আরে না, কিন্তু ভাব তো, বুড়ি কাউন্টেস জুবোভার মাথায় নকল চুল, আর মুখভরা নকল দাঁত, যেন বুড়ো বয়সকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা…হা, হা, হা, মারি!
অন্য অনেকের সামনে স্ত্রীর মুখে কাউন্টেস জুবোভা সম্পর্কে এই একই কথা এবং এই একই হাসি প্রিন্স আন্দ্রু অন্তত পাঁচবার শুনেছে। ধীর পায়ে সে ঘরে ঢুকল। গোলগাল, গোলাপি ছোট প্রিন্সেস সেলাইটা হাতে নিয়ে একটা আরাম কেদারায় বসে অনর্গল বলে যাচ্ছে বহুবার বলা পিটার্সবুর্গের স্মৃতি-কথা। প্রিন্স আন্দ্রু কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে পথের ক্লান্তি কেটে গেছে কিনা জানতে চাইল। কথার জবাব দিয়ে ছোট প্রিন্সেস আবার কিচির-মিচির শুরু করে দিল।
ছয়-ঘোড়ার গাড়িটা ফটকে দাঁড়িয়ে আছে। হেমন্তের রাত এত অন্ধকার যে কোচয়ান গাড়ির দণ্ডটা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে না। লণ্ঠন হাতে চাকররা ছুটাছুটি করছে। মস্ত বড় বাড়িটার উঁচু জানালা দিয়ে আলো ঠিকরে পড়ছে। বাড়ির ভূমিদাসরা হল-ঘরে ভিড় করেছে। তরুণ প্রিন্সকে বিদায়সম্ভাষণ জানাতে অপেক্ষা করে আছে। বাড়ির লোকজনরা সব জমায়েত হয়েছে অভ্যর্থনা-ঘরে; মাইকেল আইভানভিচ, মাদময়জেল বুড়িয়ে, প্রিন্সেস। মারি ও ছোট প্রিন্সেস। প্রিন্স আন্দ্রুর ডাক পড়েছে তার বাবার পড়ার ঘরে, কারণ বাবা তাকে আলাদা করে বিদায় দিতে ইচ্ছুক। সকলেই তাদের দুজনের জন্য অপেক্ষা করছে।
প্রিন্স আন্দ্রু যখন পড়ার ঘরে ঢুকল বুড়ো মানুষটি তখন তার বুড়ো বয়সের চশমাজোড়া ও সাদা ড্রেসিং গাউন পরে লেখার টেবিলেও বসে ছিল। এ পোশাকে একমাত্র ছেলে ছাড়া আর কারো সঙ্গেই সে দেখা করে না। চারদিক তাকিয়ে শুধাল, যাচ্ছ? আবার লিখতে শুরু করল।
আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি।
এইখানে চুমো খাও, সে নিজের গালটা দেখাল : ধন্যবাদ, ধন্যবাদ!
ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন?
গয়ংগচ্ছ না করার জন্য, আর নারীর আঁচল ধরে ঝুলে না থাকার জন্য। সকলের আগে কর্তব্য। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ! আবার লিখতে শুরু করল; তার পাখের কলম খসখস করে চলতে লাগল। তোমার যদি কিছু বলার থাকে তো বলে ফেল। এ দুটো জিনিস এক সঙ্গে চলতে পারে, সে আরো বলল।
আমার স্ত্রীর ব্যাপারে…এভাবে তাকে আপনার হাতে রেখে যাচ্ছি বলে আমি লজ্জিত…
কেন বাজে বকছঃ কি চাও তাই বল।
তার প্রসবের সময় হলে তাকে মস্কোতে কোনো ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেবেন।…ততদিন সে এখানেই থাকবে…
বুড়ো প্রিন্স লেখা থামিয়ে কড়া চোখে এমনভাবে ছেলের দিকে তাকাল যেন তার কথাগুলি বুঝতে পারে নি।
কিছুটা বিচলিত হয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, প্রকৃতি তার কাজ না করলে কেউ কিছু করতে পারে না তা আমি জানি। আমি জানি যে লক্ষজনের মধ্যে মাত্র একজনের বেলায় গোলমাল হতে পারে, কিন্তু একটা ওরও ইচ্ছা, আমারও ইচ্ছা। সকলেই ওকে নানা কথা বলছে। ওরও একটা স্বপ্ন আছে, আর ভয়ও পাচ্ছে।
লেখা শেষ করে প্রিন্স বলল, হুম…হুম…। তাই করব।
সশব্দে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল; তারপর হঠাৎ ছেলের দিকে ঘুরে হাসতে লাগল।
খুব বাজে ব্যাপার, তাই না?
