প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে কুতুজভ বলল, সেই চিঠিটা দাও। দয়া করে এদিকে একটু দৃষ্টি দিন-মুখের কোণে ব্যঙ্গের হাসি ফুটিয়ে কুতুজভ জার্মান ভাষায় লেখা আর্চডিউক ফার্দিনান্দের চিঠির নিম্নলিখিত অংশটুকু পড়তে লাগল।
শত্রুপক্ষ যদি লেচ অতিক্রম করে আসে তাহলে তাকে আক্রমণ করে পরাস্ত করবার জন্য প্রায় সত্তর হাজার সৈন্যের একটা গোটা বাহিনী আমরা সমাবেশ করেছি। তার উপরে, যেহেতু উলম আমাদের দখলে, সেজন্য দানিয়ুব নদীর উভয় তীরের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার সুবিধা আমরা অবশ্যই পাব; ফলে শত্রুপক্ষ যদি লেচ অতিক্রম না করে তাহলেও আমরা দানিয়ুব পার হয়ে তাদের সরবরাহ-ব্যবস্থার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব, আরো ভাটিয়ে গিয়ে পুনরায় নদী পার হতে পারব, এবং শত্রুপক্ষ যদি সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের বিশ্বস্ত মিত্রপক্ষকে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে তবে তাদের সে বাসনাকেও বানচাল করে দিতে পারব। সুতরাং রুশ সাম্রাজ্য বাহিনী যতদিন সম্পূর্ণ সুসজ্জিত হয়ে না ওঠে ততদিন আমরা গভীর আত্ম-প্রত্যয়ের জন্য অপেক্ষা করব, আর সেই মুহূর্তটি এলেই তাদের সঙ্গে সহযোগিতায় শত্রুপক্ষের যথোচিত ভাগ্য-নির্ধারণের আয়োজন করব।
অনুচ্ছেদটি পড়া শেষ করে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুতুজভ মনোযোগ সহকারে হক্ৰিগসরাথের সদস্যটির দিকে তাকাল।
অস্ট্রিয় সেনাপতিটি এসব ঠাট্টা-বিদ্রুপের ধার ধারে না; সোজা কাজের কথায় যেতে সে বলল, কিন্তু ইয়োর এক্সেলেন্সি, এই সুবচনটি তো আপনি জানেন, সর্বদাই খারাপ অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকা ভালো। আপনা থেকেই সে একবার এড-ডি-কং-এর দিকে তাকাল।
কুতুজভ তাকে বাধা দিয়ে বলল, মাফ করবেন সেনাপতি। তারপর প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে বলল, দেখ হে, কসলভস্কির কাছ থেকে আমাদের স্কাউটদের সব রিপোর্ট নিয়ে এস। এই দুটো কাউন্ট নস্তিজের চিঠি, এটা হিজ হাইনেস আর্চডিউক ফার্দিনাদের চিঠি, আর এগুলিও নাও। এই সবগুলি পড়ে অস্ট্রিয় বাহিনীর চলাচলের যে সব খবর আমরা পেয়েছি সে সমস্ত উল্লেখ করে ফরাসিতে একটা পরিস্কার স্মারকলিপি তৈরি কর, এবং সেটা হিজ এক্সেলেন্সিকে দিয়ে দাও।
প্রিন্স আলু মাথা নোয়াল, কুতুজভ যা বলল তা সে ভালোভাবেই বুঝেছে; এমনকি কুতুজভ তাকে আরো যা বলতে পারত তাও সে বুঝেছে। কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে দুজনকেই অভিবাদন জানিয়ে আস্তে আস্তে কার্পেটের উপর পা ফেলে সে প্রতীক্ষালয়ে চলে গেল।
