সে কথা বলেছে? সত্যি কথা বলেছে? সে বারবার প্রশ্ন করল।
একটা আনন্দের অথচ দুঃখের প্রকাশ নাতাশার মুখে স্থির হয়ে রইল, এই আনন্দ টুকুর জন্যও যেন সে ক্ষমা প্রার্থনা করছে।
দরজায় কান পেতে শুনতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু আমি জানতাম তুমি আমাকে বলবে।
নাতাশার এই একাগ্র দৃষ্টির অর্থ প্রিন্সেস মারি বুঝল, তাতে অভিভূতও হল, তবু নাতাশার এই উত্তেজনা তাকে দুঃখ দিল, তার কথাগুলি তাকে ব্যথা দিল। প্রিন্সেস মারির মনে পড়ল দাদার কথা, তার ভালোবাসার কথা।
ভাবল, কিন্তু কি আর করা যাবে? ও তো নিরুপায়।
তারপর বিষণ্ণ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে পিয়েরের সব কথা সে নাতাশাকে বলল। পিয়ের পিটার্সবুর্গ চলে যাচ্ছে শুনে নাতাশা স্তম্ভিত হয়ে গেল।
যেন বুঝতে পারেনি এমনিভাবে বলে উঠল, পিটার্সবুর্গে!
কিন্তু প্রিন্সেস মারির মুখে বেদনার ছায়া লক্ষ্য করে তার এই দুঃখের কারণটি অনুমান করে নাতাশা সহসা কাঁদতে লাগল।
বলল, মারি, তুমিই বলে দাও আমি কি করব! ভয় হচ্ছে আমি বুঝি খারাপ হয়ে যাব। তুমি যা বলবে আমি তাই করব। আমাকে বলে দাও…
তুমি তাকে ভালোবাস?
হ্যাঁ, নাতাশা ফিসফিসিয়ে বলল।
তাহলে কাঁদছ কেন? তোমাকে নিয়ে তো আমিও সুখী, প্রিন্সেস মারি বলল, নাতাশার চোখে জল দেখে তার আনন্দকে সে ক্ষমা করেছে।
এখনই কিছু হচ্ছে না-একদিন হবে। ভাব তো, যখন আমি তার স্ত্রী হব আর তুমি নিকলাসকে বিয়ে করবে তখন কী মজাই না হবে!
নাতাশা, তোমাকে তো বলেছি ওকথা তুলবে না। এস, তোমার কথাই হোক। দুজনই চুপ করে গেল।
কিন্তু পিটার্সবুর্গে যাবে কেন? হঠাৎ প্রশ্ন করে নাতাশা তাড়াতাড়ি নিজেই তার জবাব দিল। কিন্তু না, না, তাকে যেতেই হবে…হ্যাঁ মারি। সে অবশ্যই যাবে…
১৬. পরিশিষ্ট
প্রথম পরিশিষ্ট – অধ্যায়-১
সাত বছর পার হয়ে গেছে। ইওরোপিয় ইতিহাসের ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র তার তটপ্রান্তে স্তিমিত হয়ে এসেছে, মনে হয় বুঝি শান্তই হয়েছে। কিন্তু যেসব রহস্যময় শক্তি (তাদের কর্ম-পদ্ধতির বিধি-বিধান আমাদের কাছে অজ্ঞাত বলেই রহস্যময়) মানব-সমাজকে পরিচালিত করে তাদের কর্ম-ধারা অব্যাহতই রয়েছে।
ইতিহাস-সমুদ্রের উপরিভাগ শান্ত দেখালেও কালের অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখেই মানুষের অগ্রগতির ধারা অবিরাম বয়ে চলেছে। বিভিন্ন মানব-গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে আবার ভেঙে গেছে, নানা রাজ্যের ভাঙা-গড়া ও মানুষের স্থানচ্যুতির উদ্যোগ-আয়োজন চলেছে।
ইতিহাস-সমুদ্রের তরঙ্গাভিঘাত এখন আর আগের মতো এক সৈকত থেকে অপর সৈকতে আছড়ে পড়ছে না, গভীর তলদেশে টগবগ করে ফুটছে। ইতিহাসের বিখ্যাত প্রতিভূরা এখন আর ঢেউয়ের টানে এক তীর থেকে অপর তীরে চলে যাচ্ছে না। মনে হয় এখন তারা একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সেনাদলের প্রধান হিসেবে ইতিহাসের যেসব নায়ক একদা যুদ্ধ, অভিযান ও লড়াইয়ে জনগণের গতিবিধিকে পরিচালিত করত তারাই এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘবদ্ধতা, বিধি-বিধান ও সন্ধির সাহায্যে জনগণের অশান্ত গতিকে নিয়ন্ত্রিত করছে।
