কোম্পানি-কমান্ডার ঊর্ধ্বতন কর্মচারীর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে দুটো আঙুলে টুপিটাকে এমনভাবে চাপতে লাগল যেন সেই চাপের উপরেই তার রক্ষা পাবার একমাত্র আশা নির্ভর করছে।
কি হল, কথা বলছেন না কেন? হাঙ্গেরিয় পোশাক পরা লোকটাকে কোথা থেকে জোটালেন? গম্ভীর বিদ্রুপের সুরে কমান্ডার বলল।
ইয়োর এক্সেলেন্সি…
ইয়োর এক্সেলেন্সি কি? ইয়োর এক্সেলেন্সি! ইয়োর এক্সেলেন্সির ব্যাপারটা কি?…কেউ জানে না।
ক্যাপ্টেন নরম গলায় বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সি, এই অফিসার দলখভকে সাধারণ সৈনিকের পদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আচ্ছা? তা–তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে কি ফিল্ড-মার্শালের পদে, না কি একজন সৈনিকের পদে সৈনিক হলে তো অন্য সকলের মতোই নিয়মমাফিক ইউনিফর্মই তারও পরা উচিত।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, মার্চের সময় সে অনুমতি তো আপনি নিজেই দিয়েছিলেন।
অনুমতি দিয়েছিলাম? অনুমতি? আপনার মতো যুবকদের মতো কথাই বটে, একটু নরম হয়ে রেজিমেন্ট কমান্ডার বলল। অনুমতিই বটে…একজন কি বলল আর আপনিও…কি বলেন? অধিকতর বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠল, মিনতি করে বলছি, আপনার সৈন্যদের একটু ভালোভাবে পোশাক পরাবেন।
অ্যাডজুটান্টকে দেখবার জন্য মুখ ঘুরিয়ে কমান্ডার সেই দিকে পা চালিয়ে দিল। এতটা রাগ দেখাতে পেরে সে নিজেই বেশ খুশি হয়েছে; আরো রাগ দেখাবার একটা অজুহাত পাবার জন্য সে সৈন্যদলের পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। ব্যাজটা অপরিষ্কার থাকার জন্য একজন অফিসারকে এবং লাইনটা সোজা না থাকার জন্য অপর একজনকে বকুনি দিয়ে সে তৃতীয় কোম্পানির কাছে গিয়ে হাজির হল।– নীল-ধূসর ইউনিফর্ম পরা দলখভের কাছ থেকে পাঁচটি সৈন্যের আগে পৌঁছেই যন্ত্রণাকাতর গলায় কমান্ডার চেঁচিয়ে উঠল, কে-মন ভাবে দাঁড়িয়ে আছ? তোমার পা কোথায়?
পরিষ্কার উদ্ধত দুটি চোখ সোজা সেনাপতির মুখের উপর রেখে দলখভ ধীরে ধীরে তার বাঁকা হাঁটুটাকে সোজা করল।
নীল কোট কেন? ওটা খুলে ফেল…সার্জেন্ট-মেজর! ওর কোটটা পাল্টে দিন…রাস… কথাটা সে শেষ করল না।
সেনাপতি, হুকুম মানতে আমি বাধ্য, কিন্তু অপমান… দলখভ তাড়াতাড়ি তাকে বাধা দিয়ে বলল।
কোনো কথা নয়।…কোনো কথা নয়, কোনো কথা নয়!
অপমান সহ্য করতে বাধ্য নই, ঝাঁঝালো উচ্চগ্রামে দলখভ তার কথাটা শেষ করল।
সেনাপতি ও সৈনিকের চোখে চোখ পড়ল। সেনাপতি চুপ করে গেল; রেগে আঁটো গলাবন্ধটাকে টেনে নামিয়ে দিল।
মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে যেতে বলল, তোমাকে অনুরোধ করে বলছি, কোটটা বদলে ফেল।
*
অধ্যায়-২
সেই মুহূর্তে সংকেত-জ্ঞাপন হাঁক দিল, তিনি আসছেন!
