ইতালি থেকে ফিরে গিয়ে সে দেখতে পেল, প্যারিসের শাসন-ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার মুখে, শাসন-ক্ষমতায় যারা অধিষ্টিত ছিল সেই ভাঙ্গনের মুখে তারা অনিবার্যভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আর ঘটনাক্রমেই এই বিপদ থেকে উদ্ধারের একটা এল আফ্রিকায় একটি উদ্দেশ্যহীন ও অর্থহীন অভিযানের রূপে। আবার সেই তথাকথিত, আকস্মিক সুযোগ হল তার সঙ্গী। একটা গুলিও ছেঁড়া হল না, অথচ দুর্ভেদ্য মাল্টা আত্মসমর্পণ করল, তার অত্যন্ত বেপরোয়া পরিকল্পনাগুলিও সাফল্যমণ্ডিত হল। শত্রুপক্ষের যে নৈবহরের চোখ এড়িয়ে পরবর্তীকালে একটি নাৈকাও পার পায়নি তার চোখে ধুলো দিয়ে তার গোটা বাহিনী নির্বিঘ্নে সরে পড়ল। আফ্রিকায় প্রায় নিরস্ত্র অধিবাসীদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হল। আর যারা এইসব অপরাধ করল তারা, বিশেষ করে তাদের নেতা, নিজেদের নিশ্চিত করে বোঝাল যে একাজ তো প্রশংসাৰ্হ, গাৈরবজনক–সিজার ও মহান আলেক্সান্দারও তো এই কাজই করেছে, আর তাই এ কাজ সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।
গৌরব ও আভিজাত্যের এই আদর্শই এই লোক ও তার সঙ্গী সাথীদের আফ্রিকায় নিয়ে গেল সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে। সে যা কিছু করে তাতেই আসে সাফল্য। মহামারী তাকে স্পর্শ করে না। বন্দিকে হত্যার নিষ্ঠুরতাও তার বেলায় অপরাধ বলে গন্য হয় না। সঙ্গী সাথীদের বিপদের মুখে ফেলে রেখে সে যখন নিতান্ত ছেলেমানুষের মতো অকারণে অত্যন্ত হীনভাবে আফ্রিকা থেকে চলে গেল তখন তাকে সেজন্য তাকে প্রশংসাই করা হল, এবং পুনরায় শত্রুপক্ষের নৌবহর দু-দুবার তাকে পালাতে দিল। সফলতার সঙ্গে এইসব অপরাধ করার উল্লাসে মত্ত হয়ে সে যখন প্যারিসে পৌঁছল তখন দেখা গেল, যে প্রজাতন্ত্রী সরকার এক বছর আগে তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারত তার নাভিশ্বাস উঠেছে। সেইমুহূর্তে সবরকম দলগত রেষারেষি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একজন নবাগত হিসেবে তার উপস্থিতি স্বভাবতই তাকে তুলে ধরল উচ্চ পদে-আর নিজের সে রকম কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও সেই নতুন ভূমিকার জন্য সে তখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, সবকিছুতেই তার ভয়, তবু সব দলই তাকে আঁকড়ে ধরল, তার সহযোগিতা দাবি করল।
ইতালি ও মিশরে অর্জিত গৌরব ও সুনাম তখন তার করায়ত্ত, তার উপর আছে তার উম্মদোচিত আত্ম প্রশান্তি, যে কোনো অন্যায় কাজ করার উপযুক্ত সাহসিকতা এবং খোলাখুলি মিথ্যা বলার ক্ষমতা। কাজেই আসন্ন কর্তব্য সাধনের সেই তো একমাত্র যোগ্য লোক।
আসনটি তো তার জন্যই অপেক্ষা করে ছিল, কাজেই নিজের ইচ্ছা ছাড়াই এবং নিজের অস্থিরচিত্ততা, পরিকল্পনার অভাব, এবং সব ভূলভ্রান্তি সত্ত্বেও ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সে জড়িয়ে পড়ল। সে ষড়যন্ত্র সফল হল।
আইন-পরিষদের একটা সভায় তাকে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। ভয়ে তার দিশেহারা অবস্থা, কোনোরকমে পালাতে পারলে বাঁচে। মূৰ্ছা যাবার ভান করে সে এমন সব অর্থহীন উক্তি করে বসল যাতে তার বারটা বেজে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ফ্রান্সের একদা গর্বিত ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি শাসকরা তখন বুঝতে পেরেছে যে তাদের খেলা সাঙ্গ হয়েছে, তারা তখন সেই লোকটির চাইতেও বিমূঢ়, যেসব কথা বললে সেইমুহূর্তেই তাকে ধ্বংস করা যেত তা তারা মুখেই আনল না।