কি বাজে বাবা?
এই বৌ! সংক্ষেপে অর্থপূর্ণভাবে বুড়ো প্রিন্স বলল।
বুঝতে পারছি না! প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
তা বটে, কিছু করার নেই বাপু, প্রিন্স বলল। ওরা সবাই এক; বিয়ে তো আর ফেরৎ দেওয়া যায় না। ভয় পেয়ো না; কাউকে বলব না, কিন্তু তুমি নিজে তো বোঝ।
ছোট ঘোট গাড়-কঠিন আঙুল দিয়ে ছেলের হাতটা চেপে ধরে নাড়া দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে সোজা তার চোখের দিকে তাকাল, তারপর আবার সেই আড়ষ্ট হাসি হাসতে লাগল।
ছেলে নিঃশ্বাস ফেলল, যেন স্বীকার করল যে বাবা তাকে ঠিকই বুঝেছে। বুড়ো চিঠিটা ভাঁজ করে সিল করতে লাগল; অভ্যস্ত দ্রুততার সঙ্গে মোম, সিল ও কাগজকে একবার তুলতে লাগল, একবার নামাতে লাগল।
চিঠিটা সিল করতে করতেই কাটা-কাটা ভাবে বলল, কি করতে হবে? সে তো ছেলেমানুষ! সবকিছু আমিই করব। কোনো চিন্তা করো না।
আন্দ্রু কোনো কথা বলল না, বাবা যে তার কথা বুঝতে পেরেছে তাতে সে খুশি হয়েছে, আবার অখুশিও বটে। বুড়ো মানুষটি উঠে দাঁড়িয়ে চিঠিটা ছেলের হাতে দিল।
বলল, শোনো! তোমার স্ত্রীর জন্য চিন্তা করো না; সাধ্যমতো সবই করা হবে। এখন শোন! এই চিঠিটা মাইকেল ইলারিয়নভিচকে (কুতুজভ) দিও। তাকে লিখে দিলাম, সে যেন তোমাকে যথাযথ স্থানে বসিয়ে কাজে লাগায়, দীর্ঘকাল অ্যাডজুটান্ট করে না রাখে : সেটা খুব বাজে চাকরি! তাকে বলল, তার কথা আমার মনে আছে; তাকে আমি পছন্দ করি। সে তোমাকে কীভাবে গ্রহণ করে সেটা আমাকে লিখে জানিও। যদি ভালো ব্যবহার করে কাজ করো।
নিকলাস বলকনস্তির ছেলেকে কারো অপ্রীতিভাজন হয়ে তার কাছে চাকরি করতে হবে না। এবার এদিকে এসো।
সে এত তাড়াতাড়ি কথা বলছিল যে অর্ধেক কথাই শেষ হচ্ছিল না, কিন্তু ছেলে তার মুখে এ ধরনের কথা শুনে তা বুঝতে অভ্যস্ত। বুড়ো ছেলেকে ডেস্কের কাছে নিয়ে গেল, ডালাটা তুলল, একটা দেরাজ টেনে বের করল, এবং মোটা মোটা, বড় বড় ঘন হাতের লেখায় ভরা একখানা খাতা তুলে নিল।
আমি হয়তো তোমার আগেই মারা যাব। কাজেই মনে রেখো যে এগুলি আমার স্মৃতিকথা, আমার মৃত্যুর পরে এগুলি সম্রাটের হাতে দিও। আর এই একখানা লোম্বার্ড-বন্ড কোম্পানির কাগজ) ও একটা চিঠি, সুভরভদের যুদ্ধের ইতিহাস যে লিখবে এই সম্মানদক্ষিণাটা তারই প্রাপ্য হবে। এটাকে অ্যাকাডেমিতে পাঠিয়ে দিও। আর এতে কিছু টুকরো-টুকরো লেখা রইল, আমি মরে যাবার পরে তুমি পড়ো। সেগুলো তোমার কাজে লাগবে।
