প্রিন্স আন্দ্রু বলল, প্রত্যেক লোকেরই দুর্যোধনের উরু (Achilles heel) থাকে। ভাব তো, এত বড় মন নিয়ে তিনি এই বাজে ছবিটা আঁকিয়েছেন।
ভাইয়ের সমালোচনার এই নির্ভীকতা প্রিন্সেস মারি বুঝতে পারল না; একটা জবাব দিতে যাবে এমন সময় পড়ার ঘর থেকে প্রত্যাশিত পদশব্দ ভেসে এল। যেন এ বাড়ির কঠোর নিয়মের সঙ্গে তুলনায় নিজের আচরণের ক্ষিপ্রতাকে স্পষ্ট করে তুলবার জন্য ইচ্ছা করেই প্রিন্স তার স্বভাবমতো বেশ ফুর্তির সঙ্গে দ্রুত পা ফেলে ঘরে ঢুকল। ঠিক সেই মুহূর্তে বড় ঘড়িটাকে দুটোর ঘণ্টা বাজল, আর বসার ঘর থেকে আর একটি ঘড়ির কর্কশ শব্দ তার সঙ্গে যুক্ত হলো। প্রিন্স স্থির হয়ে দাঁড়াল; ঘন ভুরুর নিচ থেকে দুটি জীবন্ত ঝকঝকে চোখ কঠোর দৃষ্টিতে উপস্থিত সকলকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে ছোট প্রিন্সেসের উপর গিয়ে স্থির হল। যার ঘরে ঢুকলে সভাসদগণের যেমন হয়, বৃদ্ধ লোকটিকে দেখে ছোট প্রিন্সেসের মনেও সেই রকম ভয় ও শ্রদ্ধার অনুভূতি জাগল। প্রিন্স তার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে অদ্ভুতভাবে তার গলার পিছনে আস্তে আস্তে চাপড় মারতে লাগল।
একাগ্র দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স বলল, তোমাকে দেখে আমি খুশি হয়েছি, খুব খুশি, তারপর নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। বস, বস! মাইকেল আইভানভিচ, তুমিও বস!
সে পুত্রবধূকে নিজের পাশেই একটা জায়গা দেখিয়ে দিল। পরিচারক তার জন্য একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
তার গোলগাল চেহারার উপর চোখ বুলিয়ে বুড়ো লোকটি বলল, হো-হে! তুমি বড় বেশি তাড়াহুড়ো করছ। এটা ভালো নয়!
শুধু ঠোঁট নেড়ে প্রিন্স তার স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষ কাষ্ঠ হাসিটি হাসল; চোখে সে হাসি প্রতিফলিত হল না।
শুধু বলল, তুমি হাঁটবে, যতটা পার হাঁটবে, যতটা পার।
ছোট প্রিন্সেসের কানে কথাটা গেল না; ইচ্ছা করেই কানে নিল না। চুপ করে রইল; তাকে একটু বিচলিত মনে হল। প্রিন্স তার বাবার কথা জানতে চাইলে ছোট প্রিন্সেসের মুখে হাসি ফুটল; সে কথা বলতে শুরু করল। প্রিন্স পরিচিত লোকজনদের কথা জানতে চাইলে ছোট প্রিন্সেস আরো চাঙ্গা হয়ে উঠল, নানা লোকের অভিনন্দন-বাণী তাকে শোনাতে লাগল, শহরের গল্পগুজবের বিস্তারিত বর্ণনা দিল।
বেচারি কাউন্টেস আপ্রাকসিনা তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন; কেঁদে কেঁদে তার চোখ দুটি গেছে। পুত্রবধূটির গলা ক্রমেই ঝরঝরে হয়ে উঠল।
প্রিন্সের দৃষ্টিও ক্রমেই কঠোরতর হতে লাগল; তারপরই যেন পুত্রবধূটিকে যথেষ্ট দেখা হয়েছে, তার সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণাও হয়ে গেছে, এমনিভাবে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে সে মাইকেল আইভানভিচের দিকে মুখ ঘোরাল।
দেখ মাইকেল আইভানভিচ, আমাদের বোনাপার্তের অবস্থা কিন্তু কাহিল। তার বিরুদ্ধে কতভাবে যে সৈন্যসমাবেশ করা হচ্ছে সে কথা প্রিন্স আই (ছেলেকে সে এইভাবে ডাকে) আমাকে বলছিল! অথচ তুমি আর আমি তাকে মোটেই পাত্তা দেই নি।
তুমি আর আমি-কখন যে বোনাপার্ত সম্পর্কে এ সব কথা বলেছে সে কথা কিন্তু মাইকেল আইভানভিচ । মোটেই জানে না। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারল যে তাকে সাক্ষীগোপাল খাড়া করে প্রিন্স তার মনের মতো বিষয়বস্তুটির আলোচনা শুরু করতে চাইছে, তখন সে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে যুবক প্রিন্সের দিকে তাকাল। এরপর কি হবে তা কে জানে।
স্থপতিকে দেখিয়ে প্রিন্স ছেলেকে বলল, ইনি একজন খুব বড় দরের রণনীতিবিদ!
