শুধু একটু হেসে বোনের কথার জবাব দিয়ে প্রিন্স আল্লু জিজ্ঞাসা করল, আর লিজা কোথায়?
সে এতই ক্লান্ত যে আমার ঘরে সোফার উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ওঃ আন্দ্রু! কী সোনা বউই তুমি পেয়েছ, একটা সোফায় বসে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সে বলল। ও তো একেবারে ছেলেমানুষ; কী মিষ্টি, হাসি-খুশি মেয়ে। ওকে আমার খুব ভালো লেগেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু চুপ করে রইল; কিন্তু ব্যঙ্গ ও ঘৃণার যে চিহ্ন তার মুখে ফুটে উঠল সেটা প্রিন্সেসের নজর এড়াল না।
ছোটখাট দোষ-ক্রটিকে মেনে নিতেই হবে; সেটুকু ত্রুটি কার নেই আন্দ্রু? ভুলে যেয়ো না যে সে একটা উঁচু সমাজে বড় হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে; এখানে তার অবস্থা তো খুব সুখকর না হবারই কথা। প্রত্যেকের অবস্থাই তো আমাদের বোঝা দরকার। Tout compendre, cest tout pardonner, (সকলের অবস্থাটা বুঝতে পারলে সকলকেই ক্ষমা করা যায়।) বেচারির কথাটা একবার ভাব! এতদিনের অভ্যস্ত জীবনকে ছেড়ে, স্বামীকে ছেড়ে, এই অবস্থায় তাকে একাকি একটা গ্রামে থাকতে হবে! এটা খুবই শক্ত।
যারা নিজেদের সবজান্তা ভাবে তাদের দেখে আমরা যে ভাবে হাসি, বোনের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আও সেইভাবে হাসল।
বলল, তুমিও তো গ্রামে থাক; তোমরা তো জীবনকে ভয়ংকর ভাব না।
আমি…আমার কথা আলাদা। আমরা কথা কেন বলছ? আর কোনো জীবন আমি চাই না, চাইতে পারি না, কারণ আর কোনো জীবন আমি জানি না। কিন্তু আন্দ্রু, ভেবে দেখ তো, অভিজাত সমাজের একটি তরুণী তার জীবনের সেরা দিনগুলি একাকি কাটাবে এই গ্রামের মাটিতে মাথা গুঁজে-বাপি তো সব সময়ই ব্যস্ত, আর আমি…তুমি তো জান, অভিজাত সমাজে চলতে অভ্যস্ত একটি মেয়ের মনোরঞ্জন করবার মতো কোনো বিদ্যাই আমার নেই। আর আছে শুধু মাদময়জেল বুরিয়ে… ।
তোমাদের ওই মাদময়জেল বুরিয়েঁকে আমি মোটেই পছন্দ করি না, প্রিন্স আ বলল।
কর না? সে তো খুব ভালো, দয়ালু; তাছাড়া সেও তো করুণার পাত্র। তার তো কেউ কোথাও নেই–কেউ না। সত্যি কথা বলতে কি তাকে আমার কোনো দরকারই নেই; বরং সে আমার পথের বাধা। তুমি তো জান, চিরকালই আমি একটু বুনোম এখন তো আরো বুনো হয়ে গেছি। একলা থাকতেই আমি ভালোবাসি।…বাবা ওকে খুব ভালোবাসেন। সে আর মাইকেল আইভানভিচ–এই দুজনের প্রতিই বাবা খুব সদয় ও সন্তুষ্ট, কারণ তিনি দুজনেরই আশ্রয়দাতা। স্টার্ন বলেছেন : মানুষ আমাদের কি উপকার করেছে তার জন্য আমরা তাকে তত ভালোবাসি না যত ভালোবাসি আমরা তাদের কি উপকার করেছি সেই জন্য। বাবাকে হারিয়ে ও যখন গৃহহারা হয়ে পড়েছিল তখনই বাবা ওকে নিয়ে আসেন। ওর স্বভাবটা খুব ভালো; ওর বই পড়ার ধরন বাবার খুব পছন্দ। সন্ধ্যাবেলা ও বাবাকে পড়ে শোনায়; খুব সুন্দর পড়ে।
