হুজার কর্নেটবাদক ঝেরকভ একসময় পিটার্সবুর্গ-এ দলখভের বাউণ্ডুলে দলে ছিল। এর আগেও বিদেশে দলখভের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, কিন্তু তখন তাকে চিনতে পারাটা সে সমীচীন মনে করে নি। কিন্তু যেহেতু এখন কুতুজভ স্বয়ং ভদ্রলোক-সৈনিকটির সঙ্গে কথা বলছে, তাই সেও পুরোনো বন্ধুর মতোই তার সঙ্গে ডেকে কথা বলল।
আরে ভাই, কেমন আছ? ঘোড়াটাকে আস্তে আস্তে হাঁটিয়ে নিয়ে সে বলল।
দলখভ ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল, কেমন আছি? যেমন তুমি দেখছ।
অফিসারদের সঙ্গে কেমন চালাচ্ছ? ঝেরকভ শুধাল।
ভালো। সকলেই লোক ভালো। আর তুমি তাদের মধ্যে ঢুকে পড়লে কেমন করে? আমাকে নিয়ে নিল; এখন আমি কর্তব্যরত।
দুজনই চুপ করে গেল।
ডান হাতের চওড়া আস্তিনের ভিতর থেকে সে আকাশে উড়িয়ে দিল বাজপাখিটাকে,–এই গানের সুরে সৈন্যদের মনে স্বতই জাগছে সাহস ও প্রফুল্লতা। এই গানটি না থাকলে তাদের আলোচনা হয়তো অন্যরকম হতো।
একথা কি সত্যি যে অস্ট্রিয়রা পরাজিত হয়েছে? দলখভ শুধাল ।
একমাত্র শয়তানই জানে। ওরা তো তাই বলছে।
গানের সঙ্গে তাল রেখে দলখভ সংক্ষেপে বলল, আমি খুশি।
ঝেরকভ বলল, আমি বলি কি, যে কোনোদিন সন্ধ্যায় চলে এস; ফারো খেলা যাবে।
সে কি, তোমার কি অনেক টাকা হয়েছে নাকি?
এসো তো।
আমি যেতে পারব না। প্রতিজ্ঞা করেছি। যতদিন পুনর্বহাল না হব ততদিন মদ খাব না, কোনোকিছু খেলব না।
আবার দুজন চুপ করল।
কোনোকিছু দরকার হলে এস। অফিসাররা অনেক সময়ই কাজে লাগে।
দলখভ হাসল। কিছু ভেবো না। আমার যদি কিছু দরকার হয়, তাহলে ভিক্ষা চাইব না–জোর করে নেব।
আরে, কিছু মনে করো না; আমি শুধু…
আর আমিও শুধু…
বিদায়।
তোমার সুস্বাস্থ্য…
দূর–আরো দূর পথ,
হে মোর স্বদেশ…
পায়ের জুতোর কাঁটা দিয়ে ঝেরকভ ঘোড়ার পেটে খোঁচা দিল; ঘোড়া জোর কদমে গানের তালে তালে ছুটল; সেনাদলকে পার হয়ে গাড়ির কাছে পৌঁছে গেল।
*
অধ্যায়-৩
সৈন্য-পরিদর্শন থেকে ফিরে এসে কুতুজভ অস্ট্রিয় সেনাপতিকে তার নিজের ঘরে নিয়ে গেল; এবং অ্যাডজুটান্টকে ডেকে পৌঁছবার পরে সৈন্যদের অবস্থা সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অগ্রবর্তী বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আর্চডিউক ফার্দিনান্দের কাছ থেকে যে সব চিঠিপত্র এসেছে তাও চেয়ে পাঠাল। সে সব কাগজপত্র নিয়ে ঘরে ঢুকল প্রিন্স আন্দ্রু বলকনস্কি। কুতুজভ ও হফক্রিগসরাথের অস্ট্রিয় সদস্যটি একটা টেবিলের পাশে বসেছিল। টেবিলের উপর একটা পরিকল্পনার নক্সা খোলা।
বলকনস্কির দিকে তাকিয়ে কুতুজভ বলল, ওঃ! এই একটি শব্দের সাহায্যেই অ্যাডজুটান্টকে অপেক্ষা করতে বলে সে ফরাসি ভাষায় আলাপ চালিয়ে যেতে লাগল।
