প্রাতরাশের সময় পিয়ের তার দিদি প্রিন্সেসকে বলল যে আগের দিন সে প্রিন্সেস মারির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, আর সেখানেই দেখা হয়েছিল- কার সঙ্গে বল তো? নাতাশা রস্তভার সঙ্গে?
তার সঙ্গে যদি আন্না সেমেনভনার দেখা হত তার চাইতে এটা অসাধারণ কি যে হল সেকথা প্রিন্সেস বুঝতেই পারল না।
তুমি তাকে চেন? পিয়ের শুধাল।
সেসময় তার সেই ব্যাপারটার কথা শুনেছিলাম। খুবই দুঃখের কথা।
পিয়ের ভাবল, না, এ হয় কিছু জানে না, আর নয়তো না জানার ভান করছে। একে কোনো কথা না বলাই ভালো।
প্রিন্সেসও পিয়েরের যাত্রার জন্য খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করেছিল।
পিয়ের ভাবল, এরা সকলেই কত সদয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যে সব বিষয়ের প্রতি এখন আর তাদের কোনো আগ্রহ থাকতে পারে না তা নিয়ে এরা মাথা ঘামাচ্ছে কেমন করে।
সেইদিনই পুলিশের বড় কর্তা এসে পিয়েরকে জানিয়ে গেল, যেসব মাল উদ্ধার করা হয়েছে সেইদিনই ক্রেমলিন প্রাসাদ থেকে সেগুলি মালিকদের ফেরৎ দেওয়া হবে, কাজেই সে যেন মাল আনতে একজন প্রতিনিধিকে সেখানে পাঠিয়ে দেয়। পুলিশের বড় কর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে পিয়ের ভাবল, আর এই লোকটিও। অফিসারটি কত ভালো, কী সুন্দর দেখতে, আর কত সদয়! লোকটি যে এই তুচ্ছ জিনিস নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছে সেকথা ভাবা যায়! অথচ লোকে বলে লোকটি সৎ নয়, ঘুষ খায়। যত সব বাজে কথা। তাছাড়া ঘুষ খাবে না কেন? এইভাবেই তো সে মানুষ হয়েছে, আর একাজ তো সকলেই করে। কিন্তু কি সদয় ও খুশি মাখানো মুখ, আর আমার দিকে তাকিয়ে কেমন হাসছে।
পিয়ের প্রিন্সেস মারির বাড়ি গেল ডিনার খেতে।
পোড়া বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে সেই ধ্বংসস্তূপের সৌন্দর্য দেখে সে বিস্মিত হল। শহরের পোড়া বাড়িগুলোর চিমনির তূপ আর ভেঙেপড়া দেয়ালের বহুদূর প্রসারিত মনোরম সৌন্দর্য দেখে তার মনে পড়ে গেল রাইনের কথা, রোমের কলসিয়ামের কথা। পথে যেসব কোচয়ান ও তার সওয়ারিদের সঙ্গে দেখা হল, যে ছুতোর মিস্ত্রিরা নতুন বাড়ি তৈরি করার জন্য কুড ল দিয়ে কাঠ কাটছে, ফেরিওয়ালী ও দোকানিরা–সকলেই যেন সানন্দ উজ্জ্বল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলছে, আহা! এই তো তিনি এসেছেন! দেখা যাক এবার কি হয়!
