কিন্তু আকস্মিকতা কি? প্রতিভাই বা কি?
আকস্মিকতা এবং প্রতিভা কোনো সত্যিকারের বস্তুকে বোঝায় না, কাজেই তাদের সংজ্ঞাও দেওয়া যায় না। এই কথা দুটি ঘটনাকে বোঝার একটা স্তরের দ্যোতকমাত্র। একটা বিশেষ ঘটনা কেন ঘটে তা আমি জানি না, আমি মনে করি সেটা জানা যায় না, আর তাই আমি সেটা জানতে চেষ্টাও করি না, আকস্মিকতার দোহাই পাড়ি। আমি দেখি, এমন একটা শক্তি কতকগুলি ফল
ফলায় যা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে, এটা কেন ঘটে তা আমি জানি না, তাই প্রতিভার কথা বলি।
মেষপালক একদল ভেড়ার মধ্যে যে ভেড়াটাকে রোজ একটা বিশেষ খোঁয়াড়ে নিয়ে গিয়ে দানা-পানি দেয়, সেটাই অন্যগুলির চাইতে দ্বিগুন মোটা হয়, এবং প্রতিভাধর হয়ে ওঠে। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে সেই চর্বিওয়ালা মোটা ভেড়াটাকেই মাংসের প্রয়োজনে জবাই করা হয়।
কিন্তু একটু চিন্তা করলেই ভেড়ার দল বুঝতে পারে যে তাদের ভাগ্যে যা কিছু ঘটে তা তাদের ভেড়ার উপযুক্ত লক্ষ্য সাধনের জন্যই ঘটে, তাদেরও এ সত্য স্বীকার করতেই হবে তাদের ভাগ্যে যা ঘটেছে তার উপর তাদের কোনো হাত ছিল না, তাহলেই পুরুষ্ট ভেড়াটার ভাগ্যের পরিণতিটা তারা সহজেই বুঝতে পারবে। কেন তাদের পুরুষ্ট করা হয় সেটা যদি বুঝতে নাও পারে, অন্তত এটুকু তারা বুঝতে পারবে যে ঐ ভেড়াটার কপালে যা ঘটেছে তা আকস্মিকভাবে ঘটেনি, তাহলেই তাদের আর আকস্মিকতা অথবা প্রতিভার তত্ত্বের কোনো দরকার হবে না।
আমাদের কেবল এটুকু স্বীকার করতেই হবে যে ইওরোপের সেই প্রচণ্ড আলোড়নের উদ্দেশ্য কি ছিল তা আমরা জানি না, আমরা জানি শুধু যা ঘটেছে তাকে–অর্থাৎ নরহত্যা–প্রথমে ফ্রান্সে, তারপর ইতালিতে, আফ্রিকায়, প্রশিয়ায়, অস্ট্রিয়ায়, স্পেনে, ও রাশিয়ায়, আরো। জানি, পশ্চিম থেকে পূর্বে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে মানুষের চলাচল ও গতিবিধিই এইসব ঘটনার মূল কথা ও উদ্দেশ্য, তার জন্য নেপোলিয়ন ও আলেক্সান্দারের মধ্যে কোনো বিরল ক্ষমতা ও প্রতিভার খোঁজ করার কোনো দরকার হয় না, তাদের সাধারণ মানুষের চাইতে অন্য কিছু বলে মনে করা আর তখন সম্ভবই হবে না, যেসব ছোটখাট ঘটনা এই লোকগুলিকে এত বড় করে তুলেছে তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো আকস্মিকতার আশ্রয়ও আমাদের নিতে হবে না, বরং এই সত্যই আমরা
স্পষ্ট করে উপলব্ধি করতে পারব যে ওইসব ছোটখাট ঘটনাগুলি একান্তই অনিবার্য ছিল।
চরম উদ্দেশ্যকে জানার দাবিকে অস্বীকার করলেই আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারব যে কোনো একটি গাছে ফুল ফোটে বা ফল ফলে তার চাইতে ভালো ফুল ফোঁটা বা ফল ফলার কথা যেমন কেউ কল্পনা করতে পারে না, তেমনই নেপোলিয়ন ও আলেক্সান্দার যে লক্ষ্য সাধন করেছিল, অন্য কোনো দুটি মানুষ যে তাদের চাইতে ভালোভাবে সে লক্ষ্য সাধন করতে পারত সে কল্পনা করাও অসম্ভব।
.
