পিয়ের একাগ্রদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
নাতাশা বলল, হ্যাঁ, তার বেশি কিছু না।
একথা সত্যি নয়, সত্যি নয়! পিয়ের চিৎকার করে বলল। আমি যে বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে চাই সেটা তো আমার দোষ নয়-আপনারও নয়।
হঠাৎ নাতাশা মাথা নিচু করে দু-হাতে মুখটা ঢেকে কাঁদতে লাগল।
কি হল নাতাশা? প্রিন্সেস মারি বলল।
কিছু না, কিছু না। চোখের জলের ভিতর দিয়ে নাতাশা পিয়েরের দিকে তাকিয়ে হাসল। শুভরাত্রি শুতে যাবার সময় হয়েছে।
পিয়ের উঠে বিদায় নিল।
প্রিন্সেস মারি ও নাতাশার সঙ্গে যথারীতি শোবার ঘরেই দেখা হল। পিয়েরের কথা নিয়েই তারা আলোচনা করল। পিয়ের সম্পর্কে প্রিন্সেস মারি কোনো মতামত ব্যক্ত করল না, নাতাশাও তার সম্পর্কে কিছু বলল না।
নাতাশা বলল, আচ্ছা, শুভরাত্রি মারি। তুমি কি জান, আমার প্রায়ই ভয় হয়, তার সম্পর্কে (অর্থাৎ পিয়েরের কথা) এভাবে কোনো কথা না বললে আমরা তাকে ভুলেই যাব!
যেন নাতাশার কথার সমর্থনেই প্রিন্সেস মারি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল,কিন্তু মুখে সেকথা জানাল না। বলল, ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? আজ সব কথা বলতে পেরে আমার এত ভালো লাগছে। কথাগুলি বলা শক্ত, বলতে কষ্টও হয়, তবু বলা ভালো। খুব ভালো! নাতাশা বলল। আমি নিশ্চিত জানি সে আমাকে ভালোবাসত। তাই তো সব তাকে বললাম।…ঠিক করিনি? সহসা সে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
পিয়েরকে সব কথা বলা? নিশ্চয়। কী চমৎকার লোক। প্রিন্সেস মারি বলল।
নাতাশার ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল। অনেকদিন তার মুখে এমন হাসি প্রিন্সেস মারি দেখেনি। হঠাৎনাতাশা বলে উঠল, তুমি কি জান মারি, যে করেই হোক সে যেন পরিচ্ছন্ন, মসৃণ ও তাজা হয়ে উঠেছে–যেন এইমাত্র একটা রুশ বাথ নিয়ে এসেছেঃ বুঝতে পারলে তো? একটা নৈতিক মানের কথাই আমি বলছি। ঠিক কি না?
প্রিন্সেস মারি জবাব দিল, ঠিক। তার অনেক উন্নতি হয়েছে।
পরনে একটা খাটো কোট, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, ঠিক যেন এইমাত্র স্নান-ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন…বাপি বলত….
কেন যে সে (প্রিন্স আন্দ্রু) তাকে অন্য সকলের চাইতে বেশি পছন্দ করত তা আমি জানি, প্রিন্সেস মারি বলল।
ঠিক, আর সে তো সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্রের মানুষ। লোকে বলে, ভিন্ন চরিত্রের লোকরাই বন্ধু হয়। সেকথাটা নিশ্চয় ঠিক। সত্যি, সে তো সম্পূর্ণ অন্য রকম–সবদিক থেকেই।
ঠিক, কিন্তু সে এক আশ্চর্য মানুষ।
আচ্ছা, শুভরাত্রি, নাতাশা বলল।
সেই একই দুষ্টুমির হাসি অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার মুখের উপর লেগে রইল।
.
