প্রধান সেনাপতি কুতুজভ? দুজনের দিকেই তাকিয়ে ভিতরের দরজার দিকে সোজা এগিয়ে সদ্য আগত সেনাপতিটি কড়া জার্মান উচ্চারণে তাড়াতাড়ি প্রশ্নটা করল।
অতি দ্রুত অপরিচিত সেনাপতির কাছে এগিয়ে তার পথরোধ করে কজলভস্কি বলল, প্রধান সেনাপতি ব্যস্ত আছেন।
এরা তাকে চিনতে পারে নি দেখে বিস্মিত হয়ে অপরিচিত সেনাপতি খর্বকায় কজলভস্কির দিকে ঘৃণার চোখে তাকাল।
জলভস্কি শান্ত গলায় আবার বলল, প্রধান সেনাপতি ব্যস্ত আছেন।
সেনাপতির মুখে মেঘ নামল, তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। একটা নোটবই বের করে তাড়াতাড়ি পেন্সিল দিয়ে কিছু লিখে পাতাটা একটানে ছিঁড়ে কজলভস্কিকে দিল; দ্রুত পায়ে জানালার কাছে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে ঘরের লোকদের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন বলতে চাইল, এরা সব আমাকে দেখছে কেন? তারপর মাথাটা তুলে ঘাড় সোজা করে যেন কিছু বলতে চাইল, কিন্তু পরমুহূর্তেই গুনগুন করতে শুরু করে দিল। ঘরের দরজা খুলে কুতুজভ দ্বারপথে দেখা দিল। মাথায় ব্যান্ডেজ-করা সেনাপতিটি কোনো বিপদের হাত থেকে পালাবার ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে তাড়াতাড়ি সরু পা ফেলে কুতুজভের দিকে এগিয় গেল।
লোকটি ভাঙা গলায় নিজের নামটা বলল।
খোলা দ্বার-পথে দাঁড়িয়ে কুতুজভের মুখটা কয়েক মুহূর্ত সম্পূর্ণ নির্বিকার হয়ে রইল। পরক্ষণে মুখের উপর ঢেউয়ের মতো কয়েকটা ভাঁজ পড়ল, কপালটা আবার মসৃণ হল। সশ্রদ্ধভাবে মাথাটা নুইয়ে সে চোখ বুজল, নীরবে ম্যাককে তার আগেই ঘরে ঢুকবার পথ করে দিল, তারপর নিজেই দরজাটা বন্ধ করে দিল।
অস্ট্রিয় পরাজিত হয়েছে এবং গোটা বাহিনী উলমে আত্মসমর্পণ করেছে এই মর্মে যে সংবাদ রটেছিল সেটা ঠিকই। আধ ঘণ্টার মধ্যেই অ্যাডজুটান্টদের এই নির্দেশ দিয়ে চারদিকে পাঠিয়ে দেওয়া হল যে, যে-সব রুশ সৈন্য এতদিন অকর্মণ্য হয়ে বসেছিল এবার তাদেরও শত্রুর সম্মুখীন হতে হবে।
প্রিন্স আন্দ্রু সেই সব বিরল অফিসারদের একজন যাদের প্রধান আগ্রহ যুদ্ধের অগ্রগতিকে নিয়ে। ম্যাককে দেখে এবং তার দুর্গতির বিবরণ শুনে সে বুঝতে পারল যে অভিযানের অর্ধেকই হাতছাড়া হয়ে গেছে; রুশ বাহিনীর সামনে যে সব অসুবিধা সমুপস্থিত তাও বুঝতে পারল; আর ভবিষ্যতে তাদের কপালে কি আছে এবং সে অবস্থায় তার কি ভূমিকা হবে তাও সে কল্পনা করে নিল। উদ্ধত অস্ট্রিয়ার এই পরাভবের চিন্তায় এবং একসপ্তাহকালের মধ্যেই সে হয়তো ফরাসিদের বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রথম যুদ্ধটা দেখতে পাবে এবং তাতে অংশও নিতে পারবে এই ভাবনায় সে নিজের অজান্তেই একটা সানন্দ উত্তেজনা অনুভব করল। তার আশংকা হল, বোনাপার্তের প্রতিভা হয়তো রুশ বাহিনীর সব সাহসকেই হার মানাবে; আবার সেই সঙ্গে তার নায়কের পরাজয়কে সে মনে মনে মেনে নিতে পারল না।
এই সব চিন্তায় উত্তেজিত ও বিরক্ত হয়ে প্রিন্স আন্দ্রু তার ঘরে চলে গেল বাবাকে চিঠি লিখতে। প্রতিদিন সে বাবাকে চিঠি লেখে। বারান্দায় নেসভিৎস্কির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দুজন এক ঘরেই থাকে। ভাড় ঝেরকভও সেখানে ছিল।
প্রিন্স আন্দ্রুর কালো মুখ ও চকচকে চোখ দেখে নেসভিৎস্কি শুধাল, তোমার মন খারাপ কেন?
