অভিযান পূর্বদিকে অগ্রসর হল–পৌঁছল চরম লক্ষ্য মস্কোতে। নগর অধিকৃত হল, অস্তারলিজ থেকে ওয়াগ্রাম পর্যন্ত আগেকার সব যুদ্ধে শত্রুপক্ষের যত ক্ষতি হয়েছিল এবার তার চাইতে অনেক বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হল রুশ বাহিনীর। কিন্তু এবার চাকা ঘুরল। যে আকস্মিকতা ও প্রতিভা এতদিন সাফল্যের পর সাফল্যের এক নির্বিঘ্ন স্রোতের মুখে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে এসেছে পূর্বনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পথে, হঠাৎ এবার তার পরিবর্তে দেখা দিল অসংখ্য আকস্মিক ঘটনার এক উল্টো স্রোতবরদিনোতে তার মাথায় সর্দি বসে যাওয়া থেকে মস্কোর অগ্নিকাণ্ডের স্ফুলিঙ্গ ও বরফপাত পর্যন্ত আর প্রতিভার পরিবর্তে এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল নির্বুদ্ধিতা ও অপরিমেয় নিচতা।
আক্রমণকারীরা পালাচ্ছে, ফিরে দাঁড়াচ্ছে, আবার পালাচ্ছে, এবার কিন্তু আকস্মিকতার স্রোত বইতে লাগল নেপোলিয়নের স্বপক্ষে না হয়ে তার বিরুদ্ধে।
আগেকার পশ্চিম-পূর্ব অভিযানের মতোই একটা বড় রকমের পূর্ব-পশ্চিম পাল্টা অভিযান গড়ে উঠল। ১৮০৫, ১৮০৭ ও ১৮০৯-এর অভিযানের মতোই একটা পূর্ব-পশ্চিম অভিযান শুরু হল, সেই একইভাবে দলের পর দল এসে যোগ দিতে লাগল, যোগ দিল মধ্য ইওরোপের মানুষরা, মাঝপথে সেই একই ইতস্তত ভাব, এবং লক্ষ্যে পৌঁছাবার পথে সেই একই ক্রমবর্ধমান দ্রুতগতি।
শেষ লক্ষ্য প্যারিসে পৌঁছনো হল। নেপোরিয়নের রাজত্ব ও বাহিনী ধ্বংস হল। নেপোলিয়নের কিছুই আর করার নেই, এখন তার সব কাজই সকরুণ ও নিচ। কিন্তু আবার ঘটল সেই দুর্বোধ্য আকস্মিক ঘটনা। মিত্রশক্তিরা নেপোলিয়নকে ঘৃণা করে, তাকেই মনে করে তাদের সব দুঃখ-দুর্দশার কারণ। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থেকে বিচ্যুত হয়ে, সব পাপকর্ম ও চালকি ধরা পড়ে যাওয়ার ফলে, সকলের চোখেই তার সমাজচুত্য দুষ্কৃতকারীর সেই মূর্তিই ফুটে উঠা উচিত ছিল যা সে ছিল দশ বছর আগে এবং পরের এক বছর। কিন্তু কোনো বিচিত্র আকস্মিক ঘটনার ফলে সে মূর্তি কারো চোখে ধরা পড়ল না। তার অভিনয় এখনো শেষ হয়নি। যে মানুষটি দশ বছর আগে এবং পরের এক বছর ছিল একটি সমাজচুত্য দুষ্কৃতকারী তাকে পাঠানো হল জাহাজে ফ্রান্স থেকে দুদিনের পথ একটা দ্বীপে, যে কারণেই হোক সেই দ্বীপটিকে তার রাজ্য হিসেবেই উপহার দেওয়া হল, তার জন্য রক্ষীর ব্যবস্থা করা হল, লক্ষ লক্ষ টাকা তাকে দেওয়া হল।
.
