বাবা যে আরো দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে এ কথাটা আন্দ্রু বলল না। তার মনে হলো, কথাটা বলা ঠিক হবে না।
এ সবই আমি করব বাবা, সে বলল।
বাস, এবার তাহলে বিদায়! চুমো খাবার জন্য ছেলের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে প্রিন্স তাকে আলিঙ্গন করল। একটা কথা মনে রেখো প্রিন্স আন্দ্রু, ওরা যদি তোমাকে মেরে ফেলে তাহলে তোমার এই বুড়ো বাবা মনে আঘাত পাবে।…অপ্রত্যাশিতভাবে একটু থেমে তারপরই খুঁতখুঁতে মেজাজে চিৎকার করে বলে উঠল : কিন্তু যদি শুনি যে নিকলাস বলকনস্কির ছেলের উপযুক্ত আচরণ তুমি করনি, তাহলে আজি লজ্জা বোধ করব!
ছেলে হেসে বলল, এ কথাটা আমাকে না বললেও পারতেন বাবা।
বৃদ্ধ চুপ করে রইল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, আরো একটা কথা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম, আমি যদি মারা যাই, আর আমার যদি ছেলে হয়, তাহলে তাকে আপনার কাছ থেকে নিয়ে যেতে দেবেন না–সে কথা কালও বলেছি, সে যেন আপনার কাছেই বড় হয় দেখবেন।
তোমার স্ত্রীও যাতে তাকে নিয়ে যেতে না পারে? বলেই বুড়ো লোকটি হেসে উঠল।
পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বুড়ো মানুষটির চোখ দুটি সরাসরি ছেলের চোখের উপর স্থিরনিবদ্ধ। বুড়ো প্রিন্সের মুখের নিচের দিকটা কুঁচকে উঠল।
তারপর দরজাটা খুলে হঠাৎ ক্রুদ্ধ জোর গলায় সে চেঁচিয়ে বলল, বিদায় নেয়া তো হলো। চলে যাও!
দরজার কাছে প্রিন্স আন্দ্রুকে এবং সাদা ড্রেসিং-গাউনপরা, চশমা-চোখে, পরচুলাবিহীন মাথায় বুড়ো লোকটিকে ক্রুদ্ধ গলায় চিৎকার করতে দেখে মুহূর্তের জন্য তাদের দিকে তাকিয়ে দুই প্রিন্সেসই বলে উঠল, কী হলো? কী হলো?
প্রিন্স আন্দ্রু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল, জবাব দিল না। স্ত্রীর দিকে ফিরে বলল, আচ্ছা।
এই আচ্ছা শব্দটা বড়ই নিরুত্তাপ ও ব্যাঙ্গাত্মক শোনাল; যেন সে বলত চাইছে, এবার তোমার নাটক শুরু করে দাও।
আন্দ্রু, এখনই! মুখ কালো করে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে হোট প্রিন্সেস বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু তাকে জড়িয়ে ধরতেই সে আর্তনাদ করে তার কাঁধের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
খুব সাবধানে কাঁধটাকে সরিয়ে নিয়ে সে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল, তারপর সযত্নে তাকে আরাম কেদারায় শুইয়ে দিল।
বিদায় মারি, প্রিন্স আন্দ্রু নরম গলায় বোনকে কথাটা বলে তার হাতটা ধরে চুমো খেল, তারপর দ্রুত পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হোট প্রিন্সেস আরামকেদারায় শুয়ে রইল, মাদময়জেল বুরিয়ে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। যে দরজা দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বেরিয়ে গেল, অপূর্ণ চোখে সে দিকে তাকিয়ে থেকেই প্রিন্সেস মারি ক্রুশচিহ্ন আঁকল। পড়ার ঘর থেকে বুড়ো মানুষটির রেগে নাক ঝাড়ার শব্দ আসতে লাগল পিস্তলের গুলির শব্দের মতো। প্রিন্স আন্দ্রু চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই পড়ার ঘরের দরজাটা খুলে গেল, বুড়ো লোকটির সাদা ড্রেসিং গাউন পরা শক্ত দেহটা দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল।
