বাবার মৃত্যু-সংবাদ যখন নিকলাসের কাছে পৌঁছল তখন সে রুশ বাহিনীর সঙ্গে প্যারিসে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে কমিশন থেকে পদত্যাগপত্র গৃহীত হবার জন্য অপেক্ষা না করেই সে ছুটি নিয়ে মস্কো চলে গেল। কাউন্টে মৃত্যুর একমাস পরেই তার আর্থিক অবস্থা পরিষ্কার বোঝা গেল। তার যেসব ছোটখাট ধার-দেনার কথা কেউ সন্দেহই করেনি তাই যখন সর্বসাকুল্যে একটা মোটা অংক দেখা দিল, তখন সকলেই বিস্মিত হল। ঋণের পরিমাণ সম্পত্তির মূল্যের দ্বিগুণ।
বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়রা নিকলাসকে উত্তরাধিকার অস্বীকার করার পরামর্শ দিল। কিন্তু এই অস্বীকৃতি তার পিতার পবিত্র স্মৃতিকে কলংকিত করবে এ-কথা ভেবে সেসব পরামর্শ বাতিল করে দিয়ে সে উত্তরাধিকার এবং সেই সঙ্গে ঋণ-পরিশোধের দায়কে স্বীকার করে নিল।
যেসব পাওনাদার এতকাল চুপ করে ছিল এবার তারা সদলে এসে যার যার পাওনা-গণ্ডা দাবি করতে লাগল। এসব এক্ষেত্রে সাধারণত যা ঘটে থাকে, কার আগে কে পাওনা বুঝে পাবে তা নিয়ে পাওনাদারদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। নিকালসকে কেউ এতটুকু রেহাই দিল না, শান্তি দিল না, এতকাল যারা বুড়ো মানুষটিকে করুণা করে এসেছে তারাই উত্তরাধিকারী যুবকটিকে নির্মমভাবে হেঁকে ধরল।
নিকলাসের কোনো পরিকল্পনাই সফল হল না। নিলামে সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গেল অর্ধেক মূল্যে, অর্ধেক ঋণ তখনো বাকি রয়ে গেল। ভগ্নিপতি বেজুখভ যে ত্রিশ হাজার রুবল দিল নিকলস সেটা হাত পেতে নিল। অবশিষ্ট ঋণের দায়ে পাছে জেল খাটতে হয় তাই সে নতুন করে সরকারি চাকরি গ্রহণ করল।
পরবর্তী শূন্য পদেই তাকে কর্নেল করা হবে জেনেও সে সেনাবাহিনীতে ফিরে যেতে পারল না, কারণ জীবনের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে মা তাকে সম্পূর্ণভাবে আঁকড়ে ধরল, কাজেই পরিচিত লোকজনের মাঝখানে মস্কোতে বাস করতে যত অনিচ্ছাই থাকুক, সিভিল সার্ভিসের চাকরিকে যতই ঘৃণা করুক, তবু মস্কোতে সেই চাকরিতেই সে ঢুকল, অতি প্রিয় সামরিক পরিচ্ছদ খুলে ফেলে মাকে ও সোনিয়াকে নিয়ে মস্কোর দরিদ্র পল্লী সিভৎসেভ ভ্রাঝেকের একটা ছোট বাড়িতে গিয়ে উঠল।
সেসময় নাতাশা ও পিয়ের পিটার্সবুর্গে বাস করেছিল, নিকলাসের অবস্থায় কোনো স্পষ্ট ধারণা তাদের ছিল না। ভগ্নিপতির কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার জন্য নিজের শোচনীয় অবস্থাটা তার কাছ থেকে গোপন রাখতেই সে চেষ্টা করেছিল। তার অবস্থা আরো সংকটজনক হয়ে উঠল কারণ বারোশো রুবল মাস-মাইনেতে তাকে যে মার, সোনিয়ার ও নিজের খরচ চালাতে হচ্ছে তাই শুধু নয়, তাদের দারিদ্রের খবরটা মার কাছ থেকে লুকিয়েও রাখতে হচ্ছে। যে বিলাস ও প্রাচুর্যের মধ্যে