বুড়ো লোকটি ছেলের হাত চেপে ধরে সজোরে মাথা নেড়ে বলে উঠল, বাজে কথা, বাজে কথা! তোমার স্ত্রীর বাড়ি ঠিক করাই আছে। প্রিন্সেস মারি তাকে সেখানে নিয়ে সব বুঝিয়ে দেবে। তারা তো এক কথার জায়গায় দশ কথা বলবে। মেয়েদের স্বভাবই তাই। সে আসায় আমি খুশি হয়েছি। বসে কথা বল। মাইকেলসেনের বাহিনীকে আমি বুঝতে পারি, তলস্তয়কেও বুঝি…যুগপৎ অভিযান…কিন্তু দক্ষিণী বাহিনী কি করবে? প্রাশিয়া নিরপেক্ষ…সেটা আমি জানি। অস্ট্রিয়ার ব্যাপারটা কী? চেয়ার থেকে উঠে বুড়ো ঘরময় পায়চারি করতে লাগল, আর তিখন যখন সে পোশাকটা তার দরকার সেটা হাতে তুলে দিতে তার পিছন পিছন দৌড়তে লাগল। সুইডেনেরই বা খবর কী? তারা পোমেরানিয়া পার হবে কেমন করে? …. বাবা শুনতেই চাইছে দেখে প্রিন্স আন্দ্রু প্রথমে অনিচ্ছাসত্ত্বেই আসন্ন অভিযানের কার্যক্রম বোঝাতে শুরু করল; কিন্তু ক্রমেই তার আগ্রহ বাড়তে লাগল এবং অভ্যাসবশতই নিজের অজ্ঞাতসারেই রাশিয়া থেকে ফ্রান্সের কথায় চলে গেল। সে বোঝাতে লাগল, নব্বই হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রাশিয়াকে এমন ভয় দেখাবে যে, সে নিরপেক্ষতা ভেঙে বেরিয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হবে; সেই বিরাট বাহিনীর একটা অংশ স্ট্রালসুন্ডে সুইডিশ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবে; এক লক্ষ রুশ সৈন্যসহ দুলক্ষ বিশ হাজার অস্ট্রিয় সৈন্য ইতালিতে ও রাইন নদীর তীরে সমবেত হবে; পঞ্চাশ হাজার রুশ ও সমসংখ্যক ইংরেজ সৈন্য নেপলসে নামবে; এবং মোট পাঁচ লক্ষ সৈন্য বিভিন্ন দিক থেকে ফরাসি বাহিনীকে আক্রমণ করবে। বুড়ো প্রিন্স কিন্তু এই সব বিবরণে তিলমাত্রও উৎসাহ দেখাল না; বরং যেন কিছুই শুনছে না এমনিভাবে হাঁটতে হাঁটতেই পোশাক পরতে লাগল এবং অপ্রত্যাশিতভাবে তিন তিনবার কথার মাঝখানে বাধার সৃষ্টি করল। একবার চেঁচিয়ে বলল : সাদা পোশাকটা, সাদা পোশাকটা!
