এই একটি মাত্র সন্দেহ প্রায়ই পিয়েরকে বিপন্ন করে তোলে। সে এখন কোনো পরিকল্পনা করে না। আসন্ন সুখটা তার কাছে এতই ধারণার অতীত বলে মনে হয় যেন সেটা পেলেই সবকিছুর অবসান ঘটবে। তার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছুর অবসান। একটা অপ্রত্যাশিত আনন্দের বিকার তাকে পেয়ে বসেছে। তার মনে হচ্ছে, তার ভালোবাসা এবং নাতাশার ভালোবাসা পাবার সম্ভাবনা–এই দুইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে জীবনের অর্থ–শুধু তার নয়, সমগ্র জগতের। কখনো কখনো তার মনে হয়, সকলেই যেন তার ভবিষ্যৎ সুখ নিয়েই মত্ত হয়ে আছে। আবার কখনো মনে হয়, অন্য সকলেই তার মতো সুখী, শুধু অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার ভান করে সে সুখকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করে। প্রতিটি কথায় ও ভঙ্গিতে তার নিজের সুখের উল্লেখই সে দেখতে পায়।
যখন তাকে বলা হত যে তার সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়া উচিত, অথবা যখন যুদ্ধ বা অন্য কোনো রাজনীতির বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হত যে এইসব ঘটনার ফলাফলের উপরেই সকলের কল্যাণ নির্ভর করছে, তখন সে করুণার হাসি হেসে সেসব কথা শুনত, আর বিচিত্র সব মন্তব্য করে সকলকে অবাক করে দিত। কিন্তু এখন যারা জীবনের অর্থ বোঝে বলে সে মনে করে এবং সে দুর্ভাগারা তা বোঝে না তাদের প্রত্যেককেই সে দেখে নিজ অন্তরের আবেগের উজ্জ্বল আলোয়, আর সঙ্গে সঙ্গে অতি সহজে প্রত্যেকের মধ্যেই সে দেখতে পায় যা কিছু ভালো, যা কিছু ভালোবাসার যোগ্য।
মৃতা স্ত্রীর ব্যাপার ও কাগজপত্র নিয়ে আলোচনার সময় তা তার স্মৃতি পিয়েরের মনে একমাত্র করুণা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি জাগায় না–আজ সে যে আনন্দের স্বাদ পেয়েছে তার সন্ধান সে বেচারি জানত না বলেই তার জন্য পিয়েরের করুণা হয়। প্রিন্স ভাসিলি ইতিমধ্যে নতুন পদমর্যাদা পেয়েছে, কয়েকটা নতুন সম্মান-পদকও লাভ করেছে, তাই এখন সে বেশ গর্বিত, অথচ পিয়েরের চোখে সেই শোচনীয় সদয় বৃদ্ধটি একান্ত করুণার পাত্র।
পরবর্তী জীবনে এই সময়কার সুখময় উন্মত্ততার কথা প্রায়ই পিয়েরের মনে পড়ত। এইসময় নানা মানুষ ও ঘটনার যে অর্থ তার মনে গড়ে উঠেছিল তা চিরদিন তার কাছে সত্য হয়েই ছিল। পরবর্তীকালে সে সব ধারণাকে সে পরিত্যাগ তো করেইনি, বরং যখনই মনে কোনো সন্দেহ বা বিরোধ দেখা দিত তখনই সে এই উন্মাদনার সময়কার মতামত দিয়ে তার বিচার করত, আর সব সময় পূর্বেকার সিদ্ধান্তগুলিই সঠিক প্রমাণিত হত।
যে ভাবত, তখন আমাকে হয়ত বিচিত্র ও অদ্ভুত মনে হত, কিন্তু আমাকে যতটা পাগল বলে মনে হত আমি ততটা পাগল ছিলাম না। বরং অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় তখনই আমি ছিলাম বিজ্ঞতর, আমার অন্তর্দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণতর, এবং জীবনে যা কিছু জানার যোগ্য সবই জেনেছিলাম, কারণ…কারণ তখন আমি সুখী ছিলাম।
মানুষকে ভালোবাসার আগেই তাদের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে–যাকে সে বলত সৎ গুণাবলি–আবিষ্কার করার ব্যাপারে সে যে অপেক্ষা করে থাকত না এটাই ছিল পিয়েরের পাগলামি, এখন তার অন্তর ভালোবাসায় দু-কূল ছাপিয়ে গেছে, আর অকারণে মানুষকে ভালোবেসে তাদের ভালোবাসার সন্দেহাতীত কারণগুলি সে খুঁজে পেয়েছে।
.