কাউন্টেস শৈশব থেকে লালিত-পালিত হয়েছে তাকে বাদ দিয়ে জীবন ধারণ করার কথা সে ভাবতেই পারে না, কাজেই ছেলের পক্ষে কতটা কষ্টকর হাত পারে সেটা না বুঝেই কাউন্টেস কোনো বান্ধবীকে বাড়িতে ডেকে আনতে গাড়ি পাঠাতে বলে (এখন তাদের নিজেদের গাড়ি নেই), কখনো বা নিজের জন্য আদেশ করে দামি খাবারের, ছেলের জন্য মদের, অথবা হয় নাতাশার জন্য, নয় তো সোনিয়ার জন্য, না হয় নিকলাসের জন্যই কোনো দামি উপহারের দরুন টাকার জন্য চাপ দেয়। সোনিয়া সংসার চালায়, খালার সেবা করে, তাকে পড়ে শোনায়, তার খেয়াল ও বদমেজাজ সহ্য করে, এবং কাউন্টেসের কাছ থেকে সংসারের দারিদ্রকে ঢেকে রাখতে নিকলাসকে সাহায্য করে। তার মার জন্য সোনিয়া যা করছে সেজন্য নিকলাস তার প্রতি অপরিশোধ্য ঋণ অনুভব করে, তার ধৈর্য ও সেবার প্রশংসা করে, কিন্তু সব সময় তার কাছ থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে। নিকলাসের অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হতে লাগল। মাস-মাইনে থেকে কিছু উদ্বৃত্ত রাখা স্বপ্নবৎ অলীক। কিছু জমাতে তো পারেই না, বরং মার দাবি-দাওয়া মেটাতে তাকে কিছু কিছু ধার-দেনাও করতে হয়। কিছু কিছু আত্মীয়ার পরামর্শমতো কোনো ধনবতী নারীকে বিয়ে করার কথা সে ভাবতেই পারে না। মুক্তির আর একটা পথ-মায়ের মৃত্যুর কথা কখনো তার মাথায়ই আসেনি। তার কোনো কামনা নেই, কোনো কিছুই সে আশা করে না। নিজের অবস্থাকে সহ্য করতে পারার মধ্যেই সে মনে মনে একটা কঠোর সন্তুষ্টি অনুভব করে। পুরোনো পরিচিতি জন, তাদের সহনুভূতি ও সাহায্যের প্রস্তাব–সবকিছুকেই সে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। এড়িয়ে চলে সবরকম আমোদ-প্রমোদ ও সাধ-আহ্লাদ। এমন কি বাড়িতেও মার সঙ্গে তাস খেলা, ঘরময় পায়চারি করা, এবং একটার পর একটা পাইপ ধরানো ছাড়া কিছুই করে না। মনের মধ্যে সেই বিষণ্ণতাকেই সযত্নে লালন করেই একমাত্র যার সাহায্যে এই দুরবস্থাকে সে সহ্য করতে পারে।
.
অধ্যায়-৬
শীতের গোড়াতেই প্রিন্সেস মারি মস্কোতে এল। শহরে প্রচলিত আলোচনা থেকেই সে রস্তভদের অবস্থা জানতে পারল, জানতে পারল মায়ের জন্য ছেলের আত্মত্যাগের কথা।
নিকলাসের প্রতি গভীর প্রীতিবশত মারি নিজের মনেই বলল, তোমার কাছ থেকে এছাড়া অন্য কিছু আমি কখনো আশা করেনি। নিজেকে সে রস্তভ পরিবারেরই একজন বলে মনে করে। তাদের সঙ্গে বন্ধুতের কথা স্মরণ করে সে ভাবল, এ অবস্থায় তাদের সঙ্গে একবার দেখা করা তাদের কর্তব্য। কিন্তু ভরোনেঝে নিকলাসের সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্মরণ করে সেকাজ করার সাহস তার হচ্ছিল না। তবুও মস্কোতে আসার কয়েক সপ্তাহ পরে অনেক চেষ্টা করে শেষপর্যন্ত তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
