.
অধ্যায়-১৫
জানুয়ারির শেষে পিয়ের মস্কোতে গেল। তার বাড়ির সংলগ্ন যে অংশটা পোড়েনি সেখানেই উঠল। কাউন্ট রস্তপচিন ও অন্য কয়েকজন পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা করল। মনের ইচ্ছা, দিন দু পরে পিটার্সবুর্গ যাত্রা করবে। বিধ্বস্ত কিন্তু নতুন করে গড়ে ওঠা শহরের সকলেই বিজয়-উৎসবে ব্যস্ত, সবকিছুই যেন নব জীবনের উত্তাপে টগবগ করছে। পিয়েরকে দেখে সকলেই খুশি, সকলেই তার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক, সকলেই জানতে চায় তার অভিজ্ঞতার কথা। পিয়েরও সকলের প্রতিই প্রসন্ন, আবার পাছে কোথাও বাঁধা পড়ে যায় সেই আশংকায়ও সদাসতর্ক। গুরুত্বপূর্ণ বা তুচ্ছ যে প্রশ্নই তাকে করা হয়, যেমন–সে এখন কোথায় থাকবে? নতুন করে বাড়িঘর তুলবে কি না? পিটার্সবুর্গে কবে যাবে, আর কারো জন্যে একটা পুলিন্দা নিয়ে যেতে পারবে কি?-সব প্রশ্নেরই তার একই জবাব হ্যাঁ, হয় তো, অথবা তাই তো মনে হয়, ইত্যাদি।
সে শুনেছে, রস্তভরা এখন কমাতে আছে, কিন্তু নাতাশার কথা কদাচিৎ তার মনে পড়ে। মনে পড়লেও সেটা দূর অতীতের একটা মধুর স্মৃতিমাত্র।
আসার তিনদিন পরে দ্রবেস্কয়দের কাছে শুনল, প্রিন্সেস মারি মস্কোতেই আছে। প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যু, যন্ত্রণা ও শেষের দিনগুলির কথা প্রায়ই তার মনে পড়ে, এখন যেন সে স্মৃতি স্পষ্টতর হয়ে দেখা দিল। প্রিন্সেস মারি মস্কোতে ভজদভিজেংকা স্ট্রিটের বাড়িতেই বাড়িটা পোড়েনি-আছে শুনে সেই সন্ধ্যায়ই তার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
যেতে যেতে পিয়ের ভাবতে লাগল প্রিন্স আন্দ্রুর কথা, তাদের বন্ধুত্ব, বিভিন্ন সময়ে তাদের সাক্ষাৎ, বিশেষ করে বরদিনোতে তাদের শেষ সাক্ষাতের কথা। সে ভাবতে লাগল, এও কি সম্ভব যে মনের সেই তিক্ততা নিয়েই সে মারা গেছে? এও কি সম্ভব যে মৃত্যুর আগেও জীবনের অর্থ তার কাছে প্রকাশিত হয়নি। তার মনে পড়ল কারাতায়েভ ও তার মৃত্যুর কথা। আপনা থেকেই এই দুটি মানুষের একটা তুলনা তার মনে এল, এরা দুজন কত আলাদা, অথচ তাদের মধ্যে মিলও কতঃ দুজনই বেঁচে ছিল, দুজনই মারা গেছে, আর তাদের দুজনকেই সে ভালোবেসেছে।
বেশ বিষণ্ণ মনেই পিয়ের বুড়ো প্রিন্সের বাড়িতে পৌঁছে গেল। বাড়িটার অনেক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু চেহারাটা পাল্টায়নি। পুরনো পরিচারকটি জানাল, প্রিন্সেস তার ঘরে চলে গেছে, আর রবিবারেই সে লোকজনদের সঙ্গে দেখা করে থাকে।
পিয়ের বলল, আমার নাম করে বল। হয় তো তিনি দেখা করবেন।
লোকটি বলল, ঠিক আছে স্যার। দয়া করে ছবির ঘরটায় আসুন।
কয়েক মিনিট পরে পরিচারক দেসালেসকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। দেসালেস জানাল, পিয়ের যদি আনুষ্ঠানিক রীতির অভাব ক্ষমা করে দোতলায় তার ঘরে যায় তাহলে প্রিন্সেস সানন্দে তার সঙ্গে দেখা করবে।