অধ্যায়-১৮
সে রাতে পিয়েরের ঘুম আসতে অনেক দেরি হল। ঘরময় পায়চারি করল, কখনো কোনো কঠিন সমস্যার চিন্তায় ভুরু কোঁচকাল, কখনো মুখ বেঁকিয়ে দু কাঁধে ঝাঁকুনি দিল, কখনো বা খুশিতে হেসে উঠল।
ভাবতে লাগল প্রিন্স আন্দ্রুর কথা, নাতাশার কথা, তাদের ভালোবাসার কথা,কখনো অতীতের জন্য মনে ঈর্ষা দেখা দিল, আবার সে মনোভাবের জন্য পরমুহূর্তে নিজেকেই ভর্ৎসনা করল। ছয়টা বেজে গেল। তখনো সে ঘরময় পায়চারিই করছে।
আচ্ছা, এটা যদি অনিবার্যই হয় তাহলে আর কি করা যাবে? কি আর করা যাবে? নিশ্চয়ই এটাই ঘটবে। কথাগুলি নিজেকেই বলে সে তাড়াতাড়ি পোশাক বদলে শুতে গেল, মনটা খুশি ও উত্তেজিত, কিন্তু সব রকম ইতস্তত ভাব থেকে মুক্ত।
কয়েকদিন আগে পিয়ের স্থির করেছিল শুক্রবার পিটার্সবুর্গে যাবে। বৃহস্পতিবারে সে যখন ঘুম থেকে উঠল তখন সাভেলিচ এসে জানতে চাইল যাত্রার জন্য বাঁধাছাদা করবে কি না।
কি, পিটার্সবুর্গে? পিটার্সবুর্গে কেন? পিটার্সবুর্গে কে আছে? যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল। ভাবল, ও হ্যাঁ, এই ঘটনার অনেক আগে কোনো কারণে পিটার্সবুর্গে যেতে চেয়েছিলাম বটে। কেন? কিন্তু হয় তো আমাকে যেতেই হবে। বুড়ো সাভেলিচের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, লোকটি কত ভালো, সব দিকে নজর, সব কথা মনে রাখে। আর হাসিটিও কত সুন্দর!
পিয়ের তাকে শুধাল, আচ্ছা সাভেলিচ, তুমি কি মুক্তি পেতে চাও না?
আমার কাছে মুক্তির কি দাম ইয়োর এক্সেলেন্সি? আমরা স্বৰ্গত কাউন্টের–তাঁর স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটুক–অধীনে কাজ করেছি, আবার আপনার অধীনেও কাজ করছি, কিন্তু কোনোদিন তো আমাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হয়নি।
আর তোমার ছেলেমেয়েরা?
ছেলেমেয়েরাও এইভাবেই কাটিয়ে দেবে। এমন মনিবের অধীনে বেঁচে থাকা চলে।
পিয়ের বলল, কিন্তু আমার বংশধরদের বেলায়? ধর আমি হঠাৎ বিয়ে করলাম…তাও তত হতে পারে। তার মুখে ঈষৎ হাসি।
ইয়োর এক্সেলেন্সি যদি অনুমতি দেন তো বলি, তাহলে তো খুব ভালো হয়।
পিয়ের ভাবল, ব্যাপারটাকে সে কত সহজ মনে করছে। সে জানে না কাজটা কত সাংঘাতিক, কত বিপজ্জনক। আজ হোক, কাল হোক…কাজটা সাংঘাতিক।
তাহলে কি হুকুম হয়? কাল রওনা দিচ্ছেন তো? সাভেলিচ শুধাল।
না, আপাতত স্থগিত রাখছি। তোমাকে পরে বলব। তোমার অসুবিধা ঘটালাম বলে ক্ষমা কর, পিয়ের বলল, সাভেলিচকে হাসতে দেখে ভাবল : কী আশ্চর্য যে লোকটা বুঝতে পারছে না আমার কাছে এখন পিটার্সবুর্গ বলে কিছু নেই, সকলের আগে সেই ব্যবস্থাটা পাকা করতে হবে। কিম্বা হয় তো ও সবই জানে, শুধু না জানার ভান করছে। একটু কথা বলে দেখব নাকি ও কি ভাবছে? না, অন্য সময় হবে।
