প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আমি বলছি না যে আমাদের সব পরিকল্পনাই ভালো, তবে বোনাপার্ট সম্পর্কে আপনার মতামত আমাকে অবাক করেছে। আপনি যত খুশি হাসতে পারেন, কিন্তু তা হলেও বোনাপার্ত একজন জাদরেল সেনাপতি!
স্থপতি লোকটি এতক্ষণ মাংসের রোস্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিল; আশা করেছিল যে তার কথা সকলে ভুলেই গেছে। কিন্তু বুড়ো প্রিন্স এবার হাঁক দিল, মাইকেল আইভানভিচ! আমি তোমাকে বলি নি যে বোনাপার্ত একজন মস্ত বড় রণকুশলী? দেখ, ইনিও সেই একই কথা বলছেন।
সে তো ঠিকই ইয়োর এক্সেলেন্সি স্থপতি জবাব দিল।
প্রিন্স আর একবার হো-হো করে হেসে উঠল।
মুখে রুপোর চামচে নিয়েই বোনাপার্ত জন্মেছিল। চমঙ্কার সব সৈন্য সে হাতে পেয়েছে। তাছাড়া, জার্মানদের দিয়েই তার আক্রমণে হাতেখড়ি। আর একমাত্র আলসেরাই জার্মানদের হারাতে পারে না। জগতের শুরু থেকে সকলেই তো জার্মানদের পিটিয়েছে। তারা কিন্তু নিজেদের ছাড়া আর কাউকে পেটাতে পারে না। তাদের সঙ্গে লড়াই করেই তো বোনাপার্তের যত নাম।
তারপরেই তার মতে বোনাপার্ত নানা অভিযানে, এমন কি রাজনীতিতেও যে সব মস্ত ভুল করেছে প্রিন্স সেগুলি সব ব্যাখ্যা করতে শুরু করল। ছেলে কোনো প্রত্যুত্তর করল না, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল যে যত যুক্তিই দেখানো হোক বাবার মতোই সেও নিজের মতো সহজ বদলাতে পারে না। কোনো রকম জবাব না দিয়ে সে চুপচাপ শুনতে লাগল, এত বছর ধরে একাকি গ্রামে বাস করেও এই মানুষটি কেমন করে যে সাম্প্রতিক ইওরোপের সব সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনার খবর রাখে এবং তা নিয়ে এত সূক্ষ্ম ও তীব্র সমালোচনা করতে পারে সে কথা ভেবে তার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
তোমরা ভাব যে আমি বুড়ো মানুষ, বর্তমানের কোনো খোঁজ-খবরই রাখি না, এই বলে বাবা কথা শেষ করল। কিন্তু এ সবকিছুই আমাকে বিব্রত করে। রাতে আমি ঘুমতে পারি না। এখন বল, তোমাদের এই আঁদরেল সেনাপতির আসল কেরামতিটা কোথায়? সে কথা শেষ করল।
সে কথা বলতে অনেক সময় লাগবে, ছেলে জবাব দিল।
ঠিক আছে, তোমার বোনাপার্তকে নিয়েই থাকগে। মাদময়জেল বুরিয়ে, তোমাদের পাউডার-মাখা বাদর ম্রাটের এই আর একজন স্তাবক! চমৎকার ফরাসিতে প্রিন্স জোর গলায় বলল।
আপনি তো জানেন প্রিন্স, আমি বোনাপার্তের সমর্থক নই।
প্রিন্স গুনগুন করে একটা বেসুরো গান গেয়ে ততোধিক বেতালা হাসি হেসে টেবল ছেড়ে উঠে গেল।
আলোচনার সময়ে এবং ডিনারের বাকি সময়টাকেও ছোট প্রিন্সেস চুপচাপ বসে থেকে ভীত দৃষ্টিতে একবার শ্বশুরের দিকে ও একবার প্রিন্সেস মারির দিকে তাকাতে লাগল। সকলে টেবিল থেকে উঠে গেলে সে ননদের হাতটা ধরে তাকে টেনে নিয়ে আর একটা ঘরে চলে গেল।