একটা নিচু ঘরে একটিমাত্র মোমবাতির আলোয় প্রিন্সেস বসে আছে, তার সঙ্গে আছে কালো পোশাক পরা আরো একজন। পিয়েরের মনে পড়ল, প্রিন্সেস সব সময়ই সঙ্গিনী নিয়ে থাকে, তবে তারা কারা আর কি রকম প্রকৃতির তা সে জানে না, মনেও নেই। কালো পোশাক পরা মহিলাটির দিকে তাকিয়ে সে ভাবল, নিশ্চয়ই প্রিন্সেসের কোনো সঙ্গিনী।
প্রিন্সেস তাড়াতাড়ি উঠে হাতটা বাড়িয়ে দিল।
পিয়ের তার হাতে চুমো খাবার পরে তার পরিবর্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস বলল, আচ্ছা, তাহলে এইভাবেই আবার আমাদের দেখা হল। শেষপর্যন্তও সে আপনার কথাই বলত।
আপনার নিরাপদে থাকার খবর পেয়ে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। অনেকদিন পরে সেই প্রথম একটা সুখবর পেয়েছিলাম।
কেমন যেন একটা অস্বস্তির সঙ্গে প্রিন্সেস সঙ্গিনীর দিকে তাকাল। তারপর আরো কিছু বলতে যাবার মুখেই পিয়ের তাকে বাধা দিল।
ভাবুন তো তার কথা আমি কিছুই জানতাম না! ভেবেছিলাম সে যুদ্ধে মারা গেছে। যা কিছু জেনেছি অন্যের মুখ থেকে শুনে জেনেছি। শুধু জানি যে রস্তভদের সঙ্গে তার একটা মনোমালিন্য ঘটেছিল…কী আশ্চর্য যোগাযোগ!
পিয়ের উৎসাহের সঙ্গে দ্রুত কথা বলতে লাগল। একবার সঙ্গিনীটির মুখের দিকে তাকাল, দেখল তার সদয় ও সমনোযোগ দৃষ্টি তার উপরেই নিবদ্ধ, কেন যেন পিয়েরের মনে হল, কালো পোশাকের এই মানুষটি খুবই সদয় ও ভালো, তার সামনে প্রিন্সেস মারির সঙ্গে খোলাখুলিভাবে সব কথা বলা চলে।
কিন্তু সে যখন রস্তভদের কথা বলল তখন প্রিন্সেস মারির মুখে একটা বিব্রতভাব ফুটে উঠল। তাড়াতাড়ি পিয়েরের মুখের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে কালো পোশাকের মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি সত্যি ওকে চিনতে পারেননি।
পিয়ের আর একবার সঙ্গিনীটির বিবর্ণ নরম মুখের দিকে তাকাল, তার কালো চোখের সাগ্রহ দৃষ্টির ভিতর দিয়ে দীর্ঘবিস্তৃত, মধুরতর, বড়ই প্রিয় কে যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ভাবল, কিন্তু না, তা হতে পারে না। এই কঠোর, শীর্ণ, বিবর্ণ মুখে যে অনেক বেশি বয়সের ছায়া! এ তো সে হতে পারে না। শুধু একে দেখে তার কথা আমার মনে পড়ছে। কিন্তু সেইমুহূর্তে প্রিন্সেস মারি ডাকল নাতাশা! আর অনেক কষ্টে, অনেক চেষ্টায়, অনেক যত্নে মরচে-ধরা কজাওয়ালা দরজা খুলে যাওয়ার মতো সে মুখে একটু হাসি খেলে গেল, আর সেই ভোলা দরজা দিয়ে একঝলক সুগন্ধ এসে এমন সুখে পিয়েরের মনকে ভরে দিল যা সে অনেকদিন হল ভুলে গেছে, আর-অন্তত এইমুহূর্তে-যার কথা সে চিন্তাও করেনি। সে সুখ তার মনকে ভরে দিল, তাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে দিল। সে ঈষৎ হাসল, আর কোনো সন্দেহ রইল না, এই তো নাতাশা, তাকে সে ভালোবাসে।