বলল, চলে গেছে? খুব ভালো হয়েছে! অচৈতন্য ছোট প্রিন্সেসের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভর্ৎসনার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, তারপরই সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
০২.১ ১৮০৫ সালের অক্টোবর মাস
দ্বিতীয় পর্ব – অধ্যায়-১
১৮০৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি রুশ বাহিনী অস্ট্রিয়ার একটি অঞ্চলের গ্রাম ও শহর দখল করে বসেছিল; আরো কয়েক রেজিমেন্ট সৈন্য সদ্য সদ্য রাশিয়া থেকে এসে ব্রাউনাট দুর্গের কাছে শিবির ফেলে স্থানীয় লোকজনদের ঘাড়ে চেপে বসছিল। ব্রাউনা প্রধান সেনাপতি কুতুজভের মূল ঘাঁটি।
১৮০৫ সালের ১১ অক্টোবর একটি পদাতিক রেজিমেন্ট সবেমাত্র ব্রাউমাউ পৌঁছে শহর থেকে আধা মাইল দূরে প্রধান সেনাপতির পরিদর্শনের জন্য অপেক্ষা করছিল। জায়গাটা এবং তার পরিবেশ-ফলের বাগান, পাথরের বেড়া, টালির ছাদ, দূরে দূরে পাহাড়ের সারি–সবকিছুই দেখতে অ-রুশীয়; যে সব স্থানীয় অধিবাসী। সকৌতুকে সৈন্যদের দেখছিল তারাও রুশীয় নয়; তবু রেজিমেন্টটিকে দেখতে রাশিয়ার অভ্যন্তরে পরিদর্শনের জন্য প্রতীক্ষারত যে কোনো রুশ রেজিমেন্টেরই মতো।
অভিযানের শেষ দিন সন্ধ্যায় হুকুম এসেছে, যাত্রাপথেই প্রধান সেনাপতি রেজিমেন্টটি পরিদর্শন করবেন। যদিও হুকুম-নামার কথাগুলি রেজিমেন্ট-কমান্ডারের কাছে খুব পরিষ্কার নয়, এবং সৈন্যরা অভিযানরত অবস্থায়ই থাকবে কিনা সে প্রশ্নও উঠেছিল, তবু বিভাগীয় সেনাপতিদের মধ্যে পরামর্শক্রমে স্থির হয়েছে, কিছুটা নিচু হয়ে অভিবাদন জানানোর চাইতে বেশি নিচু হয়ে অভিবাদন জানানোই ভালো-এই নীতি। অনুসরণ করে রেজিমেন্টকে অভিযানরত অবস্থায় উপস্থিত করাই শ্রেয়। কাজেই বিশ মাইল মার্চ করে আসার পরেও সৈন্যরা চোখের পাতা না বুজিয়ে সারারাত ধরে পোশাক-আশাক মেরামত ও পরিষ্কার করল, অ্যাডজুটান্ট ও কোম্পানি-কমান্ডাররা নানা রকম হিসেব-নিকাশ করল, এবং সকাল বেলা দেখা গেল, আগের দিন শেষ অভিযানের পরে রেজিমেন্টটি যে রকম বিপর্যস্ত ও বিশৃঙ্খল জনতায় পরিণত হয়েছিল তার পরিবর্তে দেখা দিয়েছে দু হাজার মানুষের একটি সুশৃঙ্খল সমাবেশ-তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন, প্রতিটি বোম ও প্রতিটি পেটি যথাস্থানে রক্ষিত হয়ে পরিচ্ছন্নতায় ঝকঝক করছে। সবকিছু যে বাইরে থেকেই দেখতে সুশৃঙখল তাও নয়, প্রধান সেনাপতি যদি ইউনিফর্মের ভিতরটাও পরীক্ষা করে দেখতে চায় তাহলে দেখতে পাবে, প্রতিটি লোকের গায়ে পরিষ্কার শার্ট, আর তাদের কাঁধের প্রতিটি ঝোলায় নির্দিষ্ট সংখ্যক সব জিনিস-সৈনিকদের ভাষায় যাকে বলে জুতো সেলাইয়ের কাঁটা, সাবান ও সব–মজুত আছে। কেবল একটা বিষয়ে সকলের মনেই অস্বস্তি রয়েছে। সেটা সৈন্যদের বুটের অবস্থা। অর্ধেকের বেশি সৈন্যের বুটে ফুটো হয়ে গেছে। কিন্তু এর কারণ রেজিমেন্ট-কমান্ডারদের কোনোরকম ত্রুটি নয়; বারবার জানানো সত্ত্বেও অস্ট্রিয় রসদ সরবরাহ বিভাগ বুট পাঠায় নি, আর রেজিমেন্টটি মার্চ করে এসেছে সাতশো মাইলের মতো।