আকস্মিক সুযোগ, লক্ষ লক্ষ আকস্মিক সুযোগ তার হাতে তুলে দিল ক্ষমতা, আর সকলেই যেন চুক্তি করে সে ক্ষমতাকে সমর্থন জানাল। ফ্রান্সের যে শাসকরা তার কাছে নতি স্বীকার করল তারাও আকস্মিকতার ফসল, সেই আকস্মিকতার প্রভাবেই রাশিয়ার প্রথম পল তার রাজত্বকে স্বীকৃতি দিল, ঘটনাচক্রেই তার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হল তা যে ব্যর্থ হল তাই শুধু নয়, তার ফলে তার শক্তি আরো বৃদ্ধি পেল। আকস্মিক ঘটনার ফলেই দুক দ্য এনি তার হাতে পড়ে, অপ্রত্যাশিতভাবে তার হাতেই নিহত হয়–ফলে জনতার মনে এই ধারণাই দৃঢ়তর হয় যে একাজ করার অধিকার তার আছে, কারণ সে শক্তি আছে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা অভিযানের উদ্যোগ-আয়োজন করেও (করলে হয় তো তার ধ্বংসই ছিল অনিবার্য) আকস্মিক ঘটনাচক্রেই সে বাসনা পরিত্যাগ করে অপ্রত্যাশিতভাবে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ম্যাক ও অস্ট্রিয়ানদের উপরে, আর বিনা যুদ্ধে তারা আত্ম সমর্পণ করল। আকস্মিক ঘটনাচক্র আর প্রতিভাই তাকে বিজয়-গৌরব এনে দিল অস্তারলিজে, আর আকস্মিকভাবেই সব মানুষ, কেবল ফ্রান্সের নয়, সারা ইওরোপের মানুষ-একমাত্র ইংল্যান্ড বাদে-স্বীকার করে নিল তার কর্তৃত্ব, তার নতুন পদ-মর্যাদা, তার গৌরব ও জাকজমকের আর্দশ।
নিজেদের শক্তির পরিমাপ করতে এবং আসন্ন অভিযানের জন্য প্রস্তুত হতেই পশ্চিমদেশীয় শক্তিগুলি বারবার পুবের দিকে পা বাড়াল-১৮০৫, ১৮০৬, ১৮০৭, ও ১৮০৯-এ আরো উত্তরোত্তর তাদের শক্তি বাড়তে লাগল। ১৮১১-তে যে জনগোষ্ঠীটি গড়ে উঠেছিল ফ্রান্সে, তার সঙ্গে এককাট্টা হয়ে যোগ দিল মধ্য ইওরোপের একটা বড় জনগোষ্ঠী। দল যত বড় হতে লাগল দলপতির শক্তি ততই বাড়তে লাগল। দশ বছরব্যাপী প্রস্তুতির কালে এই লোকটি ইওরোপের সব রাজা-রাজড়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলল। একের পর এক তারা ছুটে এল তার কাছে নতি স্বীকার করতে। এই মহামানবটির করুণা লাভের আশায় প্রাশিয়ার রাজা পাঠাল নিজের স্ত্রীকে, এই লোকটি যদি সিজার-বংশের একটি কন্যাকে তার শয্যাসঙ্গিনী করে তাহলে অস্ট্রিয়ার সম্রাট নিজেকে অনুগৃহীদ মনে করবে, সব জাতির কাছে যা কিছু পবিত্র তার প্রতিভূস্বরূপ পোপ এই মহামানবটিকে তুষ্ট করতে ধর্মের আশ্রয় গ্রহন করল। যেন স্বীয় ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য নেপোলিয়ন নিজেকে তৈরি করছে না, যারা রয়েছে তার চারপাশে তারাই তাকে তৈরি করে তুলছে আসন্ন ঘটনাবলীর দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত করে। এমন কোনো কাজ, এমন কোনো পাপ, কোনো ছোটখাট জালিয়াতি সে করেনি যা তার সাঙ্গপাঙ্গদের মুখে মহৎ কীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়নি। জার্মানরা তো তার সম্মানে জেনা ও অরস্তাদ-এ একটা ভোজসভার আয়োজন করেছিল। এই লোকটি শুধু নিজেই মহান নয়, মহান তার পূর্বপুরুষরা, তার ভ্রাতাগন, তার বি-পুত্ৰগন, ও শ্যালকগনও। যেটুকু বুদ্ধি-বিবেচনা তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল সেটুকু নিঃশেষ করে একটা ভয়ঙ্কর ভূমিকা পালনের জন্য তাকে প্রস্তুত করে তুলতে সব কিছুই করা হল। এইভাবে সে নিজে যখন প্রস্তুত হল, তখনকার সৈন্যরাও প্রস্তুত।
