জাতীয় যুদ্ধের সময়ে নিষ্ক্রিয় ছিল, কারণ তখন তাকে প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু যে মুহূর্তে একটি ব্যাপক ইওরোপিয় যুদ্ধে অনিবার্য হয়ে উঠল, সেইমুহূর্তেই সে স্বস্থানে আর্বিভূত হয়ে ইওরোপের দেশগুলিকে সংঘবদ্ধ করে লক্ষ্যপথে এগিয়ে নিয়ে এল।
লক্ষ্যে পৌঁছনো হল। ১৮১৫-র চূড়ান্ত যুদ্ধের পরে সবরকম সম্ভবপর ক্ষমতা আলেক্সান্দার করায়ত্ত হল। কিন্তু সে ক্ষমতাকে সে কীভাবে ব্যবহার করল? প্রথম আলেক্সান্দার ইওরোপে শান্তির প্রতিষ্ঠাতা, প্রথম জীবন থেকেই নিজের দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট, পিতৃভূমিতে নব নব উদারনৈতিক চিন্তাধারার প্রবর্তক। তার হাতে এখন সর্বাধিক ক্ষমতা। দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনের এই তো উপযুক্ত সময়। সুদূর দ্বীপে বসে নির্বাসিত নেপোলিয়ন ছেলেমানুষের মতো মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলে কেমন করে সে মানবজাতিকে সুখের পথ দেখাতে পারত। প্রথম আলেক্সান্দারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, ঈশ্বরের হাত নেমেছে তার মাথায়, অথচ সহসা তার মনে হল, এ ক্ষমতা অতি তুচ্ছ, তাই দূরে সরে গিয়ে সব ক্ষমতা তুলে দিল সেই সব নগণ্য মানুষদের হাতে যাদের সে এতকাল ঘৃণা করে এসেছে। মুখে একমাত্র কথা, আমাদের জন্য নয়, আমাদের জন্য নয়, সবকিছু উৎসর্গিত হোক তোমারই নামে!…তোমাদের সকলের মতোই আমিও তো মানুষ। মানুষের মতোই আমাকে বাচঁতে দাও, আত্মা ও ঈশ্বরের কথা চিন্তা করতে দাও।
সূর্য ও প্রতিটি পরমাণু যেমন একাধারে একটি সম্পূর্ণ জগত আবার একটা সমগ্র সত্তার অংশমাত্র, তেমনই প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব আর্দশ ও লক্ষ্যের বাহক। একটি মৌমাছি ফুলের উপর বসতে গিয়ে একটি শিশুর শরীরে হুল ফুটিয়ে দিল। সেই থেকে শিশুটি মৌমাছিকে ভয় পায়, বলে যে মানুষের শরীরে হুল ফোঁটাতেই মানুষের জন্ম। মৌমাছিকে ফুলের পাপড়ি থেকে মধু সগ্রহ করতে দেখে কবি তার প্রশংসা করে, আবার একথাও বলে যে ফুলের গন্ধ লুটতেই মৌমাছির জন্ম। ফুল থেকে পরাগ সংগ্রহ করে মৌমাছি যখন তাকে মৌচাকে বয়ে নিয়ে যায় তখন একজন মৌমাছি-পালক বলে যে মধুসগ্রহ করাই মৌমাছির কাজ। আবার অন্য একজন মৌমাছি-পালক যে মৌমাছির জীবনযাত্রা ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে সে বলে, মৌমাছি পরাগরেণু সগ্রহ করে বাচ্চা মৌমাছিকে খাওয়াতে ও মক্ষীরানীকে বাঁচিয়ে রাখতে, বংশবৃদ্ধির জন্যই তার জন্ম। একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী দেখে, একটি মৌমাছি পুং-পুষ্প থেকে পরাগ সগ্রহ করে উড়ে গিয়ে তাকে গর্ভকেশরে স্থাপন করে, তার কাছে এটাই মৌমাছির জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। অপর একজন উদ্ভিদের স্থানান্তরে গমনের ঘটনায় মৌমাছির ঘটনাকে লক্ষ্য করে বলে যে সেটাই মৌমাছির জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়–মানুষের বুদ্ধিগত কোনো কর্মধারাই মৌমাছির জীবনের চরম লক্ষ্য হতে পারে না। এইসব উদ্দেশ্যের সন্ধানে মানুষের বুদ্ধি যত উপরে উঠতে থাকে ততই একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে চরম লক্ষ্য আমাদের বুদ্ধির অতীত।
মৌমাছির জীবনের সঙ্গে জীবনের আত্মপ্রকাশের মাধ্যমগুলির সম্পর্কটাই একমাত্র জিনিস মানুষের বুদ্ধি যাকে ধরতে পারে। ঐতিহাসিক চরিত্র ও জাতিসমূহের উদ্দেশ্যের বেলায়ও একথা সমান সত্য।
.
