মস্কো থেকে যখন যাত্রা করি তখন এর কিছুই আমরা জানতাম না। তার কথা জিজ্ঞাসা করার সাহসও হয়নি। তারপর হঠাৎ সোনিয়াই বলল যে সে আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছে। তার তখনকার অবস্থা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না, সে অবস্থা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম তাকে দেখতে, তার সঙ্গে থাকতে। ঘন ঘন শ্বাস টেনে অতি দ্রুত সে কথাগুলি বলল।
তারপর সে একটানা বলে গেল সেই সব কথা যে সে আজ পর্যন্ত আর কাউকে বলেনি তাদের তিন সপ্তাহব্যাপী পথযাত্রা এবং ইয়াবোশ্লাভলের জীবনযাত্রার সব অভিজ্ঞতার কথা।
অশ্রুসিক্ত চোখ দুটি নাতাশার উপর স্থির রেখে পিয়ের হাঁ করে সব কথা শুনল। শুনতে শুনতে প্রিন্স আন্দ্রু, বা মৃত্যু, বা তার কথা-কোনো কিছু নিয়েই সে কিছু ভাবল না। শুধুই তার কথাগুলি শুনল, আর কথা বলতে বলতে যে যন্ত্রণা সে ভোগ করছে সেজন্য তার প্রতি করুণা বোধ করতে লাগল।
নাতাশার পাশে বসে প্রিন্সেস মারিও এই প্রথম শুনল তার দাদার শেষের দিনগুলি ও নাতাশার ভালোবাসার কথা।
স্পষ্টতই সেই বেদনাদীর্ণ অথচ আনন্দময় কাহিনী বলা নাতাশার পক্ষে খুবই প্রয়োজন ছিল।
অন্তরের গোপনতম কথার সঙ্গে অতি তুচ্ছ বিবরণকে মিশিয়ে সে কথাগুলি বলতে লাগল, মনে হল, তার কথা বুঝি কোনোদিন শেষ হবে না। অনেক সময়ই একই কথা দুবার করে বলতে লাগল।
দরজার বাইরে দেসালেসের গলা শোনা গেল, সে জানতে চাইছে, ছোট্ট নিকলাস ঘরে ঢুকে শুভরাত্রি জানাতে পারে কি না।
আচ্ছা, এই সব-সব কথা, নাতাশা বলল।
নিকলাস ঢুকতেই তাড়াতাড়ি উঠে সে প্রায় দৌড়ে পর্দার আড়ালে ঢাকা দরজাটার দিকে গেল, দরজাটায় মাথাটা ঠুকে গেল ব্যথায় বা দুঃখে আর্তনাদ করে সে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পিয়ের একদৃষ্টিতে দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল, এই পৃথিবীতে সহসা কেন যে তার নিজেকে একেবারে একা মনে হল তা সে বুঝতে পারল না।
প্রিন্সেস মারিই তার অন্যমনস্কতা ভেঙে দিয়ে ভাইপোটির প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষণ করল।
সেই আবেগের মুহূর্তে ছোট্ট নিকলাসের মুখের সঙ্গে তার বাবার মুখের বড় বেশি মিল দেখে পিয়ের এতদূর অভিভূত হয়ে পড়ল যে ছেলেটিকে চুমো খাবার পরেই সে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল, পকেট থেকে রুমালটা বের করে জানালার কাছে চলে গেল। তখনই প্রিন্সেস মারির কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইল, কিন্তু সে তাকে ছাড়ল না।
না, অনেক সময়ই নাতাশা ও আমি দুটোর আগে ঘুমতে যাই না, কাজেই আপনি দয়া করে যাবেন না। খাবার দিতে বলছি। আপনি নিচে যান, আমরা এখনি আসছি।
পিয়ের ঘর থেকে যাবার আগে প্রিন্সেস মারি তাকে বলল, এই প্রথম নাতাশা তার সম্পর্কে এত কথা বলল।
.
