তিমখিন বলল, চাকরির ক্ষেত্রে লোকটি খুবই খুঁতখুঁতে ইয়োর এক্সেলেন্সি; কিন্তু তার চরিত্র…।
চরিত্রের বিষয়ে কি জানতে চাও? রেজিমেন্ট-কমান্ডার জিজ্ঞাসা করল।
ক্যাপ্টেন জবাব দিল, সে এক একদিন এক এক রকম। একদিন বেশ বুদ্ধিমান, সুশিক্ষিত, সৎস্বভাব। আবার পরের দিনই একটা বুনো জন্তু।…পোল্যান্ডে তো একজন ইহুদিকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল।
আহা, ঠিক আছে, ঠিক আছে! রেজিমেন্ট-কমান্ডার বলে উঠল। তথাপি একটি যুবক বিপদে পড়লে তাকে তো দয়া করতেই হবে। তুমি তো জান, অনেক ভালো ভালো লোকের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।…অতএব তুমি শুধু…।
তা করব ইয়োর এক্সেলেন্সি, তিমখিল বলল; হাসিটা দিয়েই সে বুঝিয়ে দিল যে কমান্ডারের মনের ইচ্ছা সে বুঝতে পেরেছে।
আরে, সে তো বটেই, সে তো বটেই!
রেজিমেন্ট-কমান্ডার সৈন্যদের ভিতর থেকে দলখভকে খুঁজে বের করে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে তাকে বলল :
পরবর্তী ব্যাপারের পরেই…স্কন্ধত্ৰাণ।
দলখভ চারদিকে তাকাল, কিছু বলল না, আবার ঠোঁটের বিদ্রুপের হাসিটিও বদলাল না।
রেজিমেন্ট-কমান্ডার বলতে লাগল, আচ্ছা, তাহলে সব ঠিক হয়ে গেল। তারপর যাতে সৈন্যরা সকলেই শুনতে পায় সেইভাবে বলল, প্রত্যেক সৈন্যকে এক পেয়ালা ভদকা আমি দেব। সকলকে ধন্যবাদ। ঈশ্বরের জয় হোক! ঘোড়া ছুটিয়ে সে কোম্পানিকে পার হয়ে সে পরেরটাকে ধরল।
পাশের অধীনস্থ সাব-অল্টার্নকে তিমখিন বলল, দেখ হে, লোকটি সত্যি ভালো; ওর অধীনে কাজ করা চলে।
এক কথায়, রাজা লোক… সাব-অল্টার্ন হেসে বলল (সকলে রেজিমেন্ট-কমান্ডারকে হরতনের রাজা বলে ডাকে)।
পরিদর্শনের পরে অফিসারদের খুশির মেজাজ সৈন্যদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে। সৈন্যরা মনের আনন্দে এগিয়ে চলল।
অথচ তারা বলেছিল, কুতুজভের এক চোখ কানা?
তাই তো! একেবারে কানা!
না বন্ধু, তার চোখ তোমার চাইতে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। বুট, পায়ের পড়ি…সব তার নজরে পড়ে।…
তিনি যখন আমার পায়ের দিকে তাকালেন বন্ধু,…আরে, ধরেই ফেললেন যে আমি…
আর তার সঙ্গী অপর লোকটি, সেই অষ্ট্রিয় ভদ্রলোক, দেখলেই মনে হয় যেন খড়ির গুঁড়ো মাখানো–একেবারে ময়দার মতো শাদা! আমার মনে হয়, লোকে যেমন বন্দুক পালিশ করে তেমনি তাকেও ঠেসে পালিশ করে।
আমি বলি, ফেডেশন!…তিনি কি বললেন যুদ্ধ কখনো শুরু হবে? তুমি তো কাছেই ছিলে। সকলেই বলছে, বোনাপার্ত স্বয়ং ব্রাউনাউতে ছিল।
বোনপার্ত স্বয়ং! ওই বোকার কথা তুমি শুনছ! তিনি তো কিছুই জানেন না! এখন প্রাশিয়া যুদ্ধে নেমেছে। অস্ট্রিয়া তাদের ঘায়েল করছে। তারা ঘায়েল হলে তবে বোনাপার্তের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হবে। আর তিনি বলছেন বোনাপার্ত ব্রাউনাউতে হাজির! বোঝা যাচ্ছে, তুমিও মুখখু। আরো ভালো করে শোনা উচিত ছিল!
