়নি।
পাইপটা ধরিয়ে এনে দিলে সেটাকে মুঠোর মধ্যে ধরে মেঝের উপর আছড়াতে শুরু করল। আগুনের ফুলকি যত উড়তে থাকে, সেও তত চেঁচাতে থাকে।
জ্বলন্ত তামাকগুলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দিল, পাইপটাকে ভেঙে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হঠাৎ খুশি হয়ে উঠে কালো চকচকে চোখ মেলে রশুভের দিকে তাকাল।
অন্তত কিছু মেয়েমানুষও যদি এখানে থাকত, কিন্তু শুধু মদ গেলা ছাড়া আর কিছু করার নেই। তাড়াতাড়ি লড়াইতে চলে যেতে পারলেও হত। হেই, কে ওখানে? ভারী বুটের শব্দ ও পাদানির ইং-ঠাং আওয়াজ এবং একটি সশ্রদ্ধ কাশির শব্দ শুনে দরজার দিকে তাকিয়ে সে বলল।
সেনাদলের কোয়ার্টার মাস্টার! লাভ্রুশকা হেঁকে বলল। দেনিসভের মুখটা আরো কুঁচকে উঠল।
হতভাগা! বিড় বিড় করে কথাটা বলে কিছু স্বর্ণমুদ্রাসহ থলিটা ছুঁড়ে দিল। রস্তভ, ভাই, এর মধ্যে কত আছে দেখে নিয়ে থলিটাকে বালিশের নিচে ঢুকিয়ে দাও তো। কথা শেষ করে সে কোয়ার্টার মাস্টারের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে গেল।
রস্তভ থলি ঝেড়ে নতুন ও পুরনো মুদ্রাগুলোকে আলাদা করে সাজিয়ে গুণতে শুরু করল।
ওহো! তেলিয়ানিন! কেমন আছ? কাল রাতে ওরা আমার পালক ছাড়িয়ে দিয়েছে, পাশের ঘর থেকে দেনিসভের গলা শোনা গেল।
কোথায়? সেই ধেড়ে ইঁদুর বাইকতের কাছে… আমি জানতাম, একটি বাঁশির মতো সুরে জবাব শোনা গেল, আর পরক্ষণেই ওই একই সেনাদলের একজন খুদে অফিসার লেফটেন্যান্ট তেলিয়ানিন ঘরে ঢুকল।
থলিটাকে বালিশের নিচে গুঁজে দিয়ে রস্তভ তার বাড়ানো ঠাণ্ডা হাতটা ধরে ঝাঁকুনি দিল। যে কারণেই হোক, এই অভিযানের ঠিক আগেই তেলিয়ানিনকে রক্ষীবাহিনী থেকে বদলি করা হয়েছে। রেজিমেন্টে তার ব্যবহার বেশ ভালোই, তবু কেউ তাকে পছন্দ করে না; বিশেষত রস্তভ তাকে খুবই অপছন্দ করে এবং লোকটির প্রতি তার এই অকারণ বিরূপতাকে জয় করতে বা ঢেকে রাখতেও পারে না।
এই যে তরুণ হুজার, আমার রুকটি কেমন চলছে? সে জিজ্ঞাসা করল। (তেলিয়ানিন রুক নামক একটা ঘোড়া রশুভের কাছে বিক্রি করেছিল।)
ফেলটেন্যান্টটি যার সঙ্গে কথা বলে কখনো সোজা তার মুখের দিকে তাকায় না; তার চোখ দুটো অনবরত এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে।
আজ সকালেই তোমাকে ঘোড়ায় চাপতে দেখেছি, সে আরো বলল।
ঘোড়াটার জন্য রস্তভ সাতশো রুবল দিয়েছিল, কিন্তু সেটার উচিত দাম তার অর্ধেকও হওয়া উচিত নয়। তবু সে জবাবে বলল, ওঃ, ঘোড়াটা ভালোই আছে; বেশ ভালো ঘোড়া। তবে বাঁদিকে সামনের পাটা একটু খুঁড়িয়ে চলতে শুরু করেছে।
ক্ষুরটা ফেটে গেছে! ও কিছু না। কি করতে হবে আমি বলে দেব। কি ধরনের কাটা ব্যবহার করতে হবে তাও দেখিয়ে দেব।
দয়া করে দিও, রস্তভ বলল।
নিশ্চয় দেব, নিশ্চয় দেব। এটা তো গোপন ব্যাপার কিছু নয়। অবশ্য ঘোড়াটার জন্য আমাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে।
তাহলে তো ঘোড়াটাকে নিয়ে আসতে হয়, তেলিয়ানিনকে এড়াবার জন্য রস্তভ বেরিয়ে গেল।
বারান্দার দেনিসভ চৌকাঠের উপর বসে ছিল, আর সামনে দাঁড়িয়ে কোয়ার্টার মাস্টার কি যেন বুঝিয়ে বলছিল। রশুভকে দেখে দেনিসভ মুখটা বিকৃত করে ঘাড়ের উপর দিয়ে বুড়ো আঙুলটাকে বেঁকিয়ে যে ঘরে তেলিয়ানিন রয়েছে সেটা দেখিয়ে দিল। তার চোখে-মুখে বিরক্তি ও অস্বস্তি ফুটে উঠল।
কোয়ার্টার মাস্টারের সামনেই বলে উঠল, উঃ! ঐ লোকটাকে আমি দেখতে পারি না।
রস্তভ কাঁধটা ঝাঁকুনি দিল; যেন বলতে চাইল; আমিও দেখতে পারি না, কিন্তু কি করা যাবে? ঘোড়া আনবার হুকুম করে সে আবার তেলিয়ানিনের কাছে ফিরে গেল।
তেলিয়ানিন সেই একইভাবে নেতিয়ে বসে হোট শাদা হাত দুটো ঘষছে।
ঘরে ঢুকতেই রভের মনে হল, সত্যি, কিছু লোক আছে যারা বড়ই বিরক্তিকর।
উঠে দাঁড়িয়ে ইতস্তত তাকাতে তাকাতে তেলিয়ানিন বলল, ঘোড়াটাকে আনতে বলেছ তো?
বলেছি।
চল আমরাই যাই। আমি শুধু কালকের নির্দেশনামার কথা দেনসিভের কাছ থেকে জানতে এসেছিলাম। তুমি কি হুকুমটা পেয়েছ দেনিসভ?
এখনো পাইনি। কিন্তু তুমি কোথায় চললে?