অদ্ভুত উচ্চারণে চোস্ত ভাষায় সে বলল, আমি শুধু এইটুকুই বলতে পারি সেনাপতি, ব্যাপারটা যদি আমার । ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর নির্ভর করত তাহলে হিজ ম্যাজেস্টি সম্রাট ফ্রান্সিসের মনোবাসনা অনেক আগেই পূর্ণ হত। অনেক আগেই আমি আর্চডিউকের সঙ্গে যোগ দিতাম। আমার কথা বিশ্বাস করুন, সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পরিচালনা-ভার কোনো বিজ্ঞতর ও অধিকতর কুশলী সেনাপতির–সে রকম সেনাপতি অস্ট্রিয়ায় অনেকে আছেন-হাতে তুলে দিয়ে এই গুরুদায়িত্ব হতে অব্যাহতি পেলে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই খুশি হাতম। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনেক সময়ই আমাদের চাইতে বেশি শক্তিশালী হয়ে থাকে সেনাপতি।
কুতুজভ এমনভাবে হাসল যেন বলতে চাইল, আমার কথা বিশ্বাস না করবার অধিকার তোমার অবশ্যই আছে, আর তুমি বিশ্বাস কর আর না কর তাতে আমার কিছুই যায় আসে না; কিন্তু সে কথা বলবার কোনো কারণ তুমি পাও নি। আর সেটাই মোদ্দা কথা।
অস্ট্রিয় সেনাপতিকে দেখে অসন্তুষ্ট মনে হল, কিন্তু সেই একই সুরে জবাব দেওয়া ছাড়া তার উপায় ছিল না।
এমন উন্মা ও প্রতিবাদের সুরে সে কথা বলল যা তার স্তুতিবাচক কথাগুলির সঙ্গে মোটেই খাপ খায় না। সে বলল, বরং এ যুদ্ধে সম্মিলিত উদ্যোগে ইয়োর এক্সেলেন্সির যোগদানকে হিজ ম্যাজেস্টি খুবই মূল্য দিয়ে থাকেন; কিন্তু আমরা মনে করি, বর্তমানের এই বিলম্বের ফলে রুশ বাহিনী ও তাদের সেনাপতি সেই জয়ের মালা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যুদ্ধে যে মালা লাভ করতেই তারা চিরকাল অভ্যস্ত, পূর্ব-চিন্তিত এই পংক্তিটি দিয়েই সে তার বক্তব্য শেষ করল।
কুতুজভ সেই একই হাসি হেসে মাথা নিচু করল।
বলল, কিন্তু এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস; হিজ হাইনেস আর্চডিউক ফার্দিনানন্দ সর্বশেষ যে চিঠিখানি লিখে আমাকে সম্মানিত করেছেন সে চিঠিকে বিচার করে আমি আশা করি যে, সেনাপতি ম্যাকের মতো একজন কুশলী নেতার পরিচালনায় অস্ট্রিয় বাহিনী ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত জয়লাভের অধিকারী হয়েছে, এবং আমাদের সাহায্যের কোনো প্রয়োজনই তাদের আর নেই।
সেনাপতি ভুরু কুঁচকাল। যদিও অস্ট্রিয়ার পরাজয়ের কোনো নির্দিষ্ট সংবাদ এখনো আসে নি, তবু চারদিকে যে সব প্রতিকূল গুজব ছড়িয়েছে তার সমর্থনসূচক কিছু কিছু ঘটনার কথা জানা গেছে; কাজেই অস্ট্রিয়ার জয়লাভের যে আশা কুতুজভ প্রকাশ করল সেটা অনেকটা ব্যঙ্গের মতোই শোনাল। কিন্তু কুতুজভ সেই একইভাবে খোলাখুলি হাসতে লাগল; যেন সে বলতে চায়, এ কথা মনে করবার অধিকার তার আছে। বস্তুত, ম্যাকের বাহিনীর কাছ থেকে সর্বশেষ যে চিঠিটা সে পেয়েছে তাতে একটা জয়লাভের কথা জানানো হয়েছে; আরো বলা হয়েছে যে, রণ-কৌশলের দিক থেকে সে বাহিনীর অবস্থান বেশ অনুকূল।
