ভীরু চোখ তুলে সে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
যেন ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই প্রিন্স আন্দ্রু বলল, যদি কষ্টকর ব্যাপারও হত…
তুমি যা খুশি ভাবতে পার!…আমি জানি, তুমিও ঠিক বাবার মতো। যা খুশি ভাব, তবু আমার জন্য অন্তত এই কাজটি কর। দয়া করে কর! বাবার বাবা, আমাদের ঠাকুর্দা, সব যুদ্ধে এটা পরতেন। (থলের ভিতরকার জিনিসটি সে এখনো বের করল না।) তাহলে কথা দিলে?
নিশ্চয়। এটা কি?
আন্দ্রু, এই দেবমূর্তি দিয়ে আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, কিন্তু আমার কাছে তোমাকে কথা দিতে হবে যে কখনো এটা খুলে রাখবে না। কথা দিলে?
ওটার ওজন যদি এক হর না হয়, ওটার ভারে যদি আমার ঘাড় না ভাঙে…তো তোমাকে খুশি করতে… প্রিন্স আন্দ্রু বলল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার ঠাট্টা ফলে বোনের মুখে বেদনার যে ছায়া ফুটে উঠেছে সেটা দেখতে পেয়ে তার অনুশোচনা হল; সে বলে উঠল, আমি খুব খুশি হয়েছি; সত্যি সোনা, খুব খুশি হয়েছি।
তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন, তোমাকে করুণা করবেন, নিজের কাছে টেনে নেবে, কারণ সত্য ও শান্তি একমাত্র তাঁর মধ্যেই অবস্থান করে, আবেগ-কম্পিত স্বরে প্রিন্সেস মারি কথাগুলি বলল; সুন্দর একটি রুপোর হারের উপর সোনার কাজ-করা ছোট, ডিম্বাকৃতি, অত্যন্ত প্রাচীন একটি ত্রাণকর্তার কালো দেবমূর্তি গম্ভীরভাবে দুই হাতে তুলে ধরল ভাইয়ের সামনে।
কুশ-চিহ্ন এঁকে, দেবমূর্তিটিকে চুমো খেয়ে সে ভাইয়ের হাতে সেটাকে তুলে দিল।
দোহাই আন্দু, আমার জন্যে!…
তার দুটি বড় বড় ভীরু চোখ থেকে শান্ত আলোর রশ্মি বিচ্ছুরিত হতে লাগল। সে আলোয় তার রুগ্ন। পাতলা মুখখানি উদ্ভাসিত হয়ে সুন্দর হয়ে উঠল। ভাই দেবমূর্তিটা পরতে গেল, কিন্তু বোন তাকে থামিয়ে দিল। আন্দ্রু বুঝতে পারল, ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল, দেবমূর্তিকে চুমো খেল। সেও তখন অভিভূত হয়েছে; তার চোখে মমতার আভা, কিন্তু সেই সঙ্গে তার মুখে দেখা দিল ব্যঙ্গের ঝলকানি।
ধন্যবাদ, লক্ষ্মী ভাই। ভাইয়ের কপালে চুমো খেয়ে প্রিন্সেস মারি আবার গিয়ে সোফায় বসল। কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ।
আগেই বলেছি আন্দ্রু, তুমি যেমন দয়ালু ও উদার ছিলে তেমনি থেকো। লিজার প্রতি কঠোর হয়ো না, প্রিন্সেস মারি বলতে শুরু করল। সে খুব ভালো, আর এখানে তার অবস্থা বড় সঙ্গীন।
আমার স্ত্রী সম্পর্কে তোমার কাছে কোনো নালিশ করেছি, বা তাকে দোষ দিয়েছি বলে মনে পড়ে না মাশা (মারির সংক্ষিপ্ত রূপ)। তাহলে এ সব কথা আমাকে বলছ কেন?
