সেই মুহূর্তে নাতাশার কাছে, প্রিন্সেস মারির কাছে, সর্বোপরি নিজের কাছে আপনা থেকেই পিয়ের এমন একটা গোপন কথাকে প্রকাশ করে বসল যার খবর সে নিজেই জানত না। আনন্দে ও যন্ত্রণায় তার মুখটা লাল হয়ে উঠল। মনের উত্তেজনাকে চেপে রাখতে চেষ্টা করল। কিন্তু লুকিয়ে রাখার যত চেষ্টা করতে লাগল ততই স্পষ্টতর ভাবে-ভাষার অতীত স্পষ্টতায়-এই সত্যকেই সে নিজের কাছে, নাতাশার কাছে, ও প্রিন্সেস মারির কাছে প্রকাশ করে দিল যে সে নাতাশাকে ভালোবাসে।
পিয়ের ভাবল, এ যে বড়ই অপ্রত্যাশিত। পুনরায় প্রিন্সেস মারির সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আবারও সে নাতাশার দিকেই দৃষ্টি ফেরাল, আর গাঢ়তর রঙে রাঙ হয়ে উঠল তার মুখ, আনন্দ ও শংকা মিশ্রিত অধিকতর শক্তিশালী একটা উন্মাদনা তার অন্তরকে চেপে ধরল। তার কথাবার্তা কেমন গোল মেলে হয়ে গেল, কথার মাঝখানেই সে থেমে গেল। পিয়ের প্রথমে নাতাশাকে খেয়াল করেনি, কারণ এখানে তাকে দেখতে পাবে এটা সে আশাই করেনি, তাকে যে চিনতে পারেনি তার কারণ তার সঙ্গে শেষ দেখার পরে নাতাশার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সে অনেক শীর্ণ, বিবর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু তাকে চিনতে না পারার কারণ সেটা নয়, তাকে যে চিনতে পারা যায়নি তার কারণ সে মুখের দুটি চোখে সব সময়ই ঝিলিক দিত জীবনানন্দের একটা চাপা হাসি, এখন প্রথম দর্শনের মুহূর্তে সে মুখে সেই হাসির ছায়ামাত্র ছিল নাঃ ছিল শুধু সাগ্রহ মনোযোগ আর বিষণ্ণ জিজ্ঞাসা।
পিয়েরের বিব্রত ভাবটা কিন্তু নাতাশার মুখে প্রতিফলিত হল না, একটা আনন্দের আভায় তার সারা মুখটা ঈষৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
.
অধ্যায়-১৬
প্রিন্সেস মারি বলল, ও আমার কাছে থাকতে এসেছে। কাউন্ট ও কাউন্টেসও কয়েকদিনের মধ্যেই এখানে এসে পড়বেন। কাউন্টেসের অবস্থা শংকাজনক। কিন্তু নাতাশার নিজেরও ডাক্তারকে দেখানো দরকার ছিল। তাই তাঁরা ওকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
নাতাশাকে সম্বোধন করে পিয়ের বলল, ঠিক, আজকাল দুঃখ ছাড়া একটিও পরিবার আছে কি? জানেন তো, যেদিন আমরা উদ্ধার পেলাম সেইদিনই ঘটনাটি ঘটল। তাকে আমি দেখেছি। কী যে আনন্দঘন মূর্তি ছেলেটির!
নাতাশা চোখ তুলে তাকাল, চোখ দুটি বিস্ফারিত ও উজ্জ্বল হয়েই যেন তার কথার জবাব দিল।
পিয়ের বলল, সান্ত্বনার বাণী কিই বা শোনাব? কিছু বলার নেই। এরকম একটি প্রাণোচ্ছল চমৎকার ছেলেকে কেনই বা মরতে হল?
ঠিক, এখনকার দিনে বিশ্বাস ছাড়া বাঁচা বড় শক্ত, প্রিন্সেস মারি বলল।
তাকে বাধা দিয়ে পিয়ের তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ঠিক, ঠিক, খুব ঠিক কথা।
পিয়েরের চোখে সাগ্রহ দৃষ্টি রেখে নাতাশা শুধাল, কেন ঠিক?
