আমি কিন্তু দেখেই প্রিন্সেসকে চিনতে পেরেছি, মাদময়জেল বুরিয়ে বলল।
আর আমি তো ভাবতেই পারি নি!.. প্রিন্সেস মারি চেঁচিয়ে বলল। আরে আ, তোমাকে তো আমি দেখতেই পাই নি।
প্রিন্স আন্দ্রু ও তার বোন হাত ধরাধরি করে পরস্পরকে চুমো খেল; প্রিন্স আন্দ্রু বোনকে বলল যে সে এখন সেই ছিচকাঁদুনে মেয়েটিই আছে। প্রিন্সেস মারি মুখ ঘুরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল; অশ্রুসজল দুটি উজ্জ্বল চোখ রাখল প্রিন্স আর মুখের উপর।
ছোট প্রিন্সেস অনবরত বকবক করতে লাগল; তার লোমশ ছোট উপরের ঠোঁটটা বার বার নিচের ঠোঁটটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে আর ফাঁক হয়ে যাচ্ছে, আর তখনি ঈষৎ হাসির সঙ্গে তার চকচকে দাঁতগুলি দেখা যাচ্ছে; চোখ দুটি ঝিলমিলিয়ে উঠছে। সে বলতে লাগল : পাকি পাহাড়ে তারা একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিল; তার এই অবস্থায় একটা গুরুতর কিছু ঘটতে পারত; সব জামা-কাপড় সে পিটার্সবুর্গে রেখে এসেছে, তাই এখানে কি যে পরবে তাই সে জানে না; আন্দ্রু খুব বদলে গেছে; কিটি অদিন্তসভা একটি বুড়োকে বিয়ে করেছে; মারির জন্য একটি সত্যিকারের বর জুটেছে, তবে সে বিষয়ে পরে কথা হবে। প্রিন্সেস মারি তখনো তার ভাইয়ের দিকেই নীরবে তাকিয়ে আছে; তার সুন্দর চোখ দুটি ভালোবাসা। ও বিষণ্ণতায় ভরা। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তার বৌদি যাই বলুক না কেন, তার মনের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র চিন্তার ধারা বয়ে চলেছে। পিটার্সবুর্গের গত উৎসবের বর্ণনার মাঝখানেই সে ভাইকে বলল :
তাহলে সত্যি সত্যি তুমি যুদ্ধে যাচ্ছ আন্দু? সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লিজাও দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
হ্যাঁ, আর কালই যাচ্ছি, ভাই জবাব দিল।
ও আমাকে এখানে রেখে যাচ্ছে; ও তো প্রমোশন পেতে পারত, তবু কেন যে আমাকে রেখে যাচ্ছে তা ঈশ্বরই জানেন…
শেষপর্যন্ত না শুনে নিজের চিন্তার জের টেনেই প্রিন্সেস মারি ভ্রাতৃবধূর দিকে মুখ ফিরিয়ে শুধাল, এটা কি ঠিক?
ছোট প্রিন্সেসের মুখের ভাব বদলে গেল। আবার নিঃশ্বাস ফেলে বলল, …হ্যাঁ, খুব ঠিক। আঃ! কী ভয়াবহ…
তার ঠোঁট নেমে এল। ভ্রাতৃবধূর মুখের কাছে মুখ নিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে আবার সে কাঁদতে শুরু করল।
প্রিন্স আন্দ্রু ভুরু কুঁচকে বলল, ওর বিশ্রামের দরকার। তাই না লিজা? ওকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও। আমি বাবার কাছে যাচ্ছি। বাবা কেমন আছেন? সেই রকমই?