প্রিন্সেস মারির গালে লালের ছোপ লাগল; অপরাধীর মতো সে চুপ করে রইল।
আমি তোমাকে কিছুই বলি নি, কিন্তু তুমি অনেক কথাই শুনেছ। সে জন্য আমি দুঃখিত।
প্রিন্সেস মারির কপালে, ঘাড়ে ও গালে লালের ছোপ গাঢ়তর হল। সে কি যেন বলতে চাইল, কিন্তু বলতে পারল না। তার ভাই ঠিকই অনুমান করেছে; ছোট প্রিন্সেস ডিনারের পরে কেঁদেছে, আসন্ন প্রসবের ব্যাপারে তার মনে যে ভয় ঢুকেছে তা বলেছে, নিজের ভাগ্য, শ্বশুর ও স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বোনের জন্য প্রিন্স আন্দ্রু দুঃখ বোধ করল।
একটা কথা জেনে রাখ মাশা : কোনো ব্যাপারেই আমার স্ত্রীকে আমি বকতে পারি না, কখনো বকি নি, ভবিষ্যতেও বকব না; তার সম্পর্কিত কোনো ব্যাপার নিয়ে নিজেকেও আমি দোষ করতে পারি না; যে অবস্থায়ই আমি থাকি না কেন, এই রকমই চলতে থাকবে। কিন্তু তুমি যদি আসল সত্য জানতে চাও…যদি জানতে চাও আমি কি সুখী? না! সে কী সুখী? না! কিন্তু কেন নয় তা আমি জানি না…।
বলতে বলতে ভাই উঠে বোনের কাছে গেল, নিচু হয়ে তার কপালে চুমো খেল। একটা চিন্তাক্লিষ্ট অনভ্যস্ত উজ্জ্বলতায় তার চোখ দুটি জ্বলজ্বল করতে লাগল; কিন্তু তখন তার দৃষ্টি বোনের দিকে ছিল না, ছিল খোলা দরজার পথে বাইরের অন্ধকারের দিকে।
চল, ওর কাছে যাই। আমাকে তো বিদায় নিতেই হবে। অথবা–তুমি গিয়ে ওর ঘুম ভাঙাও, আমি একটু পরেই যাচ্ছি। পেশকা! সে খানসামাকে ডাকল : এদিকে এস। এগুলি নিয়ে যাও। এগুলিকে আসনের উপর রাখ, আর এগুলি ডানদিকে।
প্রিন্সেস মারি উঠে দরজার দিকে পা বাড়াল; তারপর থেমে বলল :
আন্দ্রু, তোমার যদি বিশ্বাস থাকত তাহলে সেই ভালোবাসা তুমি ঈশ্বরের কাছে চাইতে পারতে যা তোমার নেই, আর তোমার সে প্রার্থনা পূর্ণ হত।
কি জানি, হতে পারে! প্রিন্স আন্দ্রু বলল। তুমি যাও মাশা; আমি এখনি আসছি।
বোনের ঘরের দিকে যাবার পথেই মাদময়জেল বুরিয়ের সঙ্গে প্রিন্স আর দেখা হলে গেল। তার মুখে মিষ্টি হাসি। একই দিনে এই তৃতীয়বার নির্জন বারান্দায় মুখে সরল বিমুগ্ধ হাসি নিয়ে সে প্রিন্স আর সম্মুখীন হল।
যে কারণেই হোক মুখ লাল করে চোখ নামিয়ে সে বলল, ওহো, আমি ভেবেছিলাম আপনি আপনার ঘরেই আছেন।
প্রিন্স আন্দ্রু কঠোর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। মুখে ফুটে উঠল ক্রোধের আভাস। কোনো কথা না বলে মেয়েটির চোখের বদলে সে তার কপাল ও চুলের দিকে এমন ঘৃণাভরে তাকাল যে ফরাসিনী মুখ লাল করে কোনো কথা না বলেই সেখান থেকে চলে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু বোনের ঘরে পৌঁছে খোলা দরজা দিয়ে শুনতে পেল, তার স্ত্রী ইতিমধ্যেই উঠে খুশি মনে অনর্গল কথা বলে চলেছে। যথারীতি ফরাসিতেই সে কথা বলছে; মনে হল, দীর্ঘ সংযমের পরে সে বোধহয় হারানো সময়টুকুর ক্ষতিপূরণ করতে চাইছে।