আবার শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ, বোনাপার্ত, সেনাপতি ও কুটনীতিকদের নিয়ে আলোচনা। বুড়ো প্রিন্সের তো বদ্ধমূল ধারণা যে আজকালকার লোকজনরা সব কচি খোকা, যুদ্ধ বা রাজনীতির অ-আ-ক-খ-ও তারা জানে না, আর ঐ বোনাপার্ত তো একটা বখাটে ফরাসি ছোকরা মাত্র, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো কোনো পটেমকিন অথবা সুভরভ নেই বলেই তার এত জয়-জয়কার। তাছাড়া, তার আরো ধারণা ইওরোপে কোনো সত্যিকারের রাজনৈতিক সংকট নেই, কোনো সত্যিকারের যুদ্ধ নেই, যা আছে সেটা একধরনের পুতুল খেলা, সেই খেলা খেলতে বসেই আজকের লোকরা এমন ভান করছে যেন সত্যিকারের যুদ্ধই করছে। নতুন যুগের মানুষদের নিয়ে বাবার এই বিদ্রূপকে প্রিন্স আন্দ্রু খুশি মনেই সহ্য করে গেল, মন দিয়ে শুনল।
বলল, অতীত চিরদিনই মধুর, কিন্তু স্বয়ং সুলভও কি মরো-র পাতা ফাঁদে পড়েননি? এবং সে ফাঁদ থেকে বের হবার পথটা পর্যন্ত খুঁজে পাননি?
প্রিন্স চেঁচিয়ে বলে উঠল, এ কথা তোমাকে কে বলেছে? কে? সুভরভ! বলেই সে খাবার প্লেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল, আর তিখন সঙ্গে সঙ্গে সেটা ধরে ফেলল। সুভরভ!…ভেবে দেখ প্রিন্স আন্দ্রু! দুই…ফ্রেডেরিক ও সুভরভ; মরো! সুভরভ যদি নিজের ইচ্ছামতো চলতে পারত তাহলে মরোকেই বন্দি হতে হত; কিন্তু তার হাত বাধা ছিল অস্ট্রিয় যুদ্ধ পরিষদের কাছে যাদের মাথায় ছিল শুধু তরকারির ঝোল। তাদের পাল্লায় পড়লে শয়তানেরও ধাঁধা লাগে। সেখানে গেলেই বুঝতে পারবে অস্ট্রিয় যুদ্ধ পরিষদটি কী চিজ! সুভরভই তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না, তো মাইকেল কুতুজভ কোন ছাড়! না হে বাপু, তুমি ও তোমার সেনাপতিরা বোনাপার্তের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না; তোমাদের ডেকে আনতে হবে ফরাসিদের, যাতে চোরে চোরে লড়াই লেগে যায়। ফরাসি মরোকে ডেকে আনবার জন্য জার্মান পাহলেন (পিটার্সবুর্গের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল পি. এ. পাহলেন)-কে পাঠানো হয়েছে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। সে বছর রাশিয়ায় চাকরি নেবার জন্য যে মরোকে ডাকা হয়েছিল প্রিন্স সেই ঘটনাকেই উল্লেক করল।…চমৎকার! পোটেমকিন, সুভরভ ও অরলভরা কি জার্মান ছিল? না হে বাপু, হয় তোমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে, আর না হয়তো আমাকেই বাহাত্তরে ধরেছে। ঈশ্বর তোমাদের সহায় হোন, কিন্তু আমরা সবকিছুই দেখে যাব। বোনাপার্ত তো মস্ত বড় সেনাপতি সেজেছে! হুম!…
