একটু অপেক্ষা কর, আমি এনে দিচ্ছি, বলে মাদময়জেল বুরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দুজনেই চুপ। মাঝে মাঝে একে অন্যকে দেখছে।
অবশেষে নিকলাস বিষণ্ণ হেসে বলল, হ্যাঁ প্রিন্সেস। বগুচারেভোতে আমাদের শেষ সাক্ষাতের পরে খুব বেশি দিন পার হয়নি, হয়ত এরই মধ্যে কত জলই না গড়িয়ে গেছে। তখন আমরা সকলে কি দুঃখেই না পড়েছিলাম, অথচ সেই দিনগুলিকে ফিরিয়ে আনতে অনেক কিছু দিতেই আমি প্রস্তুত।…কিন্তু সেদিন আর ফিরবে না।
প্রিন্সেস মারি উজ্জ্বল দুটি চোখ তুলে একদৃষ্টিতে নিকলাসের দিকে তাকাল। যেন তার কথাগুলির গোপন তাৎপর্যকে বুঝতেই চেষ্টা সে করছে। বলল, ঠিক, ঠিক, কিন্তু অতীতের জন্য অনুশোচনা করার কোনো কারণ তো আপনার নেই। আপনার বর্তমান জীবনযাত্রা সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তাতে মনে হয় খুশির সঙ্গেই আপনি সে দিনকে স্মরণ করবেন, কারণ যে আত্মত্যাগের দ্বারা সে জীবন পরিপূর্ণ…
নিকলাসের মুখে পুনরায় আগেকার মতোই কাঠিন্য ও শীতলতা ফুটে উঠল। কিন্তু যে মানুষটিকে প্রিন্সেস জানত ও ভালোবাসত তার দেখা সে এর মধ্যেই পেয়ে গেছে। তাকে উদ্দেশ্য করেই সে বলতে লাগল : ভেবেছিলাম একথা বলার অনুমতি আপনি আমাকে দেবেন। আপনার…এবং আপনার পরিবারের অন্য সকলের এত কাছে আমি এসেছিলাম যে ভেবেছিলাম আমার সহানুভূতিকে আপনি ভুল বুঝবেন না, কিন্তু আমারই ভুল হয়েছিল। হঠাৎ তার গলা কাঁপতে লাগল। কেন জানি না আপনি যেন বদলে গেছেন, আর…
এ কেনর হাজার কারণ আছে,–নিকলাস কেন কথাটার উপর বিশেষ জোর দিয়ে বলল। ধন্যবাদ প্রিন্সেস, অনেক সময়ই এটা কষ্টের।
তাহলেই এটাই কারণ! এটাই কারণ! প্রিন্সেস মারির বুকের মধ্যে কে যেন ফিসফিস করে বলল। না, শুধু এই সদয়, হাসিখুশি, খোলামেলা দৃষ্টিকে, শুধু এই সুন্দর বহিরাবরণকে তো আমি ভালোবাসিনি। ভালোবেসেছি তার মহৎ, স্থিতপ্রজ্ঞ, আত্মত্যাগী মনকেও। ঠিক, সে এখন গরিব আর আমি ধনী…হাঁ, সেটাই একমাত্র কারণ…হ্যাঁ, তা যদি না হত… নিকলাসের আগেকার মমতা স্মরণ করে এবং এখনকার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে সহসা তার শীতল ব্যবহারের কারণটা সে বুঝতে পারল।
নিজের অজ্ঞাতসারেই নিকলাসের আরো কাছে সরে গিয়ে প্রিন্সেস মারি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, কিন্তু কেন, কাউন্ট কেন? আমাকে বলুন। আপনাকে বলতেই হবে।
নিকলাস নীরব। প্রিন্সেস বলতে লাগল, আপনার কেনগুলি আমি বুঝতে পারছি না কাউন্ট, কিন্তু স্বীকার করছি…আমি বড় কষ্ট পাচ্ছি। যে কারণেই হোক আপনার সঙ্গে আমার যে বন্ধুত্ব ছিল তা থেকে আমায় বঞ্চিত করতে চাইছেন। আর সেখানেই আমার দুঃখ। তার কণ্ঠ অশ্রুসিক্ত, দুই চোখ অশ্রুপূর্ণ। জীবনে সুখের মুখ এত অল্প দেখেছি যে যা কিছু হারাই তাই আমার কাছে সহ্যের অতীত। ক্ষমা করবেন, বিদায়! সহসা কেঁদে উঠে সে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তাকে থামানোর চেষ্টায় নিকলাস ডাকল, প্রিন্সেস, ঈশ্বরের দোহাই! প্রিন্সেস! প্রিন্সেস ঘুরে দাঁড়াল কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল–আর যা মনে হয়েছিল সম্ভব ও অনেক দূরে তাই সহসা হয়ে উঠল সম্ভব, অনিবার্য, অনেক কাছে।
.
