নিকলাসের ঘরের ভিতর দিয়েই কাউন্টেসের ঘরে যাবার কথা, নিকলাসের সঙ্গেই তার প্রথম দেখা হল। প্রিন্সেস মারি আশা করেছিল নিকলাস তাকে সাদরেই গ্রহণ করবে, কিন্তু তার পরিবর্তে প্রথম দৃষ্টিতেই তার চোখে এমন একটা নিরাসক্ত, কঠিন ও গর্বিত ভাব দেখতে পেল যা আগে কখনো দেখেনি। নিকলাস তার স্বাস্থ্যের কথা জানতে চাইল, মার ঘরে নিয়ে গেল, সেখানে পাচঁ মিনেট বসেই ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।
প্রিন্সেস কাইন্টেসের ঘর থেকে বেড়িয়ে এলে নিকলাস আবার তার সঙ্গে দেখা করল, গম্ভীর, কঠিন মুখে তাকে নিয়ে বাইরের ঘরে গেল। মার স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে কোনো জবাবই দিল না। তার চোখ-মুখ দেখে মনে হল যেন বলতে চায় : তাতে তোমার কি দরকার? আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও।
প্রিন্সেসের গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে যাবার পরে সোনিয়াকে সামনে পেয়ে নিকলাস সোচ্চার বলে উঠল, কেন সে এখানে ঘুর ঘুর করতে আসে? কি চায় সে? এই সব মহিলা ও তাদের ভদ্রতাকে আমি সইতে পারি না।
নিজের খুশিকে চেপে রাখতে না পেরে সোনিয়া বলে উঠল, আঃ নিকলাস, এসব কথা তুমি বলতে পাররে কেমন করে? ও এত ভালো, আর মামণি ওকে এত ভালোবাসে!
নিকলাস জবাব দিল না, যেন প্রিন্সেসের কথা মুখেই আনতে চায় না। বুড়ি কাউন্টেস কিন্তু সেই থেকে প্রতিদিনই বেশ কয়েকবার প্রিন্সেস মারির কথা বলে।
কাউন্টেস তার গুনকীর্তন করে, ছেলেকে তার সঙ্গে দেখা করতে পীড়াপীড়ি করে, নিজে প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু নিকলাস সারাক্ষণ চুপ করেই থাকে। তাতে কাউন্টেস আরো বিরক্ত হয়ে ওঠে।
বলে, মেয়েটি বড় ভালো, খাসা মেয়ে। তার কাছে গিয়ে তোমার দেখা করা উচিত। তাছাড়া, সদাসর্বদা শুধু আমাদের মুখ দেখতে তো তোমার ভালো না লাগারই কথা।
কিন্তু মামাণি, সেখানে যাবার ইচ্ছা আমার মোটেই নেই।
একসময় তুমি সেখানে যেতে চাইতে, আর এখন চাও না। সত্যে বলছি, তোমাকে আমি ঠিক বুঝতে পারি । এই তোমার মন খারাপ হয়, এই তুমি কারো সঙ্গে দেখা করতে চাও না।
মন খারাপের কথা তো আমি কখনো বলিনি।
সে কি, এই তো নিজের মুখেই বললে তার সঙ্গে দেখা করতেও চাও না। ও তো খুব ভালো মেয়ে, তুমি তো সবসমই ওকে পছন্দ করতে, কিন্তু এখন যে হঠাৎ তোমার মাথায় কি ঢুকেছে তা তুমিই জান। আমার কাছে তুমি সব কথা লুকিয়ে চল।
মোটেই তা নয় মামণি।
তবুও যদি তোমাকে কোনো খারাপ কাজ করতে বলতাম-তোমাকে তো বলছি ভদ্রতার খাতিরে তার সঙ্গে একবার দেখা করতে। সৌজন্যের খাতিরেই তো সেটা করা দরকার…। ঠিক আছে, আমার বলা আমি বললাম, এরপরও যদি মার কাছ থেকে লুকোবার মতো কোনো গোপন কথা তোমার থাকে তা আমি তার মধ্যে নাক গলাতে চাই না।
