বলকনস্কির এতখানি রাগ দেখে নেসভিৎস্কি ও ঝেরকভ এতই অবাক হয়ে গেল যে তারা হাঁ করে তার দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল।
ব্যাপারটা কি? আমি তো ওদের অভিনন্দন জানাচ্ছিলাম মাত্র, ঝেরকভ বলল।
আমি তোমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছি না, দয়া করে চুপ কর! বলকনস্কি চিৎকার করে বলল; তারপর
নেসভিৎস্কির হাত ধরে চলে গেল। ঝেরকভ কি বলবে বুঝতেই পারল না।
তাকে সান্ত্বনা দিতে নেসভিৎস্কি বলল, আরে, কি হল রে বাপু?
কি হল? প্রিন্স আন্দ্রু দাঁড়িয়ে উত্তেজিতভাবে বলতে লাগল : তুমি কি বুঝতে পারছ না যে, হয় আমরা আমাদের জার ও আমাদের দেশের সেবায় নিযুক্ত অফিসাররা, যেটা আমাদের সকলের লক্ষ্য তার সাফল্যে আমরা আনন্দ করব, দুর্ভাগ্যে দুঃখ পাব, আর না হয়তো আমরা সামান্য খানসামা মাত্র, মনিবের সুখ-দুঃখে যাদের কিছুই যায় আসে না। চল্লিশ হাজার সৈন্য খুন হয়ে গেল, আমাদের মিত্র-শক্তি ধ্বংস হয়ে গেল, আর তাই নিয়ে তোমরা ঠাট্টা করছ! যেন নিজের বক্তব্যকে জোরদার করার জন্যই সে কথাগুলি ফরাসিতে বলল। ওই যে অকর্মার ধাড়িটার সঙ্গে তুমি বন্ধুত্ব পাতিয়েছ এ-কাজ তাকে সাজে, কিন্তু তোমাকে সাজে না, সাজে না। এভাবে মজা করা শুধু অকর্মাদেরই সাজে।
কর্নেলটি কোনো জবাব দেয় কি না শুনবার জন্য সে একমুহূর্ত দাঁড়াল, কিন্তু সে মুখটা ঘুরিয়ে বারান্দার পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
*
অধ্যায়-৪
পাভলোগ্রাদ হুজারদের মোতায়েন করা হয়েছে ব্রাউমাউ থেকে দুমাইল দূরে। যে অশ্বারোহী সেনাদলে নিকলাস রস্তভ শিক্ষার্থী হিসেবে যোগ দিয়েছে তাদের বাসা পড়েছে একটি জার্মান গ্রাম সালজেনেকে। গ্রামের সবচাইতে ভালো বাসাটা দেওয়া হয়েছে অশ্বরোহী সেনাদলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন দেনিসভকে। গোটা অশ্বারোহী বাহিনীতে সে ভাস্কা দেনিসভ নামেই পরিচিত। পোল্যান্ডে এসে সেনাদলে যোগ দেবার পর থেকেই ক্যাডেট রস্তভ অধিনায়কের সঙ্গেই থাকে।
১১ অক্টোবর তারিখে ম্যাকের পরাজয়ের খবর নিয়ে হেড-কোয়ার্টারে সকলেই যখন চঞ্চল হয়ে উঠেছে, তখনো এই অশ্বরোহী সেনাদলের অফিসারদের শিবির-জীবন যথারীতিই চলেছে। দেনিসভ সারা রাত তাস খেলায় হেরেছে; সে এখনো ঘরে ফেরে নি। খাদ্য-সগ্রহ অভিযান সেরে রস্তভ সবে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এসেছে। ক্যাডেট-ইউনিফর্ম পরিহিত রস্তভ ঘোড়াটাকে একেবারে ফটকে এনে হাজির করল, যৌবনসুলভ সহজ ভঙ্গিতে পাটাকে জিনের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনল, যেন ঘোড়া ছেড়ে নামতে ইচ্ছা করছে না এমনিভাবে পা-দানের উপর একমুহূর্ত দাঁড়াল, আর তারপরেই লাফ দিয়ে নেমে আর্দালিকে ডাকল।