অধ্যায়-৭
১৮১৩ সালের শীতকালে নিকলাস প্রিন্সেস মারিকে বিয়ে করে স্ত্রী, মা ও সোনিয়াকে নিয়ে বল্ড হিলসে চলে গেল।
স্ত্রীর সম্পত্তির এতটুকু বিক্রি না করে চার বছরের মধ্যে বাকি ঋণ শোধ করে দিল এবং একজন জ্ঞাতির মৃত্যুতে উত্তরাধিকারসূত্রে একটা সম্পত্তি পেয়ে পিয়রের ঋণটাও শোধ করে দিল।
আরো তিন বছরে ১৮২০ সালের মধ্যেই সবকিছু এমনভাবে ব্যবস্থা করল যাতে বোল্ড হিলস সংলগ্ন একটা ছোট সম্পত্তিই সে কিনে ফেলল, এবং জীবনের একমাত্র প্রিয় স্বপ্ন অত্রাদকে আবার কিনে নেয়ার জন্য আলোচনা শুরু করে দিল।
প্রয়োজনের তাগিদে খামারের কাজে হাত দিয়ে সে কাজটা কার এত ভালো লেগে গেল যে এখন সেটাই তার প্রিয় এবং প্রায় একমাত্র কাজ হয়ে উঠেছে। নিকলাস খুব সাধাসিধেভাবে খামার চালায় : বর্তমানে প্রচলিত নতুন নতুন বিলাতি চাষ-ব্যবস্থা সে পছন্দ করে না। নিজের ক্ষেতে ফসল বোনা ও খড় কাটার মতো যত্ন নিয়েই সে অন্য চাষীদের ক্ষেতে ফসল বোনা ও খড় কাটার ব্যবস্থা করে দিত। ফলে চাষীদের সহযোগীতায় নিকলাসের ফসল বোনা ও ফসল কাটা ভালোভাবে এবং এত আগে আগে হয়ে যেত যা অন্য কোনো জমির মালিকের বেলাই সম্ভব হত না।
পারিবারিক ভূমিদাসদের-তাদের সে বলত দ্রোনকাজে লাগানো সে পছন্দ করত না। সকলেই বলত, লাই দিয়ে-দিয়ে সে তাদের মাথাটি খেয়েছে। কখনো কোনো ভূমিদাসকে শাস্তি দেবার দরকার হলে সে যে কি করবে তাই বুঝে উঠত না, আর বাড়ির সকলের সঙ্গেই তা নিয়ে পরামর্শ করত। অবশ্য চাষীদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত সে কখনো ইতস্তত বোধ করত না। সে জানত সে যাই করুক সব চাষীরাই সেটা মাথা পেতে নেবে। চারদিকে নিকলাসের জয়-জয়কার পড়ে গেল। তার লোকবল দ্রুত বাড়তে লাগল, পার্শ্ববর্তী সব জমিদারি থেকে ভূমিদাসরা এসে তার কাছে ধর্না দিত বিক্রি হবার জন্য। তার মৃত্যুর অনেকদিন পরেও তার সুশানের স্মৃতি ভূমিদাসরা সসম্মানে নিজ নিজ অন্তরে রক্ষা করে চলত। তিনি তো কর্তার মতো কর্তা… প্রথমে চাষীদের কাজ, তারপর নিজের। অবশ্য কোনো কিছুকেই তিনি অকহেলা করতেন না–এককথায় তিনিই তো ছিলেন সত্যিকারের কর্তা!