বেশ তো, তুমি যদি চাও তো আমি যাব।
এটা তো তোমার কোনো ব্যাপার নয়। তোমার জন্যই কথাটা বলছি।
নিকলাস দীর্ঘশ্বাস ফেলল, গোঁফ কামড়াল, তারপর মার মনটাকে অন্য দিকে ঘোরতে তাস নিয়ে পেশেন্সের ছক বিছিয়ে দিল।
পরদিন সেই একই সংলাপের পুনরাবৃত্তি ঘটল, তার পরের দিন, এবং তারও পরের দিন।
রস্তভ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিকলাসের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত রকমের শীতল অভ্যর্থনার পরে প্রিন্সেস মারিও নিজের কাছে স্বীকার করল যে প্রথম দেখা করতে না যাওয়াটাই তার উচিত ছিল।
আত্ম-গর্বে সে নিজেকে বোঝাল, এছাড়া আর কিছু তো আমি আশা করিনি। তার কাছে তো আর কোনো দরকার ছিল না। আমি গিয়েছিলাম বৃদ্ধা মহিলাটির সঙ্গে দেখা করতে, তিনি আমাকে চিরদিনই ভালোবাসেন, তার কাছে আমি অনেক দিক থেকে দায়বদ্ধ।
মধ্যশীতের একটা দিন। পড়ার ঘরে বসে সে ভাই-পোকে পড়াচ্ছিল, এমন সময় খবর এল রস্তভ এসেছে দেখা করতে। মনে মনে সংকল্প করল, কিছুতেই ধরা দেবে না, মনের উত্তেজনা কিছুতেই প্রকাশ করবে না। মাদময়জেল বুরিয়েকে ডেকে পাঠিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকখানায় গেল।
নিকলাসের মুখের দিকে প্রথম দৃষ্টিপাতেই প্রিন্সেস মারি বুঝতে পারল শুধুমাত্র সৌজন্যের খাতিরেই সে এসেছে, তাই নিজের সুর সে মোটেই পাল্টালো না।
দুজনের মধ্যে কথা হল কাউন্টেসের কথা নিয়ে, বন্ধুদের নিয়ে, যুদ্ধের সর্বশেষ সংবাদ নিয়ে। তারপর দশ মিনিট পরে ভদ্রতার পাট চুকে যেতেই নিকলাস বিদায় নিতে উঠে দাঁড়াল।
মাদময়জেল বুরিয়ের সহায়তায় প্রিন্সেস বেশ ভালোভাবেই কথাবার্তা চালিয়ে গেল, কিন্তু একেবারে শেষমুহূর্তে নিকলাস যখন উঠে দাঁড়াল তখন যেন অসম্ভব একটা ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরল, মনে প্রশ্ন জাগল কেন সে জীবনে সুখের মুখ দেখতে পাবে না, অন্যমনস্কভাবে সে চুপ করে বসে রইল, উজ্জ্বল চোখ দুইটি সামনের দিকে নিবদ্ধ, নিকলাস যে উঠে দাঁড়িয়েছে সেটাও সে লক্ষ্য করেনি।
নিকলাস তার দিকে তাকাল, হঠাৎ প্রিন্সেসের জন্য তার নিজেরই দুঃখ হল, মনে হল প্রিন্সেসের এই দুঃখের জন্য হয়তো সে নিজেই দায়ী। ইচ্ছা হল প্রিন্সেসকে একটু সাহায্য করে, কিন্তু বলার মতো কিছুই খুঁজে পেল না।
বলল, বিদায় প্রিন্সেস!
প্রিন্সেস চমকে উঠল, তার মুখ লাল হয়ে উঠল, গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেড়িয়ে এল।
যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে বলল, মাফ করবেন, আপনি কি সত্যি চলে যাচ্ছেন কাউন্ট? বেশ তাহলে বিদায়! আরে, কাউন্টেসের জন্য যে একটা কুশন দরকার!