এই তদারককারী লোকগুলো কী শয়তান! দেখ, পঞ্চম কোম্পানিটি এর মধ্যেই গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।…আমরা বাসাবাড়িতে পৌঁছবার আগেই ওদের সব রান্নাবান্না শেষ হয়ে যাবে।
তুমি শয়তান, একটা বিস্কুট তো দাও!
কাল কি আমাকে তামাকু দিয়েছিলে? এই রকমই হয় বন্ধু। ঠিক আছে, এই নাও।
এখানেই তো থামালে পারত; নইলে তো না খেয়ে আরো চার মাইল ছুটতে হবে।
ঐ জার্মানরা যখন আমাদের গাড়িতে তুলে নিয়েছিল তখন কী মজাই হয়েছিল! চুপচাপ বসে থাক, আর হুটহুট চলে যাও।
আরে বন্ধু, এখানকার লোকগুলো একেবারে ভিখারি। সেখানে তারা ছিল পোল–সবাই রাশিয়ার রাজার অধীন–কিন্তু এখানে সকলেই খাস জার্মান।
ক্যাপ্টেনের হুকুম শোনা গেল : গায়করা সামনে এস!
অমনি বিভিন্ন দল থেকে প্রায় বিশজন সামনে এগিয়ে গেল। তাদের নেতা একজন ভেরীবাদক; গায়কদের দিকে মুখ করে সবেগে হাত নেড়ে সে একটা লম্বা সৈনিক-সঙ্গীত শুরু করে দিল। গানের শুরুতে : সকাল হল, সূর্য উঠল আর শেষে : এবার ভাই হো, চল গৌরবের পথে; সামনে মোদের আছে ফাদার কামেনস্কি। গানটি রচনা করা হয়েছিল তুর্কি অভিযানের সময়; এখন গাওয়া হচ্ছে অস্ট্রিয়াতে; পরিবর্তনের মধ্যে শুধু ফাদার কামেনস্কির জায়গায় বসানো হয়েছে ফাদার কুতুজভ।
শেষের কথাগুলি একসঙ্গে ছুঁড়ে দিয়ে এবং যে কোনোকিছু মাটিতে ছুঁড়ে দিচ্ছে এমনিভাবে হাতটা দুলিয়ে ভেরীবাদক কড়া চোখে গায়কদের দিকে চোখ গোল-গোল করে তাকাল। যখন বুঝল যে সকলে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে তখন সে হাত দুটিকে এমনভাবে তুলল যেন কোনো অদৃশ্য মূল্যবান জিনিসকে সযত্নে তুলছে, আর তার পরেই হঠাৎ সেটাকে নিচে ছুঁড়ে দিয়ে গান ধরল :
কুঞ্জবন, আমার কুঞ্জবন…।
আমার নতুন কুঞ্জবন…! আরো বিশ জন তাতে সুর মেলাল; আর মন্দিরাবাদকটি তার ভারি যন্ত্র নিয়ে ছুটে সকলের সামনে এগিয়ে গেল, আর এমনবাবে ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে যন্ত্রটা ঘুরাতে লাগল যেন কাউকে ভয় দেখাচ্ছে। সৈন্যরা দুই হাত দুলিয়ে তালে তালে পা ফেলে চলতে লাগল। সৈন্যদের পিছনে চাকার শব্দ, স্প্রিংয়ের কাঁচ-কাঁচ, আর ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ শোনা যেতে লাগল। কুতুজভ ও তার দলবল শহরের পথ ধরল। প্রধান সেনাপতি ইশারায় জানালা, সৈন্যরা আরামে মার্চ করে চলুক; গান শুনে ও সৈন্যদের নাচ ও মার্চ দেখে তারা সকলেই সন্তোষ প্রকাশ করল। ডানদিকে দ্বিতীয় সারিতে একটি নীল-চোখ সৈন্য সহজেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে দলখভ। গানের তালে তালে সুষম ভঙ্গিতে সে সদর্পে পা ফেলে চলেছে, আর যারা সৈন্যদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে না এগিয়ে গাড়িতে চড়ে চলে যাচ্ছে তাদের সকলকেই করুণার চোখে দেখছে। কুতুজভের দলের যে কর্নেটবাদক হুজার রেজিমেন্ট-কমান্ডারকে নকল করছিল সে ঘোড়া নিয়ে পিছিয়ে এসে দলখভের কাছে হাজির হল।
