রেজিমেন্ট-কমান্ডার লোকটি বয়স্ক, কোপণস্বভাব, মজবুত গড়ন, অভিজ্ঞ; ভুরু ও জুলফি ধূসর, এবং ঘাড়-গর্দান অপেক্ষা বুক ও পিঠের দিকটা বেশি চওড়া। পরনে তকতকে নতুন ইউনিফর্ম, তার প্রতিটি ভজ চোখে পড়ে, সোনার মোটা স্কন্ধত্রাণ চওড়া কাঁধের উপর এলিয়ে না পড়ে খাড়া হয়ে আছে। তার ভঙ্গিখানাই এমন যেন মনের হরষে জীবনের একটি গভীর কর্তব্য সে পালন করছে। সে সৈন্যদের সামনে দিয়ে চলাফেরা করছে, আর প্রতিটি পদক্ষেপে পিঠটাকে ঈষৎ বেঁকিয়ে নিজেকে সোজা করে রাখছে। পরিষ্কার বোঝা যায়, কমান্ডার তার রেজিমেন্টকে প্রশংসা করে, তাকে নিয়ে তার মন খুব খুশি, সারাটা মন তাকে নিয়েই মেতে আছে; কিন্তু তার গর্বিত চলন দেখে মনে হয়, সামরিক বিষয়াদি ছাড়া সামাজিক স্বার্থ এবং সুন্দরী নারীরাও তার চিন্তার অনেকখানি জুড়ে রয়েছে।
একজন ব্যোটেলিয়ান-কমান্ডার হাসি মুখে এগিয়ে যাচ্ছিল (দেখে বোঝা যায়, এরা দুজনই বেশ সুখী); তাকে লক্ষ্য করে রেজিমেন্ট-কমান্ডার বলল, আরে, মাইকেল মিত্রিচ, স্যার? কাল রাতে তো হাতে অনেক কাজ ছিল। যাহোক, রেজিমেন্টটা মন্দ নয়, কি বলেন?
ব্যাটেলিয়ান-কমান্ডার হাস্যকর ব্যঙ্গটি ধরতে পেরে হেসে উঠল।
জারিৎসিন প্রান্তরে একে রণক্ষেত্র থেকে হটিয়ে দেওয়া যাবে না।
কি বললেন? কমান্ডার প্রশ্ন করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে শহরের দিক থেকে আসবার যে রাস্তায় সংকেত-প্রেরকদের বসানো হয়েছিল সেই রাস্তায় দুটি অশ্বারোহীকে দেখা গেল। তাদের একজন এড-ডি-কং, তার পিছনে একজন কসাক।
আগের দিনের হুকুম-নামায় ভাষার গোলমাল ছিল বলে আজ এড-ডি-কংকে পাঠিয়ে পরিষ্কার করে জানানো হচ্ছে যে, রেজিমেন্টটি যেভাবে মার্চ করে আসছিল, প্রধান সেনাপতি ঠিক সেই অবস্থাতেই সেটাকে পরিদর্শন করতে ইচ্ছুক : পরনে থাকবে গ্রেট-কোট, কাঁধে ঝোলা; কোনো রকম তৈরি হওয়া চলবে না।
আগের দিন হফক্রিগসরাথের জনৈক সদস্য ভিয়েনা থেকে এসে কুতুজভের কাছে প্রস্তাব ও দাবি রেখেছে, সে যেন আর্চডিউক ফার্ডিনান্ড ও ম্যাকের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়, আর কুতুজভ এই যোগ দেওয়াটাকে যুক্তিযুক্ত বিবেচনা না করায় অন্যান্য যুক্তির সঙ্গে এটাও স্থির করেছে যে রাশিয়া থেকে আসতে এই সৈন্যদের অবস্থা যে কতদূর শোচনীয় হয়েছে সেটাও অস্ট্রিয় সেনাপতিকে দেখিয়ে দেওয়া হোক। এই উদ্দেশ্য নিয়েই সে রেজিমেন্ট পরিদর্শনে আসতে চেয়েছে; কাজেই রেজিমেন্টের অবস্থা যত শোচনীয় হবে, প্রধান সেনাপতি ততই খুশি হবে। এড-ডি-কং এসব কথা জানত না; তবু সে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিল, সৈন্যদের পরনে গ্রেট-কোট থাকবে, আর তারা অভিযানরত অবস্থায় থাকবে; অন্যথায় প্রধান সেনাপতি অসন্তুষ্ট হবেন। এ কথা শুনে রেজিমেন্ট-সেনাপতি মাথা নিচু করল, নীরবে কাঁধ ঝাঁকুনি দিল, সক্রোধে হাত দুটো ছড়িয়ে দিল।