অধ্যায়-১৭
উজ্জ্বল আলোকশোভিত বড় খাবার ঘরে পিয়েরকে নিয়ে যাওয়া হল। কয়েক মিনিট পরে দরজায় পায়ের শব্দ শোনা গেল, নাতাশাকে নিয়ে প্রিন্সেস মারি ঘরে ঢুকল। একটা কঠিন গম্ভীর ভাব মুখের উপর নেমে এলেও নাতাশা এখন বেশ শান্ত। একটা গুরুতর আন্তরিক আলোচনার পরে সাধারণত যা হয়ে থাকে এক্ষেত্রেও তারা তিনজনই এখন কিছু বিব্রত বোধ করল। আগেকার আলোচনায় ফিরে যাওয়া অসম্ভব, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আলোচনা খারাপ দেখায়, অথচ কথা বলার ইচ্ছাটা পুরোপুরিই থাকে। তারা চুপচাপ টেবিলে গিয়ে বসল। পরিচারকরা চেয়ারগুলো পিছনে টেনে নিয়ে আবার সামনে ঠেলে দিল। পিয়ের টেবিল-তোয়ালের ভাজ খুলল, এবং নিস্তব্ধতা ভাঙবার জন্য প্রথমে নাতাশার দিকে ও পরে প্রিন্সেস মারির দিকে তাকাল। তাদের মনেও ঐ একই সংকল্প। দুজনের চোখেই জ্বলছে খুশির আলো, যেন বলছে দুঃখের পরেও জীবনে আছে আনন্দ।
প্রিন্সেস মারি শুধাল, আপনি কি ভদকা খান কাউন্ট? আর এই কথাগুলি যেন অতীতের ছায়াকে ঠেলে দিল দূরে। এবার আপনার কথা বলুন। আপনার সম্পর্কে এমন সব অদ্ভুত আশ্চর্য কথা শুনেছি।
এবার তার পক্ষে স্বাভাবিক মৃদু বিদ্রুপের হাসি হেসে পিয়ের বলল, তা ঠিক। লোকে আমার সম্পর্কে এমন কথা বলে যা আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। মারি এব্রামভনা আমাকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আমার কপালে কি ঘটেছে বা ঘটা উচিত ছিল তাই একটানা বলে গেলেন। আমার অভিজ্ঞতার কথা কেমন করে বলা উচিত সে পরামর্শ দিলেন স্তেপান স্তেপানিচ। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, নাম-করা লোক হওয়াটা খুব সোজা (আমিই তো এখন একজন নামী লোক), লোকে আমাকে নেমন্তন্ন করে নিয়ে আমার কথাই শুনিয়ে দেয়।
নাতাশা হেসে কি যেন বলতে যাচ্ছিল। তাকে বাধা দিয়ে প্রিন্সেস মারি বলল, আমরা শুনেছি মস্কোতে আপনার দশ লাখ ক্ষতি হয়েছে। কথাটা কি সত্যি?
কিন্তু আমি তো আগের চাইতে তিনগুণ ধনী হয়েছি, পিয়ের জবাবে বলল। তারপর গম্ভীর হয়ে বলল, আমি যে মুক্তি পেয়েছি সেটাই আমার সত্যিকারের লাভ। কিন্তু প্রসঙ্গটা খুবই ব্যক্তিগত হয়ে পড়ছে দেখে সে আর কথা বাড়াল ।
আপনি কি নতুন করে বাড়িঘর তৈরি করছেন?
হ্যাঁ। সাভেলিচ বলছে করতেই হবে।
প্রিন্সেস মারি শুধাল, আচ্ছা বলুন তো, যখন মস্কোতে থাকা স্থির করলেন তখন কি আপনি কাউন্টেসের মৃত্যুর সংবাদ জানতেন না?
পিয়ের জবাব দিল, না। আমি খবরটা শুনি ওরিলে। শুনে কত যে আঘাত পেয়েছিলাম তা কল্পনাও করতে পারবেন না। আমরা আদর্শ দম্পতি ছিলাম না, কিন্তু তার মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল। দুটি মানুষের মধ্যে যখন ঝগড়া হয় তখন দুজনেরই দোষ থাকে, কিন্তু তাদের এক একজন যখন আর জীবিত থাকে না তখন অপর জনের দোষটা হঠাৎ বড় বেশি ভারি হয়ে দেখা দেয়। তার উপর এমন মৃত্যু…বন্ধু নেই, সান্ত্বনা নেই! তার জন্য আমি খুব, খুব দুঃখিত। কথা শেষ করে নাতাশার মুখে সানন্দ সমর্থনের ভাব লক্ষ্য করে সে খুশি হয়ে উঠল।
