তার দৃষ্টির জবাবেই যেন বলতে লাগল, হ্যাঁ, আপনাকে বলতেই চাইছিলাম। প্রিন্সেস, আপনি আমাকে সাহায্য করুন! আমি কি করব? আমি কি আশা করতে পারি? প্রিন্সেস, প্রিয় বান্ধবী আমার, শুনুন! আমি সব কথা জানি। আমি জানি আমি তার যোগ্য নই, জানি এখন এসব কথা বলা অসম্ভব। কিন্তু আমি তার দাদা হতে চাই। না, তা নয়, আমি চাই না, আমি পারি না…..
কথা থামিয়ে সে দুহাতে মুখ ও চোখ ঘষতে লাগল।
চেষ্টা করে নিজেকে সংযত করে সে আবার বলল, দেখুন, কখন যে ওকে ভালোবেসে ফেলেছি তা আমি জানি না, কিন্তু সারাজীবন আমি ওকেই ভালোবেসেছি, একমাত্র ওকে ওকে এত ভালোবেসেছি যে ওকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না। বর্তমানে তার কাছে আমি বিয়ের প্রস্তাব করতে পারি না, কিন্তু হয় তো একদিন সে আমার স্ত্রী হতে পারে এবং আমি হয় তো সে সম্ভাবনাকে….সে সম্ভাবনাকে….হারিয়ে ফেলতে পারি, এই চিন্তাই আমার কাছে মর্মান্তিক। বলুন, আমি কি আশা করতে পারি? প্রিয় প্রিন্সেস, বলুন আমি কি করব! কোনো জবাব না পেয়ে পিয়ের তার হাতটা স্পর্শ করল।
প্রিন্সেস মারি জবাব দিল, আপনি যা বললেন সেই কথাটাই আমি ভাবছি। আমার বক্তব্য শুনুন। আপনি ঠিকই বলেছেন যে এসময় তার কাছে ভালোবাসার কথা বলা….
প্রিন্সেস মারি থামল। সে বলতে যাচ্ছিল যে তার কাছে ভালোবাসার কথা বলা অসম্ভব, কিন্তু সে থেমে গেল কারণ দুদিন আগে নাতাশার আকস্মিক পরিবর্তন দেখে সে বুঝেছে যে পিয়ের যদি তাকে ভালোবাসার কথা বলে তাহলে সে আঘাত তো পাবেই না, বরং সেই জিনিসটিই সে এখন চাইছে।
তবু প্রিন্সেস বলল, এখন সেকথা বললে কিছু হবে না।
কিন্তু আমি কি করব?
সেটা আমার উপর ছেড়ে দিন, প্রিন্সেস মারি বলল। আমি জানি…
পিয়ের প্রিন্সেস মারির চোখের দিকেই তাকিয়েছিল।
বলল, তারপর?….তারপর?
কথাগুলি প্রিন্সেস মারির মুখ থেকে বের হবার আগেই পিয়ের লাফিয়ে উঠল, ভয়ার্ত মুখে তার হাতটা চেপে ধরল।
কিসের থেকে আপনি একথা ভাবছেন? আপনি মনে করেন যে আমি আশা করতে পারি? আপনি…মানে,
প্রিন্সেস মারি হেসে বলল, হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। ওর বাবা-মার কাছে চিঠি লিখুন, আর ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দিন। সুবিধামতো আমি ওকে বলব। আমিও চাই এটা ঘটুক। আমার মন বলছে এটা ঘটবে।
না, এ হতে পারে না আমি কত সুখী! কিন্তু এ হতে পারে না…আমি কত সুখী! এ হতে পারে না! প্রিন্সেস মারির হাতে চুমো খেয়ে পিয়ের বারবার বলতে লাগল।
প্রিন্সেস মারি বলল, আপনি পিটার্সবুর্গ চলে যান। সেটাই সবচাইতে ভালো হবে। আমি আপনাকে লিখব।
পিটার্সবুর্গে? চলে যাব? বেশ, তাই যাব। কিন্তু কাল আবার আসতে পারি তো?