অধ্যায়-২০
সেই প্রথম সন্ধ্যায় নাতাশা যখন সানন্দ তামাশার সুরে প্রিন্সেস মারিকে পিয়ের সম্পর্কে বলেছিল, ওকে দেখে মনে হচ্ছে বুঝি এই মাত্র রুশ বাথ থেকে বেরিয়ে এসেছেন-পরনে একটা খাটো কোট, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, তখন পিয়ের চলে যাবার পরে নাতাশার অন্তরের মধ্যে জেগে উঠেছিল অজ্ঞাতপূর্ব ও লুকনো এমন কিছু যাকে কিছুতেই চেপে রাখা যায় না।
তার মুখ, হাঁটা-চলা, চাউনি, কণ্ঠস্বর, সবকিছু সহসা বদলে গেল। সবিস্ময়ে সে অনুভব করল, একটা জীবনী-শক্তি ও সুখের আশা জেগে উঠে প্রকাশের পথ খুঁজছে। সেই সন্ধ্যা থেকেই অতীত জীবনের সবকিছু যেন সে ভুলে গেল। জীবনের অবস্থা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই, অতীত সম্পর্কে একটি কথাও বলে না, ভবিষ্যতের কোনো সুখের পরিকল্পনা করতেও আর ভয় পায় না। পিয়ের সম্পর্কে অতি সামান্য কথাই বলে, কিন্তু প্রিন্সেস মারি যখন তার কথা উল্লেখ করে তখনই একটা দীর্ঘ-নির্বাপিত আলো জ্বলে ওঠে তার চোখে, ঠোঁট দুটি বেঁকে যায় একটি বিচিত্র হাসিতে।
নাতাশার এই পরিবর্তন দেখে প্রথম প্রথম প্রিন্সেস মারি বিস্মিত হত: কিন্তু পরে তার অর্থ বুঝতে পেরে সে দুঃখ পায়। এই পরিবর্তনের কথা মনে এলেই সে ভাবে : তাহলে কি আমার দাদার প্রতি তার ভালোবাসা এতই সামান্য ছিল যে এত শীঘ্রই তাকে ভুলে গেল? কিন্তু নাতাশা কাছে এলে সে মোটেই বিরক্ত হয় না, কোনোরকম অনুযোগও করে না। জীবনের যে নবজাগ্রত শক্তি নাতাশাকে গ্রাস করেছে সেটা তার কাছে এতই অপ্রতিরোধ্য ও অপ্রত্যাশিত যে তার উপস্থিতিতে প্রিন্সেস মারিও অনুভব করে যে অন্তর থেকে নাতাশাকে তিরস্কার করার কোনো অধিকারই তার নেই।
এত পরিপূর্ণ ও খোলাখুলিভাবে এই নতুন অনুভূতির কাছে নাতাশা নিজেকে সঁপে দিয়েছে যে তার যে আর কোনো দুঃখ নেই, তার অন্তর যে এখন আনন্দে উজ্জ্বল এ সত্যকে লুকোবার কোনো চেষ্টাই সে করে না।
পিয়েরের সঙ্গে নৈশ আলোচনা শেষ করে প্রিন্সেস মারি যখন নিজের ঘরে ফিরে গেল তখন দরজার মুখেরই তার সঙ্গে নাতাশার দেখা হয়ে গেল।
