সামনে কোনো লক্ষ্য নেই, কারণ এখন পেয়েছে বিশ্বাসকোনো বিধান বা বাণী, বা ধারণায় বিশ্বাস নয়, সে বিশ্বাস চিরজাগ্রত, চিরপ্রকাশ ঈশ্বরের প্রতি। আগে নিজের গড়া লক্ষ্যের মধ্যেও সে ঈশ্বরকেই খুঁজেছে। সেই লক্ষ্যের সন্ধান আসলে ঈশ্বরেরই সন্ধান, বন্দি অবস্থায় সহসা সে জেনেছে, কোনো বাণী বা যুক্তি দিয়ে নয়, জেনেছে প্রত্যক্ষ অনুভূতি দিয়ে, সেই সত্য যা অনেককাল আগে তার ধাত্রী তাকে শুনিয়েছিল : ঈশ্বর এখানে এবং সর্বত্র বিরাজিত। বন্দি অবস্থায় সে জেনেছে, ভ্রাতৃসংঘ কর্তৃত্ব স্বীকৃত বিশ্বস্রষ্টার ধারণার চাইতে কারায়েভের ঈশ্বর অনেক বড়, অনন্ত ও অপরিমেয়। তার মনের অবস্থা এখন সেই মানুষের মতো যে বহুদূরে দৃষ্টি মেলে কাউকে খুঁজতে গিয়ে নিজের পায়ের কাছেই তাকে দেখতে পায়। সারা জীবন চারদিকে মানুষদের মাথার উপর দিয়েই সে তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছে, অথচ তার বদলে তার উচিত ছিল শুধু নিজের সামনে দৃষ্টিকে মেলে ধরা।
অতীতে সেই দূরধিগম্য অসীমকে সে কখনো খুঁজে পায়নি। শুধু অনুভব করেছে কোথাও না কোথাও সে আছে, তাই তাঁকে খুঁজে ফিরেছে। যা কিছু কাছের, যা কিছু বোধগম্য তার মধ্যে সে দেখেছে শুধু সসীমকে, ক্ষুদ্রকে, সাধারণকে, অর্থহীনকে। চোখে একটা মানস দূরবীণ লাগিয়ে অনেক দূরে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দূরত্বের কুয়াশা ঢাকা যে তুচ্ছ জাগতিক বস্তুকে দেখেছে, স্পষ্ট করে দেখতে না পারার দরুন তাকেই মনে হয়েছে মহৎ ও অন্তত ইওরোপীয় জীবনযাত্রা, রাজনীতি, ভ্রাতৃসংঘ, দর্শন, বিশ্বমানবতা–সবকিছুকেই সেই একইভাবে সে দেখতে পেয়েছে। কিন্তু আজ সবকিছুর মধ্যে সেই মহান, শাশ্বত ও অনন্তকে সে দেখতে শিখেছে, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই দূরবীণটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চারদিকেই খুঁজে পেয়েছে সেই চিরপরিবর্তনশীল, শাশ্বত, অপরিমেয়, অনন্ত জীবনকে। দৃষ্টিতে যত কাছে নিয়ে আসছে ততই শান্তি-সুখে ভরে উঠছে হৃদয়। কিসের জন্য? এই ভয়ংকর প্রশ্ন এতদিন তার মনের মন্দিরকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু আজ সে প্রশ্নের কোনো অস্তিত্ব নেই। কিসের জন্য? এই প্রশ্নের একটা সরল উত্তর এখন সর্বদাই তার মনের মধ্যে উপস্থিত : কারণ ঈশ্বর আছেন, আর সে ঈশ্বরের ইচ্ছা না হলে মানুষের মাথার একগাছি চুলও পড়ে না।
.