অধ্যায়-৫
১৮১৩ সালে বেজুখভের সঙ্গে নাতাশার বিয়েই প্রাচীন রস্তভ-পরিবারের শেষ সুখের ঘটনা। কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ সেই বছরই মারা গেল, আর সর্বত্র যে রকম ঘটে থাকে, পিতার মৃত্যুর পরেই পারিবারিক বন্ধনও ভেঙ্গে পড়ল।
আগের বছরের নানা ঘটনা : মস্কোর অগ্নিকাণ্ড ও সেখান থেকে পলায়ন, প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যু, নাতাশার হতাশা, পেতয়ার মৃত্যু ও বৃদ্ধা কাউন্টেসের শোক–আঘাতের পর আঘাত হানল বুড়ো কাউন্টারে মাথায়। এসব ঘটনার কোনো তাৎপর্যই সে বুঝতে পারল না, আধ্যাত্মিক প্রশান্তির সঙ্গে সে পক্ককেশ মাথাটাকে নোয়াল, যেন প্রার্থনা করল আরো আঘাত এসে তাকে শেষ করে দিক। তাকে কখনো মনে হত ভয়াত ও হতবুদ্ধি, আবার কখনো মনে হত অসম্ভব রকমের জীবন্ত উদ্যমশীল।
নাতাশার বিয়ের ব্যবস্থাদি নিয়ে বেশ কিছুদিন ব্যস্ত থাকল। ডিনার ও সাপারের আয়োজন করল, সবসমই চেষ্টা করত হাসি-খুশি থাকতে, কিন্তু যারা তাকে জানত, তাকে ভালোবাসত তারা সবই বুঝত, বৃদ্ধকে করুণার চোখে দেখত।
পিয়ের ও তার স্ত্রী চলে গেল সে খুবই চুপচাপ হয়ে গেল, সবসময়ই বলতে লাগল, কিছুই তার ভালো লাগে না। কয়েকদিন পরেই সে অসুস্থ হয়ে বিছানা নিল। ডাক্তার যতই আশা দিক, প্রথম থেকেই সে জানত যে আর কোনোদিনই সে আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না। কাউন্টেস পোশাক না ছেড়েই তার বালিশের পাশে একটা হাতল-চেয়ারে বসে পক্ষকাল কাটিয়ে দিল। যতবার কাউন্টাকে ওষুধ খাওয়ায় ততবারই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে নিঃশব্দে তার হাতে চুমো খেত। শেষ দিনেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে তাদের সম্পত্তি নষ্ট করার জন্য কাউন্টেসের কাছে, তাদের অনুপস্থিত ছেলের কাছে ক্ষমা চাইত–তার ধারণা তাদের কাছে সেটাই তার প্রধান অপরাধ। অনুষ্ঠানাদির পরে সে শান্তভাবে মারা গেল, পরদিন দলে দলে পরিচিত লোকজন এসে মৃতের প্রতি তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে গেল। জীবিতকালে তারাই কাউন্টকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করলেও এখন সকলেই বলল : যাই বল না কেন কাউন্ট খুবই যোগ্য লোক ছিলেন। আজকাল এরকম লোক চোখে পড়ে না।…নিজ নিজ দুর্বলতা আমাদের কার না আছে?