তার মানে যে ওয়েস্টকোটটা সে চাইছিল তিখন সেটা তার হাতে দেয় নি। আর একবার ছেলের কথায় বাদা দিয়ে সে বলল : শীঘ্রই তাকে সূতিকাঘরে যেতে হবে। তিরস্কারের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল : এটা খারাপ! বলে যাও, বলে যাও।
প্রিন্স আন্দ্রু তার বক্তব্য প্রায় শেষ করে এনেছে এমন সময় এল তৃতীয় বাধা। বুড়ো বয়সের ভাঙা গলায় বুড়ো গেয়ে উঠল : মার্লবরো যুদ্ধে চলিলেন; ঈশ্বরই জানেন তিনি কবে ফিরিবেন। (একটি পরিচিত ফরাসি গান।)
ছেলে শুধু হাসল।
বলল, এ রণকৌশল যে আমি সমর্থন করি তা বলছি না। আমি শুধু সত্য কথাটা বলছি। এতদিনে নেপোলিয়নও নিশ্চয় একটা রণকৌশল তৈরি করেছে, আর সেটা এর চাইতে খারাপও হবে না।
দেখ, তুমি নতুন কথা কিছু বল নি, এই কথা বলেই বুড়ো গরগর করে আওড়াতে লাগল : Deiu sait Quand rivicndra. এবার খাবার ঘরে চলে যাও।
*
অধ্যায়-২৭
দাড়ি কামিয়ে পাউডার মেখে প্রিন্স নির্দিষ্ট সময়ে খাবার ঘরে ঢুকল। তার পুত্রবধূ প্রিন্সেস মারি ও মাদময়জেল বুরিয়ে তার জন্যই সেখানে অপেক্ষা করছিল; বুড়োর স্থপতিও তাদের সঙ্গেই ছিল; এই নগণ্য লোকটির পক্ষে এ সম্মান আশা করারই কথা নয়, তবু মালিকের একটা অদ্ভুত খেয়ালের ফলে এই টেবিলে তার স্থান হয়েছে। প্রিন্স সাধারণতই সামাজিক মর্যাদাকে কঠোরভাবে মেনে চলে এবং বড় বড় সরকারি কর্মচারীকে পর্যন্ত তার টেবিলে আমন্ত্রণ করে না; অথচ একান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে সে মাইকেল আইভানভিচকে (চৌখুপি-কাটা রুমালটায় নাক ঝাড়বার জন্য লোকটি প্রতিবারই ঘরের একেবারে এক কোণে চলে যাচ্ছে) এই টেবিলে ডেকেছে। সে এই কথাই বোঝাতে চায় যে সব মানুষই সমান, আর অনেকবারই মেয়েকে বোঝাতে চেয়েছে যে মাইকেল আইভানভিচ তোমার বা আমার চাইতে একতিলও ছোট নয়। খেতে বসে প্রিন্স সাধারণত অন্য অনেক লোক অপেক্ষা স্বল্পভাষী মাইকেল আইনভানভিচের সঙ্গেই বেশি কথা বলে থাকে।
এ-বাড়ির অন্য সব ঘরের মতোই খাবার ঘরটাও খুব উঁচু। বাড়ির লোকজন এবং পরিচারকরা প্রত্যেকে এক একটি চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে প্রিন্সের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল। তোয়ালে-কাঁধে খানসামা টেবিল সাজানোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, পরিচারকদের ইশারা করছে, এবং যে দরজা দিয়ে প্রিন্স ঢুকবে একবার সেদিকে আর একবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। বলকনস্কি জমিদার-পরিবারের বংশলতিকাসম্বলিত মস্তবড় একটা গিল্টি-করা ফ্রেমের দিকে তাকিয়ে আছে প্রিন্স আন্দ্রু; এ জিনিসটি তার কাছে নতুন। তার বিপরীত দিকে আর একটি অনুরূপ ফ্রেম ঝুলছে; তাতে আঁকা রয়েছে মুকুটধারী কোনো প্রিন্সের একটি অত্যন্ত বাজেভাবে আঁকা প্রতিকৃতি (সম্ভবত জমিদারিরই পোষ্য কোনো চিত্রকরের হাতে আঁকা); জানা যায়, এই প্রিন্সটি রুরিক বংশাবতংশ এবং বলকনস্কি পরিবারের পূর্বপুরুষ। বংশলতিকার দিকে আর একবার তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু মাথা নেড়ে হাসতে লাগল; মূল মানুষটির সঙ্গে প্রতিকৃতির সাদৃশ্যটা হাস্যকর মনে হলে যে ভাবে কোনো মানুষ হাসে ঠিক সেই ভাবে।
প্রিন্সেস মারিকে পাশে দেখে তাকে বলল, ছবিটা পুরোপুরি ঠিক তার মতো!
প্রিন্সেস মারি অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল। তার হাসির কারণ সে কিছুই বুঝতে পারল না। বাবার সব কাজকেই সে শ্রদ্ধার চোখে দেখে; মনে কোনো প্রশ্ন রাখে না।