হ্যাঁ ঠিক সেই রকম। যদিও তুমি কি মনে করবে আমি জানি না, প্রিন্সেস খুশি হয়ে বলল।
আর সেই রকম ঘণ্টা ধরে চলা? পথ দিয়ে বেড়ানো? আর সেই লেদ? প্রশ্নগুলি করবার সময় প্রিন্স আন্দ্রুর মুখে ঈষৎ হাসি খেলে গেল; বোঝা গেল, বাবার প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সত্ত্বেও তার দুর্বলতা সম্পর্কেও সে সচেতন।
ঘণ্টার হিসেব ঠিকই আছে; লেদও; আমার গণিত ও জ্যামিতির পাঠও একভাবেই চলছে, এমন খুশির সুরে প্রিন্সেস মারি কথাটা বলল যেন জ্যামিতিই তার জীবনের সবচাইতে খুশির ব্যাপার।
বিশ মিনিট পরে যখন বুড়ো প্রিন্সের উঠবার সময় হল তখন তিখন এল ছোট প্রিন্সকে তার বাবার কাছে নিয়ে যেতে। ছেলের আগমনের সম্মানে বুড়ো লোকটি দৈনন্দিন কর্মসূচীর একটু পরিবর্তন ঘটাল : ডিনারের পোশাক পরার সময়ই সে ছেলেকে তার ঘরে নিয়ে আসবার অনুমতি দিল। বুড়ো প্রিন্স সবসময়ই পুরোনো ধরনের পোশাক পরে–একটা সেকেলে কোট ও পাউডার-মাখা চুল। প্রিন্স আন্দ্রু যখন বাবার সাজ-ঘরে ঢুকল তখন বুড়ো লোকটি একটা বড় চামড়া-ঢাকা চেয়ারে বসেছিল। তিখন তার মাথায় পাউডার লাগাচ্ছে।
পাউডার মাখা মাথাটা সজোরে নাড়তে নাড়তে বুড়োলোকটি বলে উঠল, আঃ! এই যে মহাবীর! বোনাপার্তকে পরাজিত করতে চাও কি? তার সঙ্গে অন্তত একটু ভালোভাবে বোঝাঁপড়া কর; নইলে সে যদি এইভাবে চলতে থাকে তো অচিরেই আমাদের সবাইকে তার প্রজা বানিয়ে ছাড়বে। কেমন আছ? বলে সে গালটা বাড়িয়ে দিল।
খাবার আগে একটু ঘুমের ফলে বুড়ো লোকটির মেজাজ বেশ ভালো আছে। (বুড়ো প্রিন্স প্রায়ই বলে, খাবারের পরে ঘুম রুপো,-খাবার আগে ঘুম সোনা।) ঘন ভুরুর নিচ দিয়ে সে বাঁকা চোখে ছেলের দিকে তাকাল। প্রিন্স আন্দ্রু এগিয়ে গিয়ে বাবা যেখানটায় দেখিয়ে দিল সেখানে চুমো খেল। সামরিক বিভাগের লোকদের নিয়ে, বিশেষ করে বোনাপার্তকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা তার বাবার এই প্রিয় বিষয়। তাই প্রিন্স আন্দ্রু বাবার কথার কোনো জবাব দিল না।
সাগ্রহে সশ্রদ্ধভাবে বাবার মুখের প্রতিটি ভঙ্গির দিকে নজর রেখে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, হ্যাঁ বাবা, আমি আপনার কাছে এসেছি; আমার গর্ভবতী স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আপনার স্বাস্থ্য কেমন আছে?
দেখ বাবা, শুধু বোকা আর লম্পটরাই অসুখে ভোগে। তুমি তো আমাকে জান; সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমি কাজ নিয়ে থাকি। আমি মিতাচারীও; কাজেই আমি ভালোই আছি।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ছেলে হেসে বলল।
এ ব্যাপারে ঈশ্বরের কিছু করবার নেই! বলেই সে তার প্রিয় বিষয়বস্তুতে ফিরে গেল; যে নতুন বিজ্ঞানকে তোমরা রণকৌশল বল তার সাহায্যে বোনাপার্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটা জার্মানরা তোমাদের কীভাবে শিখিয়েছে বল তো?
প্রিন্স আন্দ্রু হাসতে লাগল।
সব ব্যাপারটা বুঝে নিতে আমাকে সময় দিন বাবা, ছেলে হেসে বলল। বোঝা গেল, বাবার চরিত্রের দুর্বলতা সত্ত্বেও ছেলে তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে। আহ আমি তো এখনো গুছিয়ে বসতেই পারি নি!