বলল, তোমার বাবার কত বুদ্ধি; হয়তো সেই জন্যই তাকে আমার এত ভয়।
আঃ, বাবা খুব ভালো মানুষ! প্রিন্সেস মারি জবাব দিল।
*
অধ্যায়-২৮
পরদিন সন্ধ্যায় প্রিন্স আন্দ্রুর চলে যাবার কথা। দৈনন্দিন কর্মসূচীর কোনো রকম পরিবর্তন না করে বুড়ো প্রিন্স ডিনারের পরে যথারীতি শুতে চলে গেল। ছোট প্রিন্সেস ননদের ঘরে। স্কন্ধত্ৰাণবিহীন ট্রাভেলিং-কোট গায়ে প্রিন্স আন্দ্রু খানসামাকে নিয়ে তার জন্য নির্দিষ্ট ঘরে জিনিসপত্র প্যাক করছে। নিজে গাড়িটা পরীক্ষা করে তাকে ট্রাংকগুলি তুলি দিয়ে ঘোড়াগুলো জুততে বলল। শুধু নিজের সঙ্গে রাখার জিনিসগুলোই ঘরের মধ্যে পড়ে আছে : একটা ছোট বাক্স, রুপোর প্লেটসহ একটা বড় খাবারের বাক্স, দুটো তুর্কি পিস্তল ও একখানি তরোয়াল-ওচাকভ অবরোধের সময় তার বাবা এটা এনেছিল; পরে ছেলেকে উপহার দিয়েছে। প্রিন্স আন্দ্রুর এইসব ভ্রমণ-সঙ্গী জিনিসপত্রই বেশ সাজানো গোছানো; নতুন, পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে ফিতে দিয়ে বাঁধা।
কোথাও যাত্রা করবার আগে অথবা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ঘটাবার সময় চিন্তাশীল লোকরা সাধারণত বেশ গম্ভীর হয়ে যায়। সেই সময় তারা অতীতের পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে। প্রিন্স আন্দ্রুর মুখটাও খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। হাত দুটি পিছনে রেখে সে ঘরের এক কোণ থেকে আর এক কোণ দ্রুত হাঁটছে, আর সোজা সামনের দিকে তাড়িয়ে চিন্তিতভাবে মাথাটা নাড়ছে। তার কি যুদ্ধে যেতে ভয় করছে? নাকি স্ত্রীকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। হয়তো দুটোই, কিন্তু সে চায় না যে এক অবস্থায় কেউ তাকে দেখে ফেলে; তাই বাইরে পায়ের শব্দ শুনেই সে তাড়াতাড়ি পিছনের হাত খুলে সামনে এনে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, যেন হোট বাক্সের ঢাকনিটা বাঁধছে। তারপরই তার স্বাভাবিক ও দুর্ভেদ্য মুখের ভাব ফিরিয়ে আনল। প্রিন্সেস মারির ভারি পায়ের শব্দই সে শুনতে পেয়েছিল।
প্রিন্সেস মারি হাঁপাতে হাঁপাতে (সে নিশ্চয় গৌড়ে এসেছে) চেঁচিয়ে বলল, তুমি নাকি ঘোড়াকে সাজ পরাতে বলেছ? অথচ আমি যে তোমার সঙ্গে একান্তে কত কথা বলতে চেয়েছিলাম! ঈশ্বর জানেন আবার কতদিন আমরা দূরে দূরে থাকব। আমি এসেছি বলে তুমি রাগ কর নি তো? তুমি কত বদলে গেছ আশা,
যেন প্রশ্নটার ব্যাখ্যা হিসেবেই সে কথাটা যোগ করল।
প্রিন্সের প্রিয় নাম আশা বলে ডেকেই মারি হেসে ফেলল। এই রুক্ষ সুদর্শন মানুষটি যে তার ছোটবেলার খেলার সাথী সেই ছোট্ট দুষ্ট ছেলে আশা হতে পারে সে কথা ভাবতেই সে অবাক হয়ে গেল।
