ঐ সব নিন্দা-তিরস্কারের মূল ভিত্তিটা কি?
মূল ভিত্তি হল : প্রথম আলেক্সান্দারের মতো ইতিহাসের একটি মুখ্য চরিত্র যে মানব-ক্ষমতার একেবারে শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত ছিল, ক্ষমতার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত ষড়যন্ত্র, খোসামোদ ও আত্ম-প্রবঞ্চনার মতো প্রচণ্ড শক্তিগুলি যার উপর অবিরাম প্রভাব বিস্তার করতে সক্রিয় ছিল, ইওরোপে সংঘটিত সমস্ত ঘটনার দায়িত্ব যাকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বহন করতে হত, কোনো কাল্পনিক চরিত্র না হয়ে যে ছিল একটি জীবন্ত চরিত্র, প্রতিটি জীবন্ত মানুষের মতোই সত্য, শিব ও সুন্দরের প্রতি যার ছিল ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুরাগ-পঞ্চাশ বছর আগে (যুদ্ধ ও শান্তি উপন্যাসখানি সমাপ্ত হয়েছিল ১৮৬৯ সালে) মানব-কল্যাণের সেই ধারণা ও তাৎপর্য-বোধ নিশ্চয় তার ছিল না, বর্তমান কালের একজন অধ্যাপক যৌবনকাল থেকে অধ্যয়নকার্যে ব্যাপৃত থেকে-নানা পুঁথি ও বক্তৃতা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যে ধারণা ও তাৎপর্যবোধ গড়ে তুলতে পারে।
কিন্তু একথা যদি ধরেই নেওয়া যায় যে পঞ্চাশ বছর আগে মানব-কল্যাণ সম্পর্কে প্রথম আলেক্সান্দারের ধারাণাটা ভুল ছিল, তাহলে তো অনিবার্যভাবেই এটাও আমাদের ধরে নিতেই হয় যে আজ যে ইতিহাসকার আলেক্সান্দারের বিচার করছে, কালের যাত্রাপথে একদিন তার ধারণাও ভ্রান্ত বলে পরিগণিত হবে। এই অনুমান, আরো স্বাভাবিক ও অনিবার্য এই কারণে যে ইতিহাসের পথ-পরিক্রমার পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই নতুন নতুন লেখকের আবির্ভাবের সঙ্গে মানব-কল্যাণের ধারণাও প্রতি বছরই পরিবর্তিত হয়, ফলে আজ যা ভালো দশ বছর পরে তাই মন্দ বলে পরিগণিত হয়, এবং এর বিপরীতক্রমও সমান সত্য। আরো বড় কথা, ইতিহাসের পথ-পরিক্রমায় কি ভালো আর কি মন্দ তা নিয়ে সমকালীন ইতিহাসকারদের মধ্যেও মতবিরোধের অন্ত নেই, পোল্যান্ডকে নতুন শাসন-অধিকার দান এবং পবিত্র মৈত্রীচুক্তি সম্পাদনের জন্য কেউ বা আলেক্সান্দারকে প্রশংসা করে, আবার কেউ বা নিন্দা করে।
আলেক্সান্দার বা নেপোলিয়নের কার্যাবলিকে দরকারি বা ক্ষতিকর কোনোটাই বলা যায় না, কারণ সেগুলি কেন দরকারি বা ক্ষতিকর সেটা বলাই তো অসম্ভব। সেসব কার্যাবলি যদি কারো অসন্তোষের কারণ হয় তাহলে তো তার একমাত্র কারণ যে কল্যাণ সম্পর্কে তার সীমিত জ্ঞানের সঙ্গে সেগুলো মেলে না। মস্কোতে আমার পৈত্রিক ভবনকে রক্ষা করা, অথবা রুশ বাহিনীর গৌরব, অথবা পিটার্সবুর্গ ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধি, অথবা পোল্যান্ডের মুক্তি, অথবা রাশিয়ার মহত্ত্ব, অথবা ইওরোপের শক্তি-সাম্য অথবা প্রগতি নামধারী ইওরোপিয় কিছু সংস্কৃতি-আমার কাছে ভালো বা খারাপ যাই মনে হোক, একথা তো স্বীকার করতেই হবে যে প্রতিটি ঐতিহাসিক চরিত্রের এসব ছাড়াও এমন কিছু সাধারণ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে যা আমার কাছে অনধিগম্য।