প্রিন্সেস মারির বাড়ির ফটকে পৌঁছে পিয়েরের মনে সন্দেহ জাগল, সত্যি কি সে কাল রাতে এখানে এসেছিল, সত্যি কি নাতাশার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, তার সঙ্গে কথা বলেছিল। হয় তো সবই আমার কল্পনা, হয়তো ভিতরে ঢুকে দেখব তারা কেউ নেই। কিন্তু ঘরে ঢোকা মাত্রই সমগ্র সত্তা দিয়ে সে নাতাশার উপস্থিতিকে অনুভব করল, নিজের সব স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলল। আগের দিনের মতোই সেই কালো পোশাক তার পরনে, সেই একইভাবে চুল বাঁধা, তবু সে আজ কত আলাদা। আগের দিন ঘরে ঢুকেও তাকে যদি এইরূপেই দেখত তাহলেও পিয়ের মুহূর্তের জন্য তাকে চিনতে ভুল করত না।
শৈশবে এবং পরে প্রিন্স আন্দ্রুর বাগদত্তা হিসেবে সে তাকে যেরূপে চিনত নাতাশা এখন সেইরূপেই উপস্থিত। তার দু চোখে একটা জিজ্ঞাসু আলোর ঝিলিক,তার মুখে বন্ধুত্বপূর্ণ ও বিচিত্র দুষ্টুমি ভরা ভাব।
পিয়ের তাদের সঙ্গে ডিনার খেল, হয়তো সারাটা সন্ধ্যা তাদের সঙ্গেই কাটাত, কিন্তু প্রিন্সেস মারি সান্ধ্য উপাসনায় যোগ দিতে যাবে বলে তার সঙ্গেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
পরদিন সে সকাল-সকাল এল, ডিনার খেল, সারা সন্ধ্যা সেখানে কাটাল। যদিও অতিথিকে পেয়ে প্রিন্সেস মারি ও নাতাশা দুজনই খুশি, যদিও পিয়েরের সব আগ্রহ এখন এই বাড়িটাতে কেন্দ্রীভূত, সন্ধ্যা নাগাদ তাদের সব কথাই বলা হয়ে গেল, আলোচনা ক্রমেই একটা তুচ্ছ বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যেতে লাগল এবং বার বার ভেঙে যেতে লাগল। পিয়ের এত বেশি সময় সেখানে থাকল যে প্রিন্সেস মারি ও নাতাশার মধ্যে দৃষ্টি-বিনিময় শুরু হয়ে গেল, যেন তারা ভাবছে লোকটি কখন উঠবে। পিয়ের সেটা লক্ষ্য করেও চলে যেতে পারল না। সেও অস্বস্তি বোধ করল, বিব্রত হল, কিন্তু তবু বসেই রইল, কারণ উঠে বিদায় নেবার শক্তি তার নেই।
প্রিন্সেস মারি যখন বুঝল যে এ বসে থাকার কোনো শেষ নেই তখন সেই প্রথমে উঠে দাঁড়াল, এবং মাথা ধরার কথা বলে শুভরাত্রি জানাল।
শুধাল, তাহলে আপনি তো কালই পিটার্সবুর্গ যাচ্ছেন?
যেন কিছুটা আহত হয়েছে এমনি বিস্মিত গলায় পিয়ের তাড়াতাড়ি জবাব দিল, না, আমি যাচ্ছি না। হ্যাঁ…না…. পিটার্সবুর্গ তো? কাল–কিন্তু এখনই শুভরাত্রি জানাচ্ছি না। আপনাদের যদি কোনো দরকার থাকে তো আবার একবার আসব। প্রিন্সেস মারির সামনে দাঁড়িয়ে মুখ লাল করে সে কথাগুলি বলল, কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল না।
নাতাশা হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। প্রিন্সেস মারি কিন্তু বেরিয়ে গেল না, একটা হাতল-চেয়ারে বসে গভীর উজ্জ্বল চোখে কঠোর একাগ্রদৃষ্টিতে পিয়েরের দিকে তাকাল। যে ক্লান্তি দেখা দিয়েছিল তার মুখে সেটা এখন সম্পূর্ণ চলে গেছে। একটা গভীর টানা নিঃশ্বাস ছেড়ে সে যেন দীর্ঘ আলোচনার জন্য প্রস্তুত হল।
নাতাশা ঘর থেকে চলে যেতেই পিয়েরের বিব্রত ভাবটা চলে গেল, সেখানে দেখা দিল অধীর উত্তেজনা। তাড়াতাড়ি একটা হাতল-চেয়ার প্রিন্সেস মারির কাছে টেনে নিল।