প্রিন্সেস মারি বলল, কেন তাও জিজ্ঞাসা করছ? ভবিষ্যতের কথা ভাবলেই… ।
প্রিন্সেস মারির কথা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করেই নাতাশা আবার সাগ্রহে পিয়েরের দিকে তাকাল।
পিয়ের বলতে লাগল, কারণ আমাদের সকলের উপরে একজন ঈশ্বর আছেন এ বিশ্বাস যার আছে একমাত্র সেই ওর… এবং আপনার এতবড় ক্ষতিকে সহ্য করতে পারে।
কি যেন বলতে মুখ খুলেও নাতাশা হঠাৎ থেমে গেল। পিয়ের তাড়াতাড়ি মুখটা ঘুরিয়ে প্রিন্সেস মারির কাছে জানতে চাইল বন্ধুর শেষের দিনগুলির কথা।
পিয়েরের বিব্রত ভাবটা এখন সম্পূর্ণ কেটে গেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে সে এটাও বুঝতে পারছে যে তার স্বাধীনতাও সম্পূর্ণ চলে গেছে। সে বুঝতে পারছে, তার প্রতিটি কথা ও কাজের এমন একজন বিচারক এখন এসেছে যার বিচার তার কাছে পৃথিবীর অন্য সকলের বিচারের চাইতে অধিক মুল্যবান। এখন কথা বলতে গেলেই সে ভাবছে তার কথা নাতাশার মনে কোন ভাবের সৃষ্টি করবে। সে যে ইচ্ছা করে নাতাশাকে খুশি করতে কথা বলছে তা নয়, কিন্তু সে যা কিছু বলছে নাতাশার দৃষ্টিকোণ থেকেই বলছে।
প্রিন্স আন্দ্রুকে যে অবস্থায় দেখতে পেয়েছিল সেই কথাই প্রিন্সেস মারি বলতে শুরু করল। কিন্তু পিয়েরের আধো-কম্পিত মুখ, তার প্রশ্ন, তার উৎকণ্ঠ চঞ্চল ভাব ধীরে ধীরে প্রিন্সেস মারিকে বাধ্য করল বিস্তারিত বিবরণ দিতে, যদিও সে বিবরণকে স্মরণে আনতে তার নিজেরই ভয় করে।
সমস্ত শরীরটাকে তার দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে তার কাহিনীকে সাগ্রহে শুনতে শুনতে পিয়ের বারবার বলতে লাগল, ঠিক, ঠিক, আর তাই…? ঠিক, ঠিক, সে ক্রমেই শান্ত ও নরম হয়ে উঠল? সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে সর্বদা একটা জিনিসই তো সে চেয়েছে-পরিপূর্ণ ভালো হতে-সুতরাং মৃত্যুকে সে ভয় করতে পারে না। যেটুকু দোষ তার ছিল-যদি কোনো দোষ আদপেই থেকে থাকে-তাও তার নিজের তৈরি নয়। তাহলে সে নরম হয়েছিল?… সহসা নাতাশার দিকে ফিরে অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, …কী সুখের কথা যে সে আপনাকে আবার দেখতে পেয়েছিল।
নাতাশার মুখটা কুঁচকে গেল। চোখে ভ্রুকুটি দেখা দিল। একমুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে নিল। কথা বলবে কি বলবে না ভেবে ইতস্তত করতে লাগল।
তারপর শান্ত চাপা স্বরে বলল, হ্যাঁ, সত্যি বড় সুখের। আমার কাছে সত্যি সুখের। একটু থেমে বলল, আর সে…সে…সে বলেছিল আমার ঘরে ঢোকার মুহূর্ত থেকেই সে এটা চাইছিল…
নাতাশার গলা থেমে গেল। মুখ লাল হয়ে উঠল, দু-হাত এক করে হাঁটুটাকে চেপে ধরল, তারপর বেশ চেষ্টা করে নিজেকে সংযত করে মাথাটা তুলে দ্রুত কথা বলতে লাগল।