যে হুজারটি এক দৌড়ে ঘোড়র কাছে এসে হাজির হল তাকে দেখে রস্তভ বলল, আহা বন্দারেংকো, বন্ধু! ওকে একটু হাঁটাচলা করাও ভাই। সৎস্বভাবের যুবকরা মন ভালো থাকলে সকলের সঙ্গেই যেমন ভাই বেরাদারের মতো কথা বলে সেই রকম ভাবেই সে কথাগুলি বলল।
ইউক্রেনীয় হুজারটি খুশিতে মাথা নেড়ে বলল, করছি ইয়োর এক্সেলেন্সি।
মনে থাকে যেন, একটি হুজারও ঘোড়র কাছে ছুটে এসেছে, কিন্তু বন্দরেংকো ততক্ষণে ঘোড়ার মাথা থেকে রাশটা খুলে ফেলেছে। বোঝা গেল যে এই ক্যাডেটটি বেশ দরাজ হাতেই বকশিস দিয়ে থাকে, তার কাজ করে দিলে লাভ আছে। রস্তভ ঘোড়াটার গলায় ও পিঠে আস্তে আস্তে চাপড় মারতে মারতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
একটু হেসে মনে মনে ভাবল, চমৎকার! একদিন এটা কী ঘোড়াই না হবে! তলোয়ারটাকে উপরের দিকে তুলে সে এক দৌড়ে ফটকের সিঁড়ির কাছে গেল। তার বাড়িওলা ওয়েস্টকোট ও দুলো টুপি পরে একটা উকনঠেঙা হাতে নিয়ে গোয়াল থেকে গোবর পরিষ্কার করছিল। বাইরে তাকিয়ে রস্তভকে দেখেই তার মুখটা ঝলমলিয়ে উঠল। Schou gut Morgen! Schou gut Morgen! (সুপ্রভাত! সুপ্রভাত!) বড়ই খুশি হয়ে চোখ মিটমিট করে হাসতে হাসতে সে যুবকটিকে অভ্যর্থনা জানাল।
সেই একই ভাইয়ের মতো হাসি হেসে রস্তভ বলল, এর মধ্যেই কাজে লেগে গেছ! তারপর জার্মান বাড়িওলাটি প্রায়ই যে কথাগুলি বলে থাকে তারই পুনরাবৃত্তি করে বলে উঠল, অস্ট্রিয়ার জয় হোক! রাশিয়ার জয় হোক! সম্রাট আলেকজান্ডারের জয় হোক!
জার্মানটি হাসতে হাসতে গোয়াল থেকে বেরিয়ে এল। মাথার টুপি খুলে মাথার উপর নাড়তে নাড়তে চেঁচিয়ে বলল : Und die ganze Welt hoch! (সারা বিশ্বের জয় হোক!)।
জার্মানটির মতো রস্তভও টুপিটাকে মাথার উপর ঘুরিয়ে হাসতে হাসতে বলল, Und vivat die ganze Welt! (সারা বিশ্ব জিন্দাবাদ!) জার্মানটি গোয়াল পরিষ্কার করছে, রস্তভ সবে ফিরেছে খড়-সংগ্রহের কাজ সেরে, দুজনের কারোরই আনন্দ করার কোনো হেতু নেই, তবু তারা ভাইয়ের মতো ভালোবাসায় খুশিমনে একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল, পরস্পরের প্রতি অনুরাগের চিহ্নস্বরূপ মাথা নাড়তে লাগল, তারপর হেসে বিদায় নিল, জার্মানটি ফিরে গেল গোয়ালে, আর রস্তভ ফিরে গেল সেই ঘরটিতে যেখানে দেনিসভের সঙ্গে সে থাকে।
দেনিসভের আর্দালি লাভ্রুশকাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার মনিবের খবর কী?
লোকটিকে সকলেই পাজি বলেই জানে। সে উত্তর দিল, সন্ধ্যা থেকে তো দেখা নেই। নির্ঘাত খেলায় হারছেন। এতদিনে আমি বুঝে ফেলেছি, খেলায় জিতলে তাড়াতাড়ি ফিরে সে কথা সাতখানা করে বলেন, আর সকাল পর্যন্ত বাইরে কাটালেই বুঝতে পারি, খেলায় হেরেছেন, আর ফিরে এসে তম্বি শুরু করবেন। কফি খাবেন কি?