খোলাখুলি বলতে কি মারি, বাবার চরিত্র অনেক সময় তোমাকে খুব বিপদে ফেলে দেয়, তাই না? প্রিন্স আন্দ্রু হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল।
এ প্রশ্ন প্রিন্সেস মারি প্রথমে অবাক হয়ে গেল; পরে ভীষণ ভয় পেল।
আমাকে? আমাকে?…আমাকে বিপদে ফেলেন?… সে বলল।
তিনি চিরকালই কিছুটা কঠোর; কিন্তু আমার তো ধারণা এখন তিনি খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন, প্রিন্স আন্দু বলল। বোনকে বোকা বানাতে, বা তাকে পরখ করে দেখতেই সে বাবার সম্পর্কে এ ধরনের লঘু উক্তি করল।
আলোচনার প্রসঙ্গে না গিয়ে নিজের চিন্তাকে অনুসরণ করেই প্রিন্সেস বলল, তুমি সব দিক থেকেই ভালো আন্দ্রু, কিন্তু তোমার মনে একটা বুদ্ধির অহংকার আছে, আর সেটা একটা বড় পাপ। কেউ কি বাবাকে বিচার করতে পারে? আর যদি পারেও, তবু তো আমার বাবার মতো লোকের প্রতি শ্রদ্ধা ভিন্ন অন্য কোনো অনুভূতি জাগতে পারে কী? তাকে নিয়ে আমি কত সন্তুষ্ট, কত সুখী। তুমিও আমার মতোই সুখী হও, এটাই তো আমার একমাত্র কামনা।
তার ভাই অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
একটি মাত্র কাজ আমার পক্ষে শক্ত।…তোমাকে সত্যি কথাই বলব আন্দ্রু,সেটা হলো ধর্মবিষয়ে বাবার আচরণ। যে জিনিস দিনের আলোর মতো পরিষ্কার তা কেমন করে বাবার মতো প্রচণ্ড বুদ্ধির অধিকারী মানুষের চোখে পড়ে না, কেমন করে তিনি বিপথে চলে যান আমি তো বুঝতেই পারি না। ঐ একটি মাত্র ব্যাপারে আমি অসুখী। কিন্তু এ ব্যাপারেও আমি আজকাল কিছুটা উন্নতি দেখতে পাচ্ছি। ইদানীং তার ব্যঙ্গ বিদ্রুপের তীক্ষ্ণতা অনেক কমে গেছে। একজন সন্ন্যাসীকে তিনি বাড়িতে ডেকে এনেছিলেন; তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন।
হায়! সোনা, আমার ভয় হচ্ছে তুমি আর তোমার ঐ সন্ন্যাসীর সব চেষ্টাই মাঠে মারা যাচ্ছে, মমতামাখা ঠাট্টার সুরে প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে প্রিন্সেস মারি বলল, ওঃ! আমাদের ভাইটি, আমার শুধু একটিই প্রার্থনা, একটিই আশা যে ঈশ্বর আমার কথা শুনবেন। আন্দ্রু, তোমার কাছে আমি একটা জিনিস চাই।
সেটা কি?
না–কথা দাও তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না! তাতে তোমার কোনো কষ্ট হবে না, সেটা তোমার অযোগ্যও নয়, কিন্তু আমার পক্ষে অনেক সান্ত্বনার। কথা দাও আশা!… থলের মধ্যে হাত ঢুকিয়েও তার মধ্যে কি আছে সেটা বের না করে প্রিন্সেস মারি বলল; বোঝা গেল, থলির ভিতরকার জিনিসটিই তার অনুরোধের বস্তু, কিন্তু অনুরোধ মঞ্জুর হবার আগে সেটা সে বের করবে না।