অধ্যায়-১৩
বাইরে থেকে দেখলে পিয়েরের বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। চেহারা যেমন ছিল ঠিক সেই রকমই আছে। এখনো সে আগের মতোই অন্যমনস্ক, চোখের সামনে যা থাকে তার বদলে নিজের বিশেষ কোনো জিনিস নিয়েই সে ব্যস্ত থাকে। সে আগে যা ছিল এবং এখন যা হয়েছে তার মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। আগে তাকে মনে হত দয়ালু কিন্তু দুঃখী মানুষ, তাই লোকে তাকে এড়িয়ে চলত, এখন জীবনের আনন্দের একটা হাসি সর্বদাই তার ঠোঁটে লেগে থাকে, অপরের প্রতি সহানুভূতি জ্বল জ্বল করে তার চোখে, তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একটাই প্রশ্ন-তারা ও কি তার মতোই পরিতুষ্ট, তাই তার উপস্থিতিতে মানুষ এখনো আনন্দিত বোধ করে।
আগে সে কথা বলত বেশি, কথা বললেই উত্তেজিত হয়ে উঠত, কদাচিৎ অন্যের কথা শুনত, এখন সে কদাচিৎ কথার মধ্যে ডুবে যায়, এমনভাবে মন দিয়ে অন্যের কথা শোনে যে সকলেই সাগ্রহে নিজেদের গোপন কথা তাকে বলে।
যে প্রিন্সেস কোনোদিনই পিয়েরকে পছন্দ করত না, কারণ বুড়ো কাউন্টের মৃত্যুর পর সে নিজেকে পিয়েরের উপর একটি বোঝা বলে মনে করত, কিন্তু এখন ওরিলে এসে অল্প কিছুদিন থেকেই পিয়েরকে তার ভালো লেগে গেছে। এদিকে পিয়েরও ধীরে ধীরে যেভাবে তার বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছে, একজন অতি চতুর লোকও তা করতে পারত না। সে সর্বদাই প্রিন্সেসের যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলির স্মৃতিচারণ করত, আর তার প্রতি সহানুভূতি দেখাত। এই তিক্তহৃদয়, কঠোর, গর্বিত প্রিন্সেসটির মানবিক গুণগুলিকে বাইরে টেনে বের করাই এ ব্যাপারে পিয়েরের একমাত্র কৌশল।
প্রিন্সেস মনে মনে বলল, খারাপ লোকের প্রভাবে না পড়ে সে যখন আমার মতো লোকের সাথে মেশে, তখন তো সে খুব, খুবই সদয়।
তার দু চাকর তেরেন্তি ও ভাস্কাও পিয়েরের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। তাদের ধারণা, মনিব এখন অনেক সরল ও স্বাভাবিক হয়েছে। তেরেন্তি তো অনেক সময়ই তার পোশাক ছাড়িয়ে শুভরাত্রি জানাবার পরেও মনিবের বুট ও পোশাক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে থাকে, সে নতুন করে কথা বলতে শুরু করে কিনা দেখতে। আর পিয়ের ও তেরেন্তি গল্প করতে চাইছে বুঝতে পেরে সাধারণতই তাকে আরো কিছুক্ষণ ধরে রাখে।
হয়তো জিজ্ঞাসা করত, আচ্ছা, বল তো… তোমরা খাবার পেতে কী ভাবে?
আর তেরেন্তিও বলতে শুরু করত মস্কো ধ্বংসের কথা, বুড়ো কাউন্টের কথা, আর দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করত, অথবা পিয়েরের গল্প শুনত, আর তারপরে মনিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারার সুখে ও তার প্রতি স্নেহে গদগদ হয়ে হল ঘরের দিকে চলে যেত।
যে ডাক্তার পিয়েরের চিকিৎসা করত এবং প্রতিদিন তাকে দেখতে আসত, যদিও সে মনে করত যে রোগজৰ্জর মানবতার স্বার্থে তার প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান, তবু সেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে পিয়েরের সঙ্গে গল্পগুজব করত।
ভাবত, এ ধরনের লোকের সঙ্গে কথা বলে সুখ আছে, সে তো অন্য সব প্রাদেশিক লোকদের মতো নয়।