প্রিন্স আন্দ্রু রাশিয়া ছেড়ে এসেছে খুব বেশি দিন হয় নি, কিন্তু এরই মধ্যে সে অনেক বদলে গেছে। মুখের ভাবে ও হাঁটা-চলায় আগেকার সেই আলস্য ও উদাসীনতার লেশমাত্র নেই। তাকে নিয়ে অন্যে কি ভাবছে তা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় এখন তার নেই; সদাসর্বদাই সে কাজ নিয়ে ব্যস্ত। নিজেকে ও আশপাশের লোকজনদের নিয়ে সে যে সন্তুষ্ট তারই আভাস তার চোখে-মুখে; তার হাসি ও চাউনি আগের চাইতে অনেক বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়।
পোল্যান্ডে এসে সে কুতুজভের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কুতুজভ তাকে সাদরে গ্রহণ করেছে, কথা দিয়েছে তাকে ভুলবে না, অন্য অ্যাডজুটান্টদের তুলনায় তাকে উপরে তুলছে, সঙ্গে করে ভিয়েনায় নিয়ে এসেছে, এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার দিয়েছে। ভিয়েনা থেকে কুতুজভ তার পুরনো বন্ধু প্রিন্স আর বাবাকে চিঠিতে লিখেছে : তোমার ছেলে যে একজন বিশিষ্ট অফিসার হতে পারবে, তার শ্রমশীলতা, দৃঢ়তা ও কর্মে প্রবৃত্তিতেই তা বুঝতে পারছি। আমার পাশে এরকম একটি সহকারীকে পেয়ে নিজেকে আমি ভাগ্যবান মনে করছি।
পিটার্সবুর্গের সমাজে যেমন ছিল, এখানেও কুতুজভের কর্মচারীদের মধ্যে, তার সহকর্মী অফিসার ও সৈন্যদের মধ্যেও, প্রিন্স আন্দুকে নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মত গড়ে উঠেছে। একদল–তারা সংখ্যায় অল্প–তাকে নিজেদের থেকে আলাদা বলে মনে করে, এবং তার কাছ থেকে অনেক বড় কিছু প্রত্যাশা করে, তার কথা মন দিয়ে শোনে, তাকে প্রশংসা করে, অনুকরণ করে; তাদের সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রু বেশ স্বাভাবিকভাবে, খুশি মনে দিন কাটায়। আর একদল-তারা সংখ্যায় বেশি–তাকে অপছন্দ করে,-অহংকারী, উদাসীন ও অপ্রীতিকর মনে করে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করতে হবে প্রিন্স আন্দ্রু তা জানে; তাই তারাও তাকে শ্রদ্ধা করে, এমন কি ভয়ও করে।
কাগজপত্র নিয়ে প্রতীক্ষালয়ে ঢুকতেই বন্ধু কজলভস্কির সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। কজলভস্কি একজন কর্তব্যরত এড-ডি-কং। একটা বই নিয়ে সে জানালায় বসেছিল।
আরে, প্রিন্স যে? কজলভস্কি বলল।
আমরা কেন অগ্রসর হচ্ছি না তার কারণ ব্যাখ্যা করে একটা স্মারকলিপি লেখার হুকুম পেয়েছি।
কারণটা কি?
প্রিন্স আন্দ্রু কাঁধ ঝাঁকুনি দিল।
ম্যাকের কাছ থেকে কোনো খবর এসেছে?
না।
তার পরাজয়ের খবর সত্যি হলে অবশ্যই আসত।
বাইরের দরজার দিকে যেতে যেতে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, সম্ভবত।
ঠিক সেই মুহূর্তে একজন লম্বা অস্ট্রিয় সেনাপতি সশব্দে দরজাটা ঠেলে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকল। তার পরনে গ্রেটকোট, গলায় মারিয়া থেরেসা সামরিক চিহ্ন, মাথায় একটা কালো ব্যান্ডেজ জড়ানো। বোঝা গেল সে সবেমাত্র পৌঁছেছে। প্রিন্স আন্দ্রু মাঝপথে থেমে গেল।