কিন্তু ধরে নেওয়া যাক যে বিজ্ঞান নামক শক্তিটি সব বিরোধের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করে ভালো-মন্দের এমন একটা শাশ্বত মাপকাঠি আমাদের হাতে তুলে দিতে পারে যা দিয়ে ঐতিহাসিক চরিত্র ও ঘটনাবলির বিচার করা যেতে পারে : বলা যাক যে আলেক্সান্দার সবকিছুই অন্যভাবে করতে পারত, বলা যাক–আজকের নিন্দুকরা জাতীয়তা, স্বাধীনতা, সাম্য ও প্রগতির যে কর্মসূচি তাকে দিত সেই অনুসারেই সেসব কাজ করতেও পারত। ধরা যাক, এই কর্মসূচি প্রণয়ন তখন সম্ভব ছিল, এবং আলেক্সান্দার তদনুসারেই সব কাজ করর। কিন্তু তকালীন সরকারি রীতিনীতির যারা বিরোধিতা করেছিল, ইতিহাসকারদের মতে যাদের কাজকর্ম ছিল ভালো ও কল্যাণকর, সেক্ষেত্রে তাদের কি হত? তাদের কাজকর্মের তো কোনো অস্তিত্ব থাকত না : থাকত না জীবনের লক্ষণ, থাকত না কিছুই।
একথা যদি আমরা স্বীকার করি যে মানুষের জীবন বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত, তাহলে তো জীবনের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করা হয়।
.
অধ্যায়-২
যদি ইতিহাসকারদের মতোই ধরে নেওয়া হয় যে মহাপুরুষরাই মানব সমাজকে বিশেষ বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়–যেমন রাশিয়া অথবা ফ্রান্সের মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠা, ইওরোপের সাম্য শক্তি-প্রতিষ্ঠা, বিপ্লবের ভাবধারার প্রচার, সাধারণ অগ্রগতি, বা অণ্য কিছু–তাহলে তা আকস্মিকতা প্রতিভার তত্ত্ব ছাড়া ইতিহাসের ঘটনাবলিকে ব্যাখা করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ঊনিবংশ শতাব্দীর গোড়াতে যেসব ইওরোপিয় যুদ্ধ হয়েছিল তার লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে রাশিয়ার
উচ্চাকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা, তাহলে তো পূর্ববর্তী সব যুদ্ধ ও এই অভিযান ছাড়াই সে লক্ষ্যসাধন করা যেত। আবার ফ্রান্সের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই যদি তার লক্ষ্য হয়ে থাকে তাহলেও তো বিপ্লব ও সাম্রাজ্য ছাড়াই তা পূর্ণ করা যেত। নব ভাবধারার প্রচারই যদি লক্ষ্য হত তাহলে তো যুদ্ধ-বিগ্রহের পরিবর্তে মুদ্রণ-যন্ত্রই সে কাজ আরো ভালোভাবে করতে পারত। সভ্যতার অগ্রগতি যদি লক্ষ্য হত তাহলে তো সহজেই বোঝা যায় যে সম্পত্তি ও মানব জীবনের ধ্বংস সাধন ছাড়াই সভ্যতা বিস্তারের আরো অনেক ভালো পথ আছে।
তাহলে ঘটনাগুলি অন্যভাবে না ঘটে এভাবে ঘটল কেন?
কারণ এটাই প্রকৃত ঘটনা! ইতিহাস বলে, আকস্মিকতা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, আর প্রতিভা সেটাকে কাজে লাগিয়েছিল।
