কুতুজভ ধীরে ধীরে আলস্যভরে হেঁটে চলেছে; তাদের প্রধানকে দেখবার জন্য হাজার হাজার চোখ যেন কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসছে। তৃতীয় কোম্পানির কাছে পৌঁছে সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দলের লোকেরা এটা আশা; তাই তারা আপনা থেকেই তার অনেকটা কাছে এসে পড়ল।
নীল গ্রেটকোটের জন্য যাকে তিরস্কার করা হয়েছিল সেই লাল-নাক ক্যাপ্টেনকে চিনতে পেরে সে বলল, আরে, তিমখিন!
রেজিমেন্ট-কমান্ডার যখন তিরস্কার করেছিল তখন তিমখিন যতটা টান-টান হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার চাইতে টান-টান হওয়া কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় বলেই মনে হয়েছিল; কিন্তু এখন প্রধান সেনাপতি যখন তার সঙ্গে কথা বলল তখন সে এত বেশি টান-টান হল যাতে মনে হল যে প্রধান সেনাপতি কথা চালিয়ে গেলে সে আর তাল রাখতে পারত না। কুতুজভও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এবং তার ভালো ছাড়া মন্দ চায় না বলে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে গেল; তার ক্ষত-চিহ্নিত ফোলা মুখে একটুকরো হাসি খেলে গেল।
সে বলল, আর একটি ইসমাইলের বন্ধু। একটি সাহসী অফিসার। আপনি কি ওকে নিয়ে সন্তুষ্ট? সে রেজিমেন্ট-কমান্ডারকে জিজ্ঞাসা করল।
হুজার অফিসার যে পিছন থেকে তাকে আয়নার মতো নকল করছে সেটা না বুঝতে পেরে রেজিমন্ট কমান্ডার সামনে এগিয়ে গিয়ে জবাব দিল : অত্যন্ত সন্তুষ্ট ইয়োর এক্সেলেন্সি!
চলে যেতে যেতে কুতুজভ হেসে বলল, আমাদের সকলেরই ত্রুটি-বিচ্যুতি আছেই। এক সময়ে ব্যাকস (রোমের সুরা-দেবতা)-এর প্রতি ওর বিশেষ টান ছিল।
রেজিমেন্ট-কমান্ডারের ভয় হল, এ দোষে সেও তো দোষী; তাই কোনো জবাব দিল না। ঠিক সেই সময়েই হুজারটি লাল-নাক ক্যাপ্টেনের মুখ ও পেটের দিকে লক্ষ্য করে তার ভাবভঙ্গির এমন অবিকল নকল করতে লাগল যে নেসভিৎস্কি না হেসে পারল না। কুতুজভ ঘুরে দাঁড়াল। নিজের মুখের উপর অফিসারটির সম্পূর্ণ দখল ছিল; তাই কুতুজভ মুখ ফেরাবার আগেই সে একবার মাত্র ভেংচি কেটে মুখে একটা গম্ভীর, শ্রদ্ধাশীল ও সরল ভাব জাগিয়ে তুলতে পারল।
তৃতীয় কোম্পানিটিই শেষ। যেন কোনোকিছু মনে করতে চেষ্টা করছে এমনিভাবে কুতুজভ চুপ করে ভাবতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রু দলের ভিতর থেকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফরাসিতে আস্তে বলল :
অফিসার দলখভের কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে বলেছিলেন; এই রেজিমেন্টেই সেই লোকটির পদাবনতি ঘটানো হয়েছে।
দলখভ কোথায়? কুতুজভ জানতে চাইল।
দলখভ ইতিমধ্যেই সৈনিকের ধূসর গ্রেট-কোট গায়ে চড়িয়েছে। সে ডাকের অপেক্ষায় রইল না। পরিষ্কার নীল চোখ ও সুন্দর চুল সহ একটি সুগঠিত মূর্তি সেনাদলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে প্রধান সেনাপতির কাছে গিয়ে সশস্ত্র অভিবাদন জানাল।