খুশি হবার তো কারণ নেই, বলকনস্কি জবাব দিল।
নেসভিৎস্কি ও ঝেরকভের সঙ্গে প্রিন্স আর দেখা হতে না হতেই বারান্দার অপর দিক থেকে তাদের দিকে এগিয়ে এল অস্ট্রিয়া সেনাপতি স্ট্রচ এবং আগের দিন সন্ধ্যায় আগত হফক্রিগসরাথের সদস্যটি। স্ট্রচ কুতুজভের অধীনস্থ কর্মচারী, রুশ বাহিনীর খাদ্য ব্যবস্থার ভারপ্রাপ্ত। তিনজন অফিসারের পাশ দিয়ে চলে যাবার মতো যথেষ্ট জায়গা সেনাপতি দুজনের ছিল, কিন্তু নেসভিস্কিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঝেরকভ রুদ্ধশ্বাস গলায় বলল, ওঁরা আসছেন! ওঁরা আসছেন!…সরে দাঁড়াও, পথ ছেড়ে দাও, দয়া করে পথ ছেড়ে দাও!
সেনাপতি দুজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল; এতটা মনোযোগ তাদের ভালো লাগে নি। এদিকে ভাঁড় ঝেরকভের মুখে হঠাৎ একটা দুষ্টুমির হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল, কিছুতেই চেপে রাখতে পারল না।
এক পা এগিয়ে অস্ট্রিয় সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সি, আপনাকে অভিনন্দন জানাই।
মাথাটা নিচু করে নাচের তালিম-নেওয়া ছোট শিশুর মতো সে প্রথমে এক পা ও পরে আর এক পা ঘষ্টে দাঁড়াল।
হফক্রিগসরাথের সদস্যটি কড়া চোখে তার দিকে তাকাল; কিন্তু তার দুষ্টু হাসির গুরুত্ব লক্ষ্য করে মুহূর্তের জন্য ফিরে তাকাল। চোখ দুটো পাকিয়ে বুঝিয়ে দিল যে সে শুনছে।
আপনাকে অভিনন্দন জানাই। সেনাপতি ম্যাক এসে গেছেন, ভালোই আছেন, তবে এখানটায় একটু ছড়ে গেছে, মাথাটা দেখিয়ে সে খুশির হাসি হাসল।
সেনাপতি ভুরু কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।
কয়েক পা গিয়ে রেগে বলে উঠল, হা ঈশ্বর, কী সরলতা!
নেসভিৎস্কি হেসে প্রিন্স আল্লুকে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু বলকনস্কি মুখটাকে আরো কালো করে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে ঠেলে দিয়ে ঝেরকভের দিকে মুখ ফেরাল। ম্যাকের আগমন, তার পরাজয়ের খবর, আর রুশ বাহিনীর ভবিষ্যৎ চিন্তায় তার মনে যে বিরক্তির ভাব জমে উঠেছিল, ঝেরকভের বেতালা ঠাট্টায় সেটাই ক্রোধে ফেটে পড়ল।
নিচের চোয়ালটা ঈষৎ কাঁপিয়ে সে কঠোর স্বরে বলে উঠল, তুমি যদি নিজেকে একটা ভাঁড় বানাতে চাও তো আমি সেটা আটকাতে পারি না; কিন্তু আমি তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, আমার সামনে যদি ভঁড়ামি করার দুঃসাহস দেখাও তো আমি তোমাকে দ্ৰব্যবহার শিখিয়ে দেব।