বলে উঠল, সবই তো তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি! তিরস্কারের সুরে ব্যাটেলিয়ান-কমান্ডারকে বলল, এখন বুঝুন! আমি বলি নি মাইকেল মিত্রি যে অভিযানরত অবস্থা মানেই গায়ে গ্রেট-কোট থাকবে? কয়েক পা এগিয়ে আবার বলল, হা ঈশ্বর! তারপর হুকুমে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁক দিল, কোম্পানি-কমান্ডারগণ! সার্জেন্ট মেজরগণ!…কতক্ষণে তিনি এখানে পৌঁছবেন? সসম্মানে সে এড-ডি-কংকে জিজ্ঞাসা করল।
তা বলা যায় এক ঘণ্টার মধ্যেই। পোশাক বদলাবার সময় পাব তো? আমি জানি না, জেনারেল…।
রেজিমেন্ট-কমান্ডার স্বয়ং সৈনিকদের কাছে গিয়ে প্রত্যেককে গ্রেট-কোট পরে নিতে বলল। কোম্পানি কমান্ডাররা তাদের সেনাদলের কছে ছুটল, সার্জেন্ট মেজররা হৈ-চৈ শুরু করে দিল (গ্রেট-কোটগুলোর অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না), আর সঙ্গে সঙ্গে সেনাদলের মধ্যে যে শৃঙ্খলা ও নীরবতা ছিল তার জায়গায় দেখা দিল ছুটাছুটি আর কলরব। সৈন্যরা চারদিকে ছুটাছুটি শুরু করল, কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে মাথার উপর দিয়ে পট্টি গলিয়ে থলে তুলে নিল, ওভার-কোটের পট্টি খুলে নিয়ে হাত তুলে পট্টির আস্তিন পরতে লাগল।
আধঘণ্টার মধ্যে আবার সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। রেজিমেন্ট-কমান্ডার ঝুঁকে পা ফেলে সেনাদলের সামনে হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে সবকিছু দেখে নিল।
এটা কি হয়েছে? এটা! চিৎকার করে উঠে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তৃতীয় কোম্পানির কমান্ডার!
সেনাপতি তৃতীয় কেম্পানির কমান্ডারকে চাইছেন।…কমান্ডার দেখা করুন সেনাপতির সঙ্গে-তৃতীয় কোম্পানি দেখা করুন কমান্ডারের সঙ্গে। কথাগুলি সেনাদলের মারফৎ পাঠানো হল, আর অ্যাডজুটান্ট নিখোঁজ অফিসারকে খুঁজতে ছুটল।
কথাগুলি যথাস্থানে পৌঁছবার পর নিখোঁজ অফিসারটি তার কোম্পানির পিছন থেকে বেরিয়ে এল। লোকটি মাঝ-বয়সী; দৌড়নো অভ্যাস নেই; তবু হোঁচট খেতে খেতে হাস্যকরভাবে সেনাপতির দিকে ছুটতে লাগল। স্কুলের ছেলেকে না-শেখা পড়া বলতে বললে তার মুখের যে রকম ভাব হয় সেই ভাব ফুটে উঠেছে ক্যাপ্টেনটির মুখে। নাকের উপর দাগ পড়েছে; অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে নাকটা লাল হয়ে উঠেছে; মুখটা বেঁকে-বেঁকে যাচ্ছে। কাছাকাছি এসে আস্তে পা ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উপস্থিত হলে সেনাপতি মাথা থেকে পা পর্যন্ত ক্যাপ্টেনকে দেখতে লাগল।
আপনি তো অচিরেই আপনার সৈন্যদের পেটিকোট পরাবেন দেখছি! এ সব কি? তৃতীয় কোম্পানির নীল কাপড়ের গ্রেট-কোট পরা একটি সৈনিককে দেখিয়ে চোয়াল বের করে রেজিমেন্ট-কমান্ডার চিৎকার করে বলল। কোথায় গিয়েছিলেন আপনি? প্রধান সেনাপতির আসবার কথা, আর আপনি নিজের জায়গা ছেড়ে চলে গেছেন? অ্যাঁ? প্যারেডে সৈন্যদের কীভাবে ফ্যান্সি কোটে সাজাতে হয় আপনাকে শিখিয়ে দেব।… অ্যাঁ…?