তোমার কি কোনো নালিশ আছে? কুতুজভ ঈষৎ ভ্রুকুটি করে প্রশ্ন করল।
এই দলখভ, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
ওঃ! কুতুজভ বলল। আশা করি এতেই তোমার শিক্ষা হবে। কর্তব্য করে যাও। সম্রাট উদার, আর তুমি উপযুক্ত হলে আমিও তোমাকে ভুলব না।
পরিষ্কার নীল দুটি চোখ যে ভাবে রেজিমেন্ট-কমান্ডারের দিকে তাকিয়েছিল, ঠিক তেমনি সাহসের সঙ্গে তাকাল প্রধান সেনাপতির দিকেও; চিরাচরিত প্রথার যে যবনিকাটা প্রধান সেনাপতি ও একটি সাধারণ সৈনিকের মধ্যে এত বড় ব্যবধান সৃষ্টি করে, তার চোখের সেই দৃষ্টি যেন তাকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইল।
ইচ্ছা করেই দৃঢ়, অনুরণিত স্বরে দলখভ বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সির কাছে আমার একটি প্রার্থনা আছে। আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবার একটা সুযোগ আমি চাই; মহামান্য সম্রাট ও রাশিয়ার প্রতি আমার অনুরাগ প্রমাণ করতে চাই।
কুতুজভ সেখান থেকে সরে গেল। চোখের যে হাসি হেসে সে ক্যাপ্টেন তিমখিনের কাছ থেকে সরে গিয়েছিল, সেই একই হাসি খেলে গেল তার মুখে। মুখটা বেঁকিয়ে সে সরে গেল; যেন বলতেই চাইল, তাকে দলখভের যা কিছু বলার আছে এবং সে দলখভকে যা কিছু বলতে পারে সে সবই তার জানা আছে, সে সব শুনে শুনে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আর শুনতে চায় না। মুখ ফিরিয়ে সে গাড়িতে উঠে বসল।
রেজিমেন্ট নানা দলে ভাগ হয়ে ব্রাউনাউয়ের নিকটবর্তী যার যার নির্দিষ্ট বাসাবাড়িতে চলে গেল। আশা আছে, সেখানে তারা বুট পাবে, পোশাক পাবে, কঠোর অভিযানের পরে বিশ্রাম পাবে।
তৃতীয় কোম্পানি বাসাবাড়ির দিকে চলেছে। ঘোড়ায় চেপে তাদের ধরে ফেলে ক্যাপ্টেন তিমখিনের কাছে পৌঁছে রেজিমেন্ট-কমান্ডার বলল, তুমি আমার উপর রাগ করো নি তো প্রোখর ইগনাতিচ? (পরিদর্শন ভালোভাবে শেষ হওয়ায় রেজিমেন্ট-কমান্ডারের মুখটা অদম্য খুশিতে জলমল করছে।) সম্রাটের চাকরির রীতিই এই।…কোনো উপায় নেই…প্যারেডের সময় কখনো কখনো কিছুটা তাড়াহুড়া করতেই হয়…আমিই প্রথম ক্ষমা চাইছি, তুমি তো আমাকে চেন!…তিনি খুব খুশি হয়েছেন! ক্যাপ্টেনের দিকে সে হাতটি বাড়িয়ে দিল।
ও কথা বল না সেনাপতি; অতটা সাহস আমার হত না! ক্যাপ্টেন জবাব দিল। তার নাকটা আরো লাল হয়ে উঠল; ইসমাইলে বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে তার সামনের যে দুটো দাঁত উড়ে গিয়েছিল, হেসে ওঠায় সে জায়গাটা বেরিয়ে পড়ল।
আর মি. দলখভকে বল তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আমি তাকে ভুলব না। দয়া করে আমাকে জানিও-আমি নিজেই জানতে চাই–তার আচার-ব্যবহার কেমন থাকে; আর সাধারণভাবে…