অধ্যায়-৩
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইওরোপে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার মূলগত প্রধান তাৎপর্যই হচ্ছে ইওরোপের। অধিকংশ মানুষের স্থান-পরিবর্তন-প্রথমে পশ্চিম থেকে পূর্বে, এবং পরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। শুরুতে ছিল পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়া। পশ্চিমের মানুষরা যাতে মস্কোতে একটা যুদ্ধকালীন অভিযান চালাতে পারে তার জন্য প্রয়োজন ছিল—
১. পূর্বের রণকুশল সামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে এর্টে উঠাবার মতে যথেষ্ট সংখ্যক একটি সামরিক গোষ্ঠীরূপে নিজেদের গড়ে তোলা,
২. প্রতিষ্ঠিত সবরকম ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে বিসর্জন দেওয়া এবং
৩. সামরিক অভিযানের সময় নেতৃপদে এমন একজন লোককে রাখা যে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সবরকম প্রতারণা, দস্যুবৃত্তি ও নরহত্যাকে সমর্থন করতে পারবে।
ফরাসি বিপ্লবের শুরু থেকেই অনুপযুক্ত পুরোনো বড় দলটাকে এবং সেইসঙ্গে পুরোনো সব অভ্যাস ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করা হতে লাগল, এবং ধাপে ধাপে তার চাইতেও বড় এমন একটা দলকে গড়া হতে লাগল যাদের রীতিনীতি নতুন আর ঐতিহ্যও নতুন, এবং এমন একজনকে মাথার উপরে বসানো হল যে যা কিছু করা । হোক না কেন সে সব কিছুর দায়-দায়িত্ব গ্রহন করবে।
বিচিত্র এক যোগাযোগের ফলে বিভিন্ন ক্রমবর্ধমান ফরাসি উপদলের ভিতর থেকে এমন একটি লোকের আর্বিভাব ঘটল যার কোনো পূর্ব ইতিহাস নেই, ঐতিহ্য নেই, নাম নেই, এমন কি যে নিজে ফরাসিও নয়। কোনো দলে যোগ না দিলেও তাকেই ঠেলে দেওয়া হল সকলের সম্মুখে।
সহকর্মীদের অজ্ঞতা, বিরোধী শক্তিগুলির দুর্বলতা ও গুরুত্বহীনতা, খোলাখুলি নিজের মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারা, আর সর্বপরি একটা চোখ-ধাঁধানো ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সীমাবদ্ধতাই সেই লোকটিকে সামরিক নেতৃপদে উন্নীত করে দিল। যে বাহিনীটিকে ইতালিতে পাঠানো হল তার সৈনিকদের ক্ষুরধার রণকুশলতা, প্রতিপক্ষগুলির যুদ্ধে অনীহা, এবং নিজের শিশুসুলভ ঔদ্ধত্য ও আত্ম-বিশ্বাসই তাকে এনে দিল সামরিক খ্যাতি। সে যেখানে যায় সেখানেই অসংখ্য তথাকথিত সুযোগ যায় তার সঙ্গে। ফ্রান্সের শাসক দলের বিরাগভাজন হওয়াটাও তার ভাগ্যে অনুকূল হয়েই দেখা দেয়। পূর্বনির্দিষ্ট পথগুলি এড়িয়ে চলার চেষ্টাও সফল হল না, রাশিয়ার চাকরিতে তাকে নেওয়া হল না, তুরস্কে চাকরির চেষ্টা ব্যর্থ হল। ইতালির যুদ্ধে বারবার ধ্বংসের একেবারে মুখোমুখি হয়েও প্রতিবারই একান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে সে রক্ষা পেল। যেসব রুশ বাহিনীর হাতে তার সুনাম ও মর্যাদা নষ্ট হতে পারত তারাও নানারকম কূটনৈতিক কারণে তখন মঞ্চে অবতীর্ণ হতে পারল না।