অধ্যায়-৪
জাতিসমূহের বন্যাস্রোতে স্বাভাবিকখাতেই ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। প্রবল আন্দোলনের তরঙ্গ স্তিমিত হয়ে এলেও তার শান্ত বুকে গড়ে উঠল অনেক ঘূর্ণাবর্ত, আর তাতে ভেসে বেড়াতে লাগল সেইসব কূটনীতিকের দল যাদের ধারণা তারাই বন্যাস্রোতকে স্তিমিত করেছে।
কিন্তু সমুদ্রের শান্ত বুক আবার সহসা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠল, কূটনীতিকরা মনে করল, তাদের মতবিরোধিতাই প্রাকৃতিক শক্তির এই নতুন চাপের কারণ, তাদের ধারণা হল রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে আবার যুদ্ধ বাধবে, সে সংকটের কোনো সমাধান নেই। কিন্তু সে ক্রমবর্ধমান তরঙ্গভিঘাত তাদের প্রত্যাশিত অঞ্চল থেকে এল না। এল আগের মতো সেই একই কেন্দ্র থেকে–এল প্যারিস থেকে। পশ্চিম থেকে দেখা দিল শেষ উল্টো টান : যে কূটনৈতিক সমস্যা ছিল আপাতবিচারে অনতিক্রমনীয় সেই উল্টো টানেই তার সমাধান হয়ে গেল, ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের সামরিক অবিযানের অবসান ঘটল।
যে মানুষটি ফ্রান্সকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল সে ফ্রান্সে ফিরে এল একেবারে একা-কোনো ষড়যন্ত্র করে নয়, কোনো সৈন্য সঙ্গে নিয়ে নয়। তখন যে কোনো রক্ষী তাকে বন্দি করতে পারত, কিন্তু কি এক বিচিত্র কারণে কেউ তা করল না, আগের দিন পর্যন্ত যে মানুষটিকে সকলে অভিশাপ দিয়েছে এবং একমাস পরে আবার অভিশাপ দেবে, তাকেই সকলে মহা উৎসাহে স্বাগত জানাল।
একটা সম্মলিত পদক্ষেপের জন্য সে মানুষটিকে আজও প্রয়োজন।
সে কাজ সম্পন্ন হল।
শেষ ভূমিকার অভিনয় শেষ হল। অভিনেতাকে বলা হল : এবার রাজবেশ খুলে ফেল, মুখের পাউডার ও রং ধুয়ে ফেল। তাকে আর দরকার হবে না।
কয়েক বছর কেটে গেল। ইতিমধ্যে নিজের দ্বীপে একান্ত নির্জনে একটি করুণ হাসির নাটকে সে অভিনয় করে চলেছে, নিজের অতীত কর্মধারার কোনো সমর্থনের আর কোনো প্রয়োজন না থাকলেও ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা ভাষণের দ্বারা তাকেই সমর্থন করে চলেছে। সারা জগতের কাছে এতদিনে এই সত্যই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, যতদিন পর্যন্ত একটি অদৃশ্য হাত তাকে পরিচালিত করেছে ততদিন মানুষ যাকে ক্ষমতা বলে ভুল করেছিল আসলে সেটা কি ছিল।
এবার নাটকের যবনিকা ফেলে দিয়ে এবং অভিনেতার সব সাজ-পোশাক খুলে ফেলে ম্যানেজার তাকে আমাদের সামনে এনে হাজির করল।
দেখুন, কাকে আপনারা বিশ্বাস করেছিলেন। এই তো সেই লোক! এখন কি বুঝতে পেরেছেন যে আপনাদের মুগ্ধ করেছিল সে ওই লোক নয়, সে আমি?
কিন্তু ঘটনার তীব্রতায় হতচকিত হওয়ায় এ সত্যি উপলব্ধি করতে মানুষের আরো দেরি হয়ে গেল।
এর চাইতেও অধিকতর সামঞ্জস্য ও অনিবার্যতা চোখে পড়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাল্টা আক্রমণের নায়ক প্রথম আলেক্সান্দারের জীবনে।
দরকার ছিল ন্যায়বোধ ও ইওরোপিয় ঘটনাবলির প্রতি সহানুভূতির, কিন্তু ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বারা আচ্ছন্ন গতানুগতিক সহানুভূতি নয়, তকালের যেসব রাষ্ট্রপ্রধান তার সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল তাদের অপেক্ষা উন্নত নৈতিক চরিত্র, একটি শান্ত, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, আর নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভ। প্রথম আলেক্সান্দারের চরিত্রে এ সবই ছিল, অসংখ্য তথকথিত আকস্মিক যোগাযোগ তার জীবনে এসবই গড়ে দিয়েছিল : তার শিক্ষা, প্রথম জীবনের উদারনৈতিক মতবাদ, চারদিকের পরামর্শদাতার দল, আর অস্তালিজ, তিলজিট ও এরফুর্ট।