ইতিহাসের পর্যালোচনাকালে তারা ইতিহাসের নায়কদের তীব্র সমালোচনা করে থাকে, তাদের মতে তারা প্রতিক্রিয়াপন্থী। আলেক্সান্দার ও নেপোলিয়ন থেকে আরম্ভ করে মাদাম দ্য স্তায়েল, ফোটিয়াস, শেলিং, ফিকটে, চাম্ৰায়া ও অন্য যারাই তাদের সমালোচনার শিকার হয়েছে, তাদের কঠোর বিচারে তারাই হয় প্রগতিবাদী হিসেবে মুক্তি পেয়েছে, আর না হয় তো প্রতিক্রিয়াপন্থীরূপে দণ্ডিত হয়েছে।
তাদের বিবরণ অনুসারে সেই সময়ে রাশিয়াতেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছেন, তার প্রধান অপরাধী ছিল প্রথম আলেক্সান্দার, অথচ সেই লোকই তাদের মতেই তার রাজত্বকালের শুরুতে ছিল রাশিয়ার রক্ষাকর্তা এবং উদারনৈতিক আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা।
আজকের রুশ সাহিত্যে স্কুলের ছাত্র থেকে আরম্ভ করে পণ্ডিত ইতিহাসকারদের মধ্যে এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না যে নিজ রাজত্বকালে আলেক্সান্দার যেসব ভুল করেছিল তার জন্য তাকে লক্ষ্য করে একটা ছোট পাথরও ছুঁড়ে মারে না।
তার উচিত ছিল এইভাবে এবং ওভাবে কাজ করা। এক্ষেত্রে তিনি ঠিক কাজই করেছেন, কিন্তু ওক্ষেত্রে করেছেন ভুল। রাজত্বের গোড়ার দিকে এবং ১৮১২ সালে তিনি আশ্চর্য রকমের ভালো কাজ করেছেন, কিন্তু পোল্যান্ডকে নতুন শাসনতন্ত্র দিয়ে, পবিত্র মৈত্রীচুক্তি স্থাপন করে আরাকচিভের হাতে ক্ষমতা দিয়ে, গোলিৎসিনকে ও মরমীয়াবাদকে সমর্থন করে এবং পরবর্তীকালে শিশকভ ও ফোটিয়াসকে অনুগ্রহ দেখিয়ে খুব খারাপ কাজ করেছেন। সক্রিয় সেনাদলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে এবং সেমেনভ রেজিমেন্টকে ভেঙে দিয়েও তিনি ভুল করেছেন।
মানবজাতির কিসে কল্যাণ হয় সে সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের ভিত্তিতে ইতিহাসকাররা তার উদ্দেশ্যে যত নিন্দা বাক্য উচ্চারণ করেছে তা লিপিবদ্ধ করতে হলে ডজনখানেক পৃষ্ঠার দরকার হবে।
এইসব নিন্দা-তিরস্কারের অর্থ কি?
প্রথম আলেক্সান্দারের রাজত্বের গোড়ার দিকে তার উদারনৈতিক প্রয়াস, নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ, ১৮১২ সালে ও ১৮১৩ সালের অভিযানে তার দৃঢ়তা প্রভৃতি তার যেসব কাজের জন্য ইতিহাসকাররা তার প্রশংসা করে থাকে সেসবই কি ঐ একই উৎস থেকে প্রবাহিত নয় : তার জন্ম, শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবনযাত্রার যে পরিবেশে তার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল এবং যা থেকে সেইসব কাজগুলিও উৎসারিত হয়েছিল যার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে (যেমন পবিত্র মৈত্রীচুক্তি, পোল্যান্ড প্রতার্পণ, ১৮২০ ও তার পরবর্তীকালের প্রতিক্রিয়া)-সে সবকিছুরই উৎস কি এক নয়?