পরদিন পিয়ের বিদায় নিতে এল। আজ নাতাশা আগের দিনের মতো ততটা প্রাণ-চঞ্চল নয়, কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে পিয়রের মনে হল সে বুঝি নিজেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে, যেন তাদের কারো কোনো অস্তিত্ব নেই, একমাত্র সুখ ছাড়া আর কিছু নেই। প্রতিটি চাউনি,প্রতিটি ভঙ্গি, প্রতিটি কথা তার অন্তরকে আনন্দে ভরে তুলল, নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল, এও কি সম্ভব? না, এ হতে পারে না।
বিদায় নেবার সময় নাতাশার শীর্ণ নরম হাতখানি ধরে বেশ কিছু সময় নিজের হাতের মধ্যে না রেখে সে পারল না।
এও কি সম্ভব যে এই হাত, ওই দুটি চোখ, নারীর সৌন্দর্যের এই রত্নভাণ্ডার যা আজ আমার কাছে এত অপরিচিত তাই একদিন চিরদিনের মতো আমার হবে, আমার নিজের মতোই একান্ত পরিচিত হবে?… না, সে অসম্ভব.?
বিদায় কাউন্ট, কথাটা উঁচু গলায় বলে তারপর ফিসফিস করে নাতাশা বলল, আপনার ফিরে আসার জন্য আমি উৎকণ্ঠ হয়ে অপেক্ষা করে থাকব।
আর এই কয়েকটি সহজ কথা, তার চাউনি, তার মুখের ভাব–সবই দুটি মাস ধরে পিয়েরের কাছে হয়ে রইল অক্ষয় স্মৃতি, ব্যাখ্যা ও সুখ-চিন্তার বিষয়। আপনার ফিরে আসার জন্য আমি উত্তষ্ঠ হয়ে অপেক্ষা করে থাকব…হাঁ, হ্যাঁ, কেমন করেই না সে কথাগুলি বলল? হ্যাঁ, আপনার ফিরে আসার জন্য আমি উত্তপ্ত হয়ে অপেক্ষা করে থাকব। আহা, আমি আজ কত সুখী! আমার ভাগ্যে কি ঘটছে? আমি কত সুখী! পিয়ের আপন মনেই বলতে লাগল।
.
অধ্যায়-১৯
হেলেনের সঙ্গে পূর্বরাগের সময় যা কিছু পিয়েরকে বিপন্ন করে তুলেছিল তার কিছুই এখন পিয়েরের অন্তরে নেই। একটা লজ্জাবোধ থেকে তাকে কখনো একবার বলা কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করতে হয়নি, অথবা বলতে হয়নি, আহা, ও কথাটা কেন বললাম না? অথবা কেনই বা আমাকে বলতে হল fe vous aime? উল্টে সে বা নাতাশা যা বলেছে তার প্রতিটি কথা সে এখন কল্পনায় পুনরাবৃত্তি করে, নাতাশার মুখ ও তার হাসির প্রতিটি ছবি মনে মনে নতুন করে আঁকে, কিছুই বাদ দিতে বা যোগ করতে চায় না, শুধুই বারবার তার পুনরাবৃত্তি করে। যেপথে থেকেছে সেটা ঠিক কি ভুল সে বিষয়ে সন্দেহের ছায়ামাত্র এখন তার মনে নেই। শুধু মাঝে মাঝে একটা ভয়ংকর সন্দেহ তার মনের মধ্যে উঁকি দেয় : এইসব স্বপ্ন নয় তো? প্রিন্সেস মারি ভুল করেনি তো? আমি নিজেই বড় বেশি অহংকারী বা আত্মবিশ্বাসী নই তো? আমি এসবই বিশ্বাস করছি, আর হঠাৎ একদিন প্রিন্সেস মারি তাকে কথাটা বলবে আর সে হেসে বলবে : কি আশ্চর্য! তিনি নিশ্চয় নিজেকে ভুল বুঝিয়েছেন। তিনি কি জানেন না যে তিনি একজন পুরুষ মানুষ, শুধুই মানুষ, আর আমি…? আমি তো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও মহত্তর কিছু।