মুখটা লাল করে রেজিমেন্ট-কমান্ডার ছুটে ঘোড়র কাছে গিয়ে কম্পিত হাতে পা-দানিটা ধরে জিনের উপর উঠে ঠিক হয়ে বসল, তলোয়ারখানা খুলল, এবং খুশি-খুশি দৃঢ় মুখে হাঁক দেবার জন্য প্রস্তুত হল। পরিষ্কার পাখনা-মেলা পাখির মতো একবার ঝটপটিয়েই গোটা রেজিমেন্ট একেবারে চুপ করে গেল।
আত্ম-কাঁপানো গলায় রেজিমেন্ট-কমান্ডার হাঁক দিল, …! সে হাঁকে একযোগে ফুটে উঠল তার নিজের আনন্দ, রেজিমেন্টের কঠোরতা, আর আগতপ্রায় প্রধানের প্রতি অভ্যর্থনা।
চওড়া গ্রাম্য পথের দুধারে গাছের সারি; সেই পথ ধরে এগিয়ে আসছে ছয় ঘোড়ায় দুলকি চালে টানা একটা উঁচু হাল্কানীল রঙের ভিয়েনা-গাড়ি। তার পিছনে একদল অশ্বারোহী ও অন্যান্য সৈনিক। কুতুজভের পাশে বসে আছে একজন অস্ট্রিয় সেনাপতি; রুশদের কালো ইউনিফর্মের মধ্যে তার শাদা ইউনিফর্মটা অদ্ভুত দেখাচ্ছে। রেজিমেন্টের সামনে এসে গাড়িটা থামল। কুতুজভ ও অস্ট্রিয় সেনাপতি নিচু গলায় আলাপ করছিল; কুতুজভ ঈষৎ হেসে ভারী পা ফেলে এমনভাবে গাড়ি থেকে নামল যেন এই যে দুহাজার লোক রুদ্ধনিঃশ্বাসে তাকে দেখছে, তাদের এবং রেজিমেন্ট-কমান্ডারের কোনো অস্তিত্বই নেই।
সামরিক নির্দেশ ধ্বনিত হল; সৈন্যদের অস্ত্রের ঝনঝনার সঙ্গে গোটা রেজিমেন্ট আর একবার দুলে উঠল। তারপর মৃত্যু-স্তব্ধতার মধ্যে শোনা গেল প্রধান সেনাপতির দুর্বল কণ্ঠস্বর। রেজিমেন্ট যেন গর্জে উঠল, ইয়োর এক্স-এ-লেন্সি, আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করি! তারপর আবার সব নিশ্চুপ। রেজিমেন্ট চলতে শুরু করল। কুতুজভ তখনো নিশ্চল দাঁড়িয়ে; তারপর শাদা ইউনিফর্মধারী সেনাপতিকে সঙ্গে নিয়ে সেও সদলবলে সৈন্যদের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে লাগল।
রেজিমেন্ট-কমান্ডার যে ভাবে চাটুকারের মতো এগিয়ে গিয়ে প্রধান সেনাপতিকে অভিবাদন জানাল ও দুই চোখ মেলে তাকে যেন গিলতে লাগল, যে ভাবে ঝুঁকে ঝুঁকে টলতে টলতে এগিয়ে গেল, প্রধান সেনাপতির প্রতিটি কথা ও ভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে ছুটে সামনে গেল, তা থেকেই বোঝা গেল যে কমান্ডার হিসেবে তার কর্তব্যের চাইতেও একজন অধীনস্থ কর্মচারীর মতোই অতি উৎসাহে সে কাজগুলি করছে। রেজিমেন্ট কমান্ডারের কঠোরতা ও প্রগাঢ় মনোযোগকে ধন্যবাদ, সেই সময়ে অন্য যে সব রেজিমেন্ট ব্রাউনাইতে পৌঁছেছিল তাদের তুলনায় এই রেজিমেন্টটির অবস্থা ছিল চমৎকার। অসুস্থ ও পিছিয়ে-পড়া সৈন্য ছিল মাত্র ২১৭ জন। একমাত্র বুট ছাড়া আর সবকিছুই ঠিক ঠিক অবস্থায় ছিল।
কুতুজভ সৈন্যদের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলল; কখনো তুরস্কের যুদ্ধে পূর্ব-পরিচিত অফিসারদের সঙ্গে দু চারটি বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলল, কখনো বা কথা বলল সৈনকিদের সঙ্গে। তাদের বুটের দিকে তাকিয়ে বার কয়েক দুঃখিতভাবে মাথা নাড়ল; মুখের এমন ভাব করে সেদিকে অস্ট্রিয় সেনাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করল যেন বলতে চাইল যে সে কাউকেই দোষ দিচ্ছে না, আবার এই শোচনীয় অবস্থাটা লক্ষ্য না করেও পারছে না। পাছে তার রেজিমেন্ট সম্পর্কে একটি কথাও তার কানকে এড়িয়ে যায় এই ভয়ে সেরূপ প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেজিমেন্ট-কমান্ডার ছুটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কুতুজভের প্রতিটি কথা যাতে শোনা যায় ততটা দূরত্ব বজায় রেখে দলের প্রায় বিশ্ব জন তার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। প্রধান সেনাপতির সবচাইতে কাছাকাছি চলেছে একজন সুদর্শন অ্যাডজুটান্ট। সেই প্রিন্স বলকনস্কি। তার পরেই রয়েছে তার বন্ধু নেসভিৎস্কি; লম্বা একজন স্টাফ-অফিসার, খুব শক্ত-সমর্থ, সময় হাসি-ভরা সুন্দর মুখ, আর ভেজা-ভেজা চোখ। তার পাশেই হেঁটে চলেছে একজন কালো-কালো হুজার অফিসার; লোকটির ভাবভঙ্গি দেখে নেসভিৎস্কি হাসি সামলাতে পারছে না। হুজারের মুখটা গম্ভীর, হাসি নেই, স্থির, দৃষ্টিতে ভাবের কোনো পরিবর্তন নেই; রেজিমেন্ট-কমান্ডারের পিঠের দিকে তাকিয়ে সে অনবরত তার চলাফেরার নকল করে চলেছে। কমান্ডার যতবার ছুটে গিয়ে সামনে ঝুঁকছে, ততবারই হুজারটি অবিকল সেইভাবে ছুটে গিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াচ্ছে। নেসভিৎস্কি হাসছে আর অন্যদের খোঁচা মেরে ভাঁড়ামিটা দেখাচ্ছে।
